চলে যাচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা, এক দশক পর বার্ষিক পতনের মুখে ভারতের শেয়ারবাজার
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় আকারে টাকা তুলে নেওয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের ব্যবহার থেকে পিছিয়ে থাকার কারণে ভারতের শেয়ারবাজার এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো বার্ষিক ক্ষতির মুখে রয়েছে। রয়টার্সের এক জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্লেষকেরা এমন পূর্বাভাস দিয়েছেন।
বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ ভারতের প্রধান শেয়ারসূচকগুলো বর্তমানে অধিকাংশ প্রতিদ্বন্দ্বী বাজারের তুলনায় দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ২৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি শেয়ার বেচে দিয়েছেন, যা গত বছরের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশার কারণে ভারতের শেয়ারবাজারকে একসময় যে উচ্চ মূল্যায়ন করা হতো, তা এখন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বর্তমানে ভারতীয় বাজারে শেয়ারের মূল্য-আয় অনুপাত ২০ গুণের বেশি, যা ইউরোপের বেশির ভাগ বড় বাজার ও উদীয়মান অর্থনীতির তুলনায় বেশি। তবে বিশ্বের অন্যতম নিম্ন লভ্যাংশ হার পাওয়া যায় এই বাজারে।
এর ফলে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক সস্তা বাজার এবং এআই-নির্ভর উচ্চ মুনাফার সুযোগের দিকে ঝুঁকছেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে।
দক্ষিণ কোরিয়ার এআই-নির্ভর কোসপি সূচক গত এক বছরে ২০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে ভারতের প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি শেয়ারসূচক ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমেছে। এ বছর এখন পর্যন্ত নিফটি ৫০ সূচক প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।
১৫ থেকে ২৭ মে পর্যন্ত ২৪ জন বিশ্লেষকের মধ্যে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের শেষে সূচকটি ২৬ হাজার পয়েন্টে পৌঁছাতে পারে। তবে এ পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে সূচকটির বার্ষিক ভিত্তিতে প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পতন হবে, যা ২০১৫ সালের পর প্রথম বার্ষিক ক্ষতি হবে। এরপর ২০২৭ সালের মাঝামাঝি ২৭ হাজার এবং বছরের শেষে ২৯ হাজার পয়েন্টে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএসই সেনসেক্স ২০২৬ সালের শেষে ৮৪ হাজার ১৫০ এবং ২০২৭ সালের মাঝামাঝি ৮৭ হাজার ৮৯৫ পয়েন্টে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে পরিচালিত জরিপের তুলনায় উভয় সূচকের পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে।
সোসিয়েতে জেনেরালের এশিয়া শেয়ারবাজার কৌশলবিদ রজত আগারওয়াল বলেন, 'দিনের শেষে বিদেশি বা দেশীয়—সব বিনিয়োগকারীই মুনাফা চান। কিন্তু বাজারে প্রত্যাশিত মুনাফা নেই, আয়ের প্রবৃদ্ধিও খুব কম। বর্তমানে এআই-ই সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেত্র। আর এ জায়গায় ভারত শুধু পিছিয়েই নেই, বরং প্রতিকূল অবস্থানে রয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, মাসিক সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (এসআইপি) বিনিয়োগের মাধ্যমে বাজারকে সচল রাখা দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও চাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
খুচরা বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত মাসিক মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগ ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত এসআইপি গত এক দশকে প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। বর্তমানে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারের রেকর্ড পরিমাণ মালিকানা ধরে রেখেছেন, আর বিদেশি মালিকানা নেমে এসেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম গ্রোর ট্রেজারি প্রধান অমন সেথিয়া বলেন, 'দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও খুচরা বিনিয়োগকারীদের কারণেই বাজার টিকে আছে। এটি না থাকলে গত এক বছরে নিফটি ৫০ সূচক ১৯ হাজার বা ২০ হাজার পয়েন্টে নেমে যেত।'
২৪ জন বিশ্লেষকের মধ্যে ১৩ জন মনে করেন, আগামী তিন মাসে ভারতের বাজারে আরও পতনের আশঙ্কা রয়েছে।
তাদের মতে, বৈশ্বিক এআইভিত্তিক বিনিয়োগে ভারতের সীমিত অংশগ্রহণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে।
সিডি ইকুইসার্চের পরিচালক কিশান গুপ্ত বলেন, 'আমাদের রপ্তানি বাড়ছে না, অন্যদিকে জ্বালানির উচ্চ মূল্যের কারণে আমদানি ব্যয় আরও বাড়বে। করপোরেট আয়ের প্রবৃদ্ধিও খুব শক্তিশালী নয়। ফলে আমরা খুব সুবিধাজনক অবস্থানে নেই।'
তিনি বলেন, বিশেষ করে এআই খাতে উদ্ভাবননির্ভর আয় সৃষ্টির ক্ষেত্রে ভারতের করপোরেট খাত যথেষ্ট অগ্রগতি করতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের দেশে উদ্ভাবনের সংস্কৃতির অভাব স্পষ্ট।'
