সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা বাতিল, যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা
সুইজারল্যান্ড জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শেষ করার লক্ষ্যে ইরানি আলোচকদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত আলোচনা শুক্রবার অনুষ্ঠিত হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দেশটিতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করার পর এই বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়, ফলে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র বৃহস্পতিবার রাতে এক বিবৃতিতে বলেছেন, 'এই আলোচনার লজিস্টিক সব সময়ই সহজ বা পূর্বানুমানযোগ্য ছিল না।' তিনি আরও জানান, পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলেই ভ্যান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল যাত্রার জন্য প্রস্তুত।
সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে বুর্গেনস্টক পাহাড়ি রিসোর্টে নির্ধারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে না, তবে এ বিষয়ে তারা বিস্তারিত কিছু জানায়নি। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, পরিকল্পিত আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যে নির্ধারিত বৈঠকও আপাতত স্থগিত। তবে সুইজারল্যান্ড জানিয়েছে, তারা আলোচনায় সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে তারা বলেছিল, বুধবারের ১৪ দফা চুক্তির পর অন্তত ৬০ দিনের জন্য অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হলে তারা খুঁটিনাটি বিষয়সংক্রান্ত আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত থাকবে। ইরানের আলোচকদের আগে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষণ দেখতে হবে বলেও জানানো হয়েছিল। ভ্যান্সের ঘোষণার আগে তাদের প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডে যাবে কি না—এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য ছিল না বলে আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছিলেন, সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তির একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে জানায়, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করায় এটি অপ্রয়োজনীয়।
এই সংঘাত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালায়। এতে অন্তত সাত হাজার মানুষ নিহত হয়, জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।
ইসরায়েলের লড়াই অব্যাহত
ইসরায়েল, শান্তি আলোচনার বাইরে থাকায়, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা থেকে নিজেকে দূরে রেখেছে এবং লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এতে চুক্তিটি টিকে থাকবে কি না তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ওয়াশিংটনে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান মিত্রদের কেউ কেউ কংগ্রেসে প্রশ্ন তুলেছেন যে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি যুদ্ধ শেষ করতে গিয়ে অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন কি না, কারণ এই সংঘাত অনেক আমেরিকানের কাছেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি কেবল ইরানের 'নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ' ছাড়া যুদ্ধ শেষ করবেন না। কিন্তু নতুন সমঝোতায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে, দশ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ মুক্ত করা হয়েছে এবং ইরানের তেল রপ্তানির জন্য তাৎক্ষণিক মার্কিন ছাড় দেওয়া হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প এই চুক্তিতে 'হতাশার কারণে' স্বাক্ষর করেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা সহজ হবে না। তিনি বলেছেন, 'যদি মার্কিন পক্ষ অতিরিক্ত দাবি করে, আমরা তা গ্রহণ করব না।'
চুক্তিটি আলোচকদের ৬০ দিনের সময় দিয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য, যদি না সময়সীমা বাড়ানো হয়। এছাড়া ইরানের জন্য তিনশো বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ভ্যান্স জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও সীমিত করার চেষ্টা করবে।
যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়েও আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছে যে যুদ্ধের খরচ ও অন্যান্য বিল মেটাতে তাদের ৮০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সূত্রে জানা যায়।
প্রায় চার মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধ শুরু করলে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে চান, যাতে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। তিনি আরও চেয়েছিলেন ইরান যেন প্রতিবেশীদের ওপর হামলার সক্ষমতা হারায়, আঞ্চলিক ইসরায়েলবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন বন্ধ করে এবং অভ্যন্তরীণভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যায়।
কিন্তু সমঝোতা স্বাক্ষরের সময় তার এসব উদ্দেশ্যের কোনোটি পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। বরং ইরান আবারও জানিয়েছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না—যা বহু দশক ধরে তাদের অবস্থান, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসন এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এসেছে।
এছাড়া ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের সীমিত প্রক্রিয়াকরণ ও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার পরিদর্শনে সম্মত হয়েছে। তবে ট্রাম্পের চাওয়া অনুযায়ী এসব উপাদান দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচনার মাধ্যমে এখনো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও শক্তিশালী একটি চুক্তি সম্ভব, যা ২০১৫ সালের চুক্তির চেয়েও উন্নত হতে পারে—যে চুক্তি ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে বাতিল করেছিলেন।
তবে সমালোচকদের মতে, এখন ইরান আরও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, কারণ তারা একটি পরাশক্তির আক্রমণ সহ্য করেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব বজায় রেখেছে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল থেকে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পেয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, তারা ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে এবং যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় নতুন জাহাজ চলাচল ফি আরোপ করতে চায়, যদিও ৬০ দিনের আলোচনার সময় তা কার্যকর হবে না।
তেল বাজারে শুক্রবার দাম কমে যায়, কারণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার পর সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হতো।
লেবাননে, যেখানে যুদ্ধের কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, শুক্রবার নতুন ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয় বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানায়। ইসরায়েল দাবি করেছে, এসব হামলা হিজবুল্লাহ লক্ষ্যবস্তুকে কেন্দ্র করে ছিল।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প তার মিত্র ইসরায়েলকে কতটা চাপ দিতে পারবেন যাতে তারা এই অভিযান বন্ধ করে, যা তিনি এখন শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
চুক্তিতে লেবাননে যুদ্ধের 'স্থায়ী সমাপ্তি'র কথা বলা হলেও ইসরায়েল জানিয়েছে, তাদের সেনা প্রত্যাহারের কোনো ইচ্ছা নেই এবং বরং মানচিত্রে নতুন সম্প্রসারিত দখলকৃত অঞ্চল যোগ করেছে।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে সমালোচনা করেছেন, যা কয়েক দশকের মধ্যে দুই দেশের সম্পর্কে অন্যতম বড় উত্তেজনা ও বিভাজন সৃষ্টি করেছে।
