মেলোনি ছবি তোলার জন্য ‘অনুনয়’ করেছিলেন, দাবি ট্রাম্পের; ইতালির প্রধানমন্ত্রী বললেন ‘বানানো গল্প’
জি-৭ সম্মেলনে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ছবি তোলার জন্য 'অনুনয়' করেছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন দাবিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মেলোনি। ইতালির একটি টেলিভিশন চ্যানেলে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের জেরে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে সংঘাত এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
মেলোনির বলেছেন, ট্রাম্পের এই দাবি সম্পূর্ণ 'বানানো গল্প'। এই টানাপোড়েনের জেরে আগামী সপ্তাহের শুরুতে নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল করেছেন ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি।
দুই নেতার এই প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ থেকে ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত কয়েক মাসে তাদের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে চিড় ধরার বিষয়টি সামনে এসেছে।
চলতি সপ্তাহে ফ্রান্সের এভিয়াঁ-লে-বেঁ-তে আয়োজিত জি-৭ সম্মেলনে ট্রাম্প ও মেলোনিকে বেশ কিছুক্ষণ নিবিড় আলাপ করতে দেখা গিয়েছিল। পরে ইতালির প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তাদের সম্পর্কে কোনো বদল আসেনি এবং পারস্পরিক কোনো ক্ষোভও নেই।
কিন্তু এর পরই ইতালির লা-৭ টিভি চ্যানেলকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন: 'উনি (মেলোনি) আমার সঙ্গে একটা ছবি তোলার জন্য অনুনয় করছিলেন; তার জন্য আমার মায়া হচ্ছিল।'
এভিয়াঁ-র সম্মেলনে একাধিকবার দুই নেতাকে একসঙ্গে ক্যামেরাবন্দি করা হয়। একটি ছোট সোফায় বসে তাদের গভীর আলোচনায় মগ্ন থাকতেও দেখা গিয়েছিল, যেখানে মেলোনির হাসিমুখে ছিলেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, 'আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি, তাতেই হয়তো উনি খুশি।' তবে লা-৭ চ্যানেলটি ট্রাম্পের মূল ইংরেজি বক্তব্য শোনানোর বদলে তার ইতালীয় অনুবাদ সম্প্রচার করেছে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যে তীব্র অবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন মেলোনি। ইনস্টাগ্রামে ৭০ লক্ষ ফলোয়ারদের উদ্দেশে দেওয়া সংক্ষিপ্ত বার্তায় তিনি বলেন, 'আমি সত্যিই স্তম্ভিত।'
তিনি আরও বলেন, 'জানি না যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কেন মিত্রদের সঙ্গে এমন আচরণ করেন।' এ ধরনের ঘটনা অবশ্য এই প্রথম নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মেলোনি বলেন, 'আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমের শত্রুদের বিরুদ্ধে তিনি এই ধরনের দৃঢ়তা দেখান না, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। উল্টো ওই সব শত্রু দেশের নেতাদের প্রতি তার অনেক বেশি নরম মনোভাব দেখা যায়।
'তবে তার একটা জিনিস মনে রাখা উচিত: আমি বা ইতালি—কেউই কখনও কারও কাছে অনুনয় করে না।'
এই বিষয়ে হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগ করেছিল বিবিসি।
ট্রাম্পের এমন মন্তব্যে মেলোনির এই তীব্র প্রতিক্রিয়া অবশ্য আকস্মিক নয়। এর আগে বেশ কিছু ঘটনার জেরে দুই নেতার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা একমাত্র ইউরোপীয় নেতা ছিলেন ২০২২ সালে ক্ষমতায় আসা মেলোনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) মেলোনিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাব্য সেতু হিসেবে দেখছিল।
তবে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করেছেন মেলোনি। তার প্রতিক্রিয়ায় গত এপ্রিলে ইতালীয় দৈনিক 'কোরিয়রেরে দেল্লা সেরা'-কে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, 'আমি ভেবেছিলাম তার সাহস আছে, কিন্তু আমার ভুল হয়েছিল।'
পোপ চতুর্দশ লিও-র বিরুদ্ধে ট্রাম্প যখন 'অপরাধ দমনে দুর্বল ও পররাষ্ট্রনীতিতে অত্যন্ত খারাপ' হওয়ার অভিযোগ তোলেন, তখন মেলোনি এই মন্তব্যকে 'অগ্রহণযোগ্য' বলে উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই সাক্ষাৎকারের পর ইতালির প্রেসিডেন্ট সের্জিয়ো মাত্তারেল্লা অবিলম্বে মেলোনিকে ফোন করে পাশে থাকার বার্তা দেন। ইতালির সব রাজনৈতিক দলের নেতারাই মেলোনির সমর্থনে এগিয়ে আসেন।
বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির বামপন্থি সিনেটর ফিলিপ্পো সেন্সি বলেন, ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এমন অহংকারী সুরে কথা বলার অধিকার কারও নেই।
ফাইভ স্টার মুভমেন্ট-এর নেতা জুসেপ্পে কন্তে মন্তব্য করেন, ইতালি এই ধরনের অপমান প্রাপ্য নয়। ওয়াশিংটনের অনুকম্পা পাওয়ার চেষ্টা কখনোই জাতীয় মর্যাদা ও স্বার্থের বিনিময়ে হতে পারে না।
মেলোনির নিজ দল ব্রাদার্স অভ ইতালির সিনেটের দলনেতা লুচো মালান বলেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য আসলে বিভিন্ন ইউরোপীয় নেতার প্রতি তার লাগাতার আপত্তিকর আচরণেরই অংশ। এর ফলে অন্য কারও নয়, বরং খোদ ট্রাম্পের ভাবমূর্তি ও কর্তৃত্বই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মালান বলেন, জি-৭ সম্মেলনের ভিডিয়োতে যে পরিস্থিতি দেখা গেছে, তা ট্রাম্পের দাবির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রয়োজনের মুহূর্তে ওয়াশিংটনকে 'না' বলার যে নজির মেলোনি গড়েছেন, সেটাই হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করেছে।
সরকারের জোটসঙ্গী লিগ পার্টির মাত্তেও সালভিনি সংক্ষেপে বলেন, 'যিনি জর্জিয়াকে আক্রমণ করছেন, তিনি আমাদের সবাইকেই আক্রমণ করছেন।'
মেলোনি ও ট্রাম্পের এই বিরোধ কেবল সাময়িক বাদানুবাদ নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতারই প্রতিফলন।
একটা সময় ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো ট্রাম্পের সব সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও এখন তারা সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে অনেক বেশি প্রস্তুত।
আফগানিস্তানে ব্রিটেন ও যৌথ বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।
আর অতি সম্প্রতি মেলোনির পাশাপাশি অন্যান্য রাষ্ট্রনেতারাও ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন। নিজেদের বিমানঘাঁটি মার্কিন বোমারু বিমানকে ব্যবহার করতে দিতেও অনেক ক্ষেত্রে রাজি হননি।
কূটনীতিকরা বলছেন, চলতি বছরের শুরুর দিকে আমেরিকা গ্রিনল্যান্ডকে হুমকি দেওয়ার পর থেকেই ইউরোপীয় নেতারা অনেক বেশি দৃঢ় মনোভাব দেখাতে শুরু করেছেন।
আটলান্টিকের ওপারের এক 'অনির্ভরযোগ্য' মিত্রের ওপর ভরসা না করে ইউরোপ যাতে কৌশলগতভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তা নিয়ে মহাদেশের রাজধানীগুলোতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইউরোপজুড়ে আসন্ন নির্বাচনের আগে সম্ভবত মহাদেশটির ভোটারদের মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন এই রাষ্ট্রনেতারা।
স্বাভাবিকভাবেই ইউরোপের যে ডানপন্থি দলগুলো প্রথমদিকে ট্রাম্প শিবিরকে রাজনৈতিক সতীর্থ মনে করত, তারাও এখন মার্কিন দলগুলো থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে।
