ব্যবসায়িক সংকট কাটিয়ে উঠতে সিটি গ্রুপে স্বতন্ত্র অডিটর নিয়োগ ও রিভিউ কমিটি গঠন
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের বর্তমান ব্যবসায়িক সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং গ্রুপটির ২৬,৬০০ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া ঋণ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের রিভিউ কমিটি গঠন করেছেন শীর্ষ ব্যাংকাররা। একই সাথে গ্রুপটির প্রকৃত আর্থিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি যাচাই করতে একটি স্বতন্ত্র অডিটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে সিটি গ্রুপকে সচল রাখতে এবং এর বিশাল অংকের এই ঋণ যৌথভাবে পুনর্গঠনের বিষয়ে দুই বিদেশি ব্যাংকসহ মোট ৩৬টি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা এক বৈঠকে মিলিত হন। বর্তমানে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এই শিল্পগোষ্ঠীটি।
বৈঠক শেষে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এর চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন টিবিএসকে বলেন, "সব ব্যাংকই এই বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছে। এটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ একটি আলোচনা ছিল এবং এখানে বিষয়গুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এরপর ১২-১৩ জন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার (ডিএমডি বা এএমডি পর্যায়ের) সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।"
তিনি জানান, এই কমিটি সিটি গ্রুপের অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা, সহায়তার পরিমাণ এবং প্রতিটি ব্যাংকের সক্ষমতা মূল্যায়ন করবে। এছাড়া কার্যকরী মূলধনের জন্য 'ব্রিজ ফাইন্যান্সিং' এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তারা ডিউ ডিলিজেন্স পরিচালনা করবে। এই কমিটি আগামী ১০ দিনের মধ্যে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে, যাতে এর ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা নিয়ে যেতে পারে।
বৈঠকে উপস্থিত একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিবিএসকে নিশ্চিত করেছেন, সিটি গ্রুপের পক্ষ থেকে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একটি প্রেজেন্টেশন দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, "ঋণ পুনর্গঠনের বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে গ্রুপটিকে রক্ষায় ব্যাংকগুলো ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সিটি গ্রুপ তাদের কিছু 'নন-কোর' (অপ্রাসঙ্গিক) ব্যবসা বিক্রি করার পরিকল্পনা করছে বলেও আমাদের জানিয়েছে।"
ব্যাংকাররা মনে করছেন, সিটি গ্রুপ একটি 'জেনুইন' বা প্রকৃত অর্থেই সমস্যায় পড়া ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, "তাদের ব্যবসা চাপে পড়লেও তারা বিদেশে অর্থ পাচার করেনি। তাই সব ব্যাংকই তাদের পুনরুজ্জীবিত করতে একমত হয়েছে।"
ঋণ পুনর্গঠনের এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সিটি গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদে (বোর্ড) ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে দুই বা তিনজন প্রতিনিধি মনোনীত করা হবে। এটি মূলত বৈশ্বিক ঋণ পুনর্গঠন মডেল এবং 'ওয়াটারফল মেকানিজম' অনুসরণ করে করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ৩৬টি ব্যাংকের যৌথ মালিকানায় একটি কেন্দ্রীয় এসক্রো অ্যাকাউন্ট থাকবে। সমস্ত নগদ অর্থ বা ক্যাশ ফ্লো এই অ্যাকাউন্টে জমা হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ১০০ টাকার পণ্য বিক্রি হয়, তবে সেই টাকা প্রথমে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকা এসক্রো অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এরপর সেই ১০০ টাকা থেকে ৮০ টাকা সিটি গ্রুপকে চলতি মূলধন হিসেবে ফেরত দেওয়া হবে এবং বাকি ২০ টাকা ঋণ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ রাখা হবে।
এদিকে, এবিবি-র পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ জানানো হবে যাতে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত সিটি গ্রুপের কোনো ঋণ হিসাবকে শ্রেণীকৃত (ডিফল্ট) না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মাসরুর আরেফিন বলেন, "আমরা এই নির্দিষ্ট কেসটির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একটি বিশেষ 'রেগুলেটরি ডিসপেনসেশন' বা ছাড় চাইব যাতে বর্তমান নিয়ন্ত্রক নীতি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়।"
উল্লেখ্য, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় আগে প্রতিষ্ঠিত সিটি গ্রুপের বার্ষিক আয় প্রায় ৩২,০০০ কোটি টাকা এবং এখানে প্রায় ২৫,০০০ কর্মী কর্মরত আছেন।
