মোদির পাকিস্তানকে একঘরে করার প্রচেষ্টা যেভাবে ‘বুমেরাং’ হলো
বক্তৃতার মঞ্চে মুষ্টিবদ্ধ হাত দিয়ে সজোরে আঘাত করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানের নেতাদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যে এক বিশাল জনসভায় তিনি বলেছিলেন, "ভারত আপনাদের বিচ্ছিন্ন করতে সফল হয়েছে এবং আমরা এই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করব। আমরা নিশ্চিত করব যে আপনারা সারা বিশ্বে একঘরে হয়ে পড়েন।"
সময়টি ছিল ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর। কয়েক দিন আগে ভারত-শাসিত কাশ্মীরে সশস্ত্র যোদ্ধাদের এক হামলায় ১৮ জন ভারতীয় সেনা নিহতের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মোদি এই মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "পাকিস্তানের নেতাদের শোনা উচিত: আমাদের ১৮ জন সেনার আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।"
অথচ এক দশক পর দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে অনেক দূরে। দেশটি এখন চীনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র, যেখানে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চলতি সপ্তাহেই সফর করেছেন। একইসাথে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে ফের যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান।
গত এক বছরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ—উভয়ই হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। চলমান যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে ইসলামাবাদ। ট্রাম্পও বারবার পাকিস্তানি নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি একদিকে যেমন ট্রাম্পকে তুষ্ট করতে পাকিস্তানের সাফল্যের প্রতিফলন, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে পরাশক্তি ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে নিজেকে অপরিহার্য কূটনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সক্ষমতা। তবে একইভাবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের এই ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক মর্যাদা মোদি প্রশাসনের ভুল পদক্ষেপগুলোকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
অ্যাটলান্টিক কাউন্সিল থিঙ্ক ট্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান আল-জাজিরাকে বলেন, "অবশ্যই আঞ্চলিক ও বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানকে দুর্বল করার এবং একঘরে করার ভারতের যে কৌশল ছিল, তা বড় আকারে বুমেরাং হয়েছে।"
যুদ্ধবিরতি এবং নোবেল মনোনয়ন
১০ মে, ২০২৫ তারিখে ট্রাম্প ঘোষণা করেন তিনি পারমাণবিক শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছেন। তার 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে তিনি লেখেন, "যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ এক রাত আলোচনার পর, আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে ঘোষণা করছি যে ভারত ও পাকিস্তান একটি পূর্ণাঙ্গ ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।"
এর পরপরই পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পের "নেতৃত্ব ও সক্রিয় ভূমিকার" জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, যার মাধ্যমে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান এবং ড্রোন ব্যবহার করে চালানো চার দিনের তীব্র লড়াইয়ের অবসান ঘটে। এটি ছিল কয়েক দশকের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভয়াবহতম লড়াই, যেখানে তাদের সীমান্তের উভয় পাশে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়েছিল।
ভারত-শাসিত কাশ্মীরে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহতের প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় সামরিক বাহিনী পাকিস্তানি ভূখণ্ডের গভীরে "সন্ত্রাসী" আস্তানায় হামলা চালালে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়।
কিন্তু শাহবাজ শরিফের বিপরীতে মোদি—যিনি কয়েক মাস আগেই ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে ব্যক্তিগত সখ্যতা গড়ে তুলেছিলেন—পুরোপুরি নীরব থাকার পথ বেছে নেন, যদিও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সেই যুদ্ধবিরতির কথা নিশ্চিত করেছিলেন।
কয়েক দিন পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে কাশ্মীর ইস্যুতে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে সহায়তার প্রস্তাব দেন। ১৯৪৭ সাল থেকেই এই কাশ্মীর ইস্যু ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের মূল বিষফোঁড়া হয়ে আছে।
ভারতের জন্য ট্রাম্পের এই শান্তিদাতা সাজার প্রচেষ্টা ছিল অস্বস্তিকর। ভারত দীর্ঘকাল ধরে দাবি করে আসছে যে প্রতিবেশীর সাথে তাদের বিরোধগুলো সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক এবং এটি তাদের নিজেদেরই সমাধান করতে হবে—যদিও ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ অবসানে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ভূমিকা রেখেছিলেন।
জুন মাসে মোদি যখন কানাডা সফরে ছিলেন, তখন ট্রাম্প তাকে ওয়াশিংটনে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। মোদি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ফোনে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলেন যে দিল্লি কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা গ্রহণ করবে না এবং মে মাসের যুদ্ধবিরতি ছিল মূলত পাকিস্তানের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ফল।
তা সত্ত্বেও মে মাসের সেই যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবির লড়াই চলতে থাকে। ট্রাম্প এর পর থেকে অন্তত ৩০ বার দাবি করেছেন যে তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘটিয়েছেন। তিনি দাবি করেন যে তিনি একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকিয়েছেন যা লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করতে পারত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন যে যুদ্ধের প্রথম দিনেই ভারতের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছিল, যা পাকিস্তানের ভাষ্যকেই সমর্থন করে।
বিশ্লেষকদের মতে, মে ২০২৫-এর লড়াইয়ের কারণ হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা সম্পর্কেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভারত সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। কুগেলম্যান বলেন, "বিশ্ব পিছিয়ে গিয়ে ভারতকে হামলার জন্য উৎসাহিত করেনি... বিশ্বনেতারা লক্ষ্য করেছেন যে পহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ ভারত দিতে পারেনি।" তার মতে, পাকিস্তান এই "বৈশ্বিক ন্যারেটিভের যুদ্ধে" জয়ী হয়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, "পাকিস্তান একটি সংঘাতে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে এবং ভারতের বেশ কয়েকটি জেট বিমান ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে... এটি হোয়াইট হাউসসহ সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে।"
বিমানের পতনের বিষয়ে দিল্লির প্রায় তিন সপ্তাহের নীরবতা এই ধারণাকে আরও পোক্ত করে। ভারতের শীর্ষ জেনারেল শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেন যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান পাকিস্তান ভূপাতিত করেছে, যদিও ভারত কখনো সেই সংখ্যাটি নিশ্চিত করেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কৃতিত্ব দিতে মোদির অস্বীকৃতি যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কে ফাটল ধরায়।
অন্যদিকে পাকিস্তান তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্পের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে এবং এমনকি তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয়—যা ট্রাম্পের মতে তিনি নিজেই পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। ট্রাম্প, যিনি তার প্রথম মেয়াদে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে 'প্রতারণা ও মিথ্যার' অভিযোগ এনেছিলেন, তিনি এখন সেনাপ্রধান আসিম মুনিরসহ পাকিস্তানি নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করছেন। ভারতের হতাশা বাড়িয়ে ট্রাম্প আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানান—এটি ছিল প্রথমবার যখন পাকিস্তানের কোনো সেনাপ্রধান (যিনি প্রেসিডেন্ট নন) মার্কিন প্রেসিডেন্টের আতিথেয়তা পেলেন। ট্রাম্প আসিম মুনিরকে তার "প্রিয় ফিল্ড মার্শাল" এবং একজন "অসাধারণ মানুষ" হিসেবে বর্ণনা করেছেন—যেখানে দিল্লি তাকে ভারতের বিরুদ্ধে "সন্ত্রাসবাদের" রূপকার হিসেবে চিত্রিত করে।
'সন্ত্রাস ও আলোচনা একসাথে চলতে পারে না'
কয়েক দশক ধরে ভারত সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে "কৌশলগত সংযম" বা স্ট্যাটেজিক রিস্ট্রেইন্ট নীতি অনুসরণ করে আসছিল। ৯০-এর দশকে যখন ভারত তার অর্থনীতি উন্মুক্ত করে, তখন তারা নিজেকে একটি দায়িত্বশীল উদীয়মান শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল যারা অর্থনৈতিক ইস্যুতে বেশি মনোযোগী। তারা পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে কূটনীতি ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাবকে ব্যবহার করত, যাতে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানো যায়।
এই নীতির কারণেই ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার পাকিস্তানে আক্রমণ করা থেকে বিরত ছিল। কিন্তু মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি বিরোধী দলে থাকাকালীন সেই সংযমের জন্য কংগ্রেসের তীব্র সমালোচনা করত।
ক্ষমতায় আসার পর মোদিও শুরুতে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান এবং লাহোরে শরিফের নাতনির বিয়েতে আকস্মিক সফর করেন।
কিন্তু ২০১৬ সালের হামলার পর, যার দায় পাকিস্তান সমর্থিত গোষ্ঠীর ওপর চাপানো হয়েছিল, দিল্লি তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলে এবং পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ডাক দেয়। "সন্ত্রাস ও আলোচনা একসাথে চলতে পারে না"—এটিই হয়ে ওঠে মোদি সরকারের মূলমন্ত্র।
এর পরিবর্তে তারা পাকিস্তানি মদদপুষ্ট বলে অভিযুক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার বিপরীতে সামরিক জবাব দেওয়ার সীমা কমিয়ে আনে। ২০১৬ সালের হামলার পর ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের ভেতরে কথিত সন্ত্রাসী ক্যাম্পে 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' চালায়। এরপর ২০১৯ সালে কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ৪০ জন ভারতীয় সেনা নিহতের পর ভারতীয় যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের বালাকোটে হামলা চালায়—যা ছিল ২০১৬ সালের চেয়েও বড় পদক্ষেপ।
অনেক বছর ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের এই কঠোর অবস্থান কাজ করছে বলে মনে হয়েছিল, এমনকি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ এবং জো বাইডেন প্রশাসনের সময়েও। মোদি ঘনঘন ওয়াশিংটনে যেতেন। ট্রাম্প ও বাইডেন দুজনেই ভারত সফর করেছেন, কিন্তু কেউ পাকিস্তান যাননি।
গত বছরের সামরিক সংঘাতের পর সেই সমীকরণ বদলাতে শুরু করে। ওয়াশিংটন ও দিল্লির মধ্যকার ২০ বছরের কৌশলগত সম্পর্ক আগেই ট্রাম্পের 'ট্যারিফ ওয়ার' বা শুল্ক যুদ্ধের কারণে চাপে ছিল, যেখানে ভারতকে বিশ্বের সর্বোচ্চ শুল্কের মুখে পড়তে হয়েছিল। বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমে সেই শুল্ক এখন কমলেও উত্তেজনা রয়ে গেছে।
চলতি সপ্তাহে যখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারত সফর করেন, তখন তিনি দিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের একটি অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের ফোনকল পান, যেখানে ট্রাম্প বলেন তিনি "ভারত ও মোদিকে ভালোবাসেন।" কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের ওপর চাপ বজায় রেখেছে।
২৩ মে রুবিও এক পোস্টে জানান যে ভারত আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এমন এক সময়ে যখন দিল্লির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গেছে। তদুপরি, রুবিও ভারতের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপকে বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতার দোহাই দিয়ে যুক্তিসঙ্গত বলে দাবি করেন।
রুবিওকে সাংবাদিকরা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর পাকিস্তানের ছায়া নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, তিনি কোনো দেশের সাথেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে "ভারতের সাথে কৌশলগত মিত্রতার বিনিময়ে" হিসেবে দেখেন না। তবে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ভারতের প্রচেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংহতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে—এবং দিল্লির পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতির পরিবর্তনগুলো প্রতিবেশীর তুলনায় ভারতের অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে।
পিছিয়ে পড়া ও পটপরিবর্তন
২০১৪ সালের মে মাসে যখন মোদি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তখন তার সামনে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তিনি তার পররাষ্ট্রনীতিকে "প্রতিবেশী প্রথম" ধারণা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন।
কিন্তু দুই বছর পর ২০১৬ সালের সেই হামলার পর মোদি সরকার ঘোষণা করে যে তারা ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া 'সার্ক' শীর্ষ সম্মেলন বয়কট করবে। সম্মেলনটি বাতিল হয়ে যায় এবং দক্ষিণ এশিয়ার এই প্রধান জোটটির আর কোনো শীর্ষ বৈঠক এরপর অনুষ্ঠিত হয়নি। পরিবর্তে ভারত 'বিমসটেক'-কে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে যেখানে পাকিস্তান নেই, তবে সেটিও একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে।
ইসলামাবাদের কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমদ বলেন, "পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে ভারত কার্যকরভাবে সার্ককেই বিসর্জন দিয়েছে।"
এদিকে ভারতের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে উন্নত হয়েছে। গত বছরের যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সাথে চীনের সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে। পাকিস্তান চীনের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছিল। চলতি সপ্তাহে শাহবাজ শরিফের চীন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বেইজিং ও ইসলামাবাদের সম্পর্ককে "অক্ষয়" বলে প্রশংসা করেছেন।
তবে মোদির অধীনে ভারত কেবল সার্কই ত্যাগ করেনি, অনেক বিশ্লেষকের মতে দিল্লি তার দীর্ঘদিনের "কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন" নীতি থেকেও সরে এসেছে—যার অর্থ ছিল কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে না ঢুকে সব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সাথে কাজ করা।
১৯৬০-এর দশক থেকে ভারত ১২০টি দেশের জোট 'জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন'-এর নেতৃত্বে ছিল। তারা কেবল জাতিসংঘের অনুমোদন পেলেই অন্য দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক পদক্ষেপে সমর্থন দিত। ব্রাসেলস ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দন্তি বলেন, "গত এক দশকে ভারত তার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে বিশ্বমঞ্চে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠেছে, ফলে তারা ভারসাম্যপূর্ণ জোটনিরপেক্ষ নীতি থেকে সরে এসে আরও বেশি 'ট্রানজ্যাকশনাল' বা লেনদেন-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে।"
এই নীতি পরিবর্তনের প্রথম লক্ষণ দেখা গিয়েছিল মোদির পূর্বসূরি মনমোহন সিংয়ের আমলে। ২০১৩ সালে যখন ওবামা প্রশাসন পারমাণবিক আলোচনার অংশ হিসেবে ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তখন ভারত ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা কমিয়ে দেয়। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প যখন ইরানের ওপর 'সর্বোচ্চ চাপ' নীতি প্রয়োগ করে নিষেধাজ্ঞা দেন, মোদি সরকার ইরান থেকে তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।
ভারতের অন্যতম সম্মানিত পত্রিকা 'দ্য হিন্দু'-র ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার গত ২২ এপ্রিল লিখেছেন, "এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কেবল ভারতের অর্থনীতির ক্ষতি করছে না, এগুলো ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে অন্যের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করছে এবং ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের গর্বিত মূলনীতির ওপর বড় আঘাত।"
ইসরায়েল এবং ইসলামোফোবিয়া
ভারত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতেও তার অবস্থান বদলেছে। ১৯৭৪ সালে দিল্লিই ছিল প্রথম কোনো অ-আরব রাজধানী যা পিএলও-কে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর অন্যতম ছিল ভারত। ১৯৯২ সালের আগে ইসরায়েলের সাথে ভারতের কোনো প্রকাশ্য কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী দুই দশকে ভারত ধীরে ধীরে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুললেও ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাদের দৃঢ় সমর্থন বজায় ছিল।
কিন্তু মোদির অধীনে ভারত ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতম মিত্রে পরিণত হয়েছে—বিশেষ করে ইসরায়েলি অস্ত্রের বৃহত্তম ক্রেতা এখন ভারত। দিল্লি এখন জাতিসংঘের ইসরায়েল-বিরোধী প্রস্তাবগুলোতে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকছে। গত মাসের ব্রিকস সম্মেলনে ভারত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে কড়া ভাষা নরম করার চেষ্টা করেছে, যা তাদের দীর্ঘদিনের দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের অবস্থান থেকে বিচ্যুতি। গাজায় চলমান গণহত্যা নিয়ে ভারত একবারও নিন্দা জানায়নি।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তার মাত্র দুই দিন আগে মোদি ইসরায়েল সফর করেছিলেন। এটি এমন এক সময়ে ঘটে যখন ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে একটি আঞ্চলিক একাধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের বিরোধী দলগুলো এই সফরকে "ভুল সময়ের সফর" হিসেবে অভিহিত করেছে, কারণ এটি ভারতকে এই অঞ্চলে একটি পক্ষপাতদুষ্ট পক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে যা মূলত ভারতের জ্বালানি আমদানির প্রধান উৎস।
দন্তি বলেন, "ইরান যুদ্ধ ভারতকে এক কঠিন অবস্থানে ফেলেছে কারণ ইসরায়েলের সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক।"
মোদির এই ইসরায়েলঘেঁষা অবস্থান, যেখানে তিনি আইসিসি-র গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও নেতানিয়াহুকে তার বন্ধু বলে ডাকছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে ভারতের গ্রহণযোগ্যতাকে জটিল করে তুলেছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই পাকিস্তান তেলসমৃদ্ধ জিসিসি দেশগুলোর সাথে তাদের নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব গভীর করেছে। ইসরায়েলের বহুমুখী যুদ্ধ—গাজা, পশ্চিমতীর, লেবানন ও ইরানে হামলা এবং কাতার ও সিরিয়ায় বোমাবর্ষণের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আর কেবল মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করতে চাইছে না।
গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব পাকিস্তানের সাথে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘোষণা করে—যেটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী একমাত্র মুসলিম দেশ। কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে তুরস্কসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোও এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে। গত মে মাসের যুদ্ধ নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে পাকিস্তানের ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে: পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের চাহিদা বেড়েছে এবং চীনের সামরিক সরঞ্জাম বিশ্বের নজর কেড়েছে।
একইসাথে মোদি সরকারের ক্রমবর্ধমান মুসলিম-বিরোধী নীতি বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশীদের সাথে ভারতের উত্তেজনা বাড়িয়েছে এবং মাঝেমধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর তিরস্কারের মুখে পড়তে হয়েছে। ২০২২ সালের মে মাসে বিজেপির তৎকালীন মুখপাত্র নূপুর শর্মা মহানবী (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এবং ভারতীয় দূতদের তলব করা হয়।
২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে পিটিয়ে হত্যা, মসজিদ ধ্বংস, মুসলিমদের ভোটাধিকার হরণের চেষ্টা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে বিধিনিষেধের মতো ঘটনাগুলো শিরোনামে রয়েছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্যাতনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পাকিস্তান এই ইস্যুগুলোকে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরিতে ব্যবহার করেছে। ইমরান খানের আমলে পাকিস্তান জাতিসংঘে ক্রমবর্ধমান মুসলিমবিদ্বেষের বিষয়টি তুলে ধরে এবং ওআইসি-এর সাথে সমন্বয় করে ১৫ মার্চকে 'আন্তর্জাতিক ইসলামোফোবিয়া প্রতিরোধ দিবস' হিসেবে ঘোষণা করতে জাতিসংঘকে বাধ্য করে।
পাকিস্তান ট্রাম্পকে তুষ্ট করছে
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে পাকিস্তান বিরল খনিজ সম্পদ এবং ক্রিপ্টো মাইনিং সংক্রান্ত চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনকে কাছে টেনেছে। গত জুলাইয়ে পাকিস্তান বিরল খনিজ সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সরবরাহের চুক্তি করে—যা উদীয়মান প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য কিন্তু বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে। একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানের খনিজ খাতে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সেনাপ্রধান মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সাথে দেখা করেন। গত ডিসেম্বরে মুনিরকে মিয়ামিতে ট্রাম্পের মার-এ-লাগো রিসোর্টেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক দূত মাসুদ খান বলেন, ইসলামাবাদ গত এক বছরে "চতুর কূটনীতি"র মাধ্যমে ওয়াশিংটনে হারানো জমি পুনরুদ্ধার করেছে। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, "ট্রাম্প ও আসিম মুনিরের মধ্যকার এই ঘনিষ্ঠতা খনিজ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি চুক্তির মাধ্যমেই মজবুত হয়েছে।"
পাকিস্তানের জন্য এই ঘনিষ্ঠতা কয়েক দশকের সেই অবিশ্বাস দূর করতে সাহায্য করেছে যা "সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ" চলাকালীন ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছিল। ২০০১-এর পর পাকিস্তান যখন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ছিল, তখন ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা আফগান তালেবানদের আশ্রয় দিচ্ছে। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে ওসামা বিন লাদেন নিহতের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ আরও বাড়িয়েছিল।
সেই পুরো সময়জুড়ে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কাশ্মীরে সশস্ত্র বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার অভিযোগ এনেছে এবং সেটিকে আল-কায়েদার মতো বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সাথে যুক্ত একটি ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে। প্রায় দুই দশক ধরে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি জোরালো আন্তর্জাতিক মামলা তৈরি করেছিল। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পর তারা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন ফোরামে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করার চেষ্টা বাড়ায় এবং পাকিস্তানের 'টেরর ফান্ডিং' খতিয়ে দেখার জন্য চাপ দেয়।
পাকিস্তান তখন বিশ্বজুড়ে নজরদারির মুখে পড়ে এবং তাদের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। দেশটিতে বিনিয়োগ শুকিয়ে যায়, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টগুলো বাতিল হয় এবং বিশ্ব রাজধানীগুলো তাদের নাগরিকদের পাকিস্তান ভ্রমণে সতর্কতা জারি করে। ভারত ঠিক এটাই চেয়েছিল।
কিন্তু অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমদ বলেন, "ভারত ধরে নিয়েছিল যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৯/১১ পরবর্তী এই ন্যারেটিভ স্থায়ী হয়ে গেছে।" কিন্তু পাকিস্তান নিরবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ফেরাতে কাজ শুরু করে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন ও নেতৃত্বের ওপর আঘাত হানে। তিনি বলেন, পাকিস্তান কয়েক দশকের চরমপন্থা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন আদর্শিক সংঘাতের বদলে কূটনীতি, কানেক্টিভিটি এবং অর্থনৈতিক সংহতির দিকে নিজেকে নিয়ে গেছে। এখন পাকিস্তান কেবল সংকটে প্রতিক্রিয়া জানায় না, বরং আঞ্চলিক ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। তিনি আরও বলেন, "পাকিস্তান এখন ওয়াশিংটন, তেহরান, রিয়াদ ও বেইজিংয়ের সাথে সমানভাবে বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে, যা ২০০১-পরবর্তী সময়ের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই।"
সাম্প্রতিক লক্ষণগুলো বলছে ভারতও তাদের কৌশলের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারছে। খবর পাওয়া গেছে যে গত তিন মাসে দুই দেশের সাবেক সেনাপ্রধান ও অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকরা দুইবার গোপনে বৈঠকে বসেছেন। বিজেপির আদর্শিক গুরু আরএসএস-এর একজন জ্যেষ্ঠ নেতা পাকিস্তানের সাথে আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন এবং সাবেক ভারতীয় সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নারাভানেও সেই প্রস্তাব সমর্থন করেছেন।
একইসাথে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে যা গত এক বছরে স্থবির হয়ে গিয়েছিল। রুবিওর ভারত সফর ছিল সেই সম্পর্কের 'রিসেট' করার একটি পদক্ষেপ।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা
কিন্তু রুবিও সেই 'বড় পুরস্কার' নন যা পাওয়ার প্রত্যাশা দিল্লি করেছিল। ২০২৫ সালের জুনে যখন মোদি ফোনে ট্রাম্পকে জানিয়েছিলেন যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি ছিল দ্বিপাক্ষিক, তখনই তিনি ট্রাম্পকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ দিয়েছিলেন। এক বছর পেরিয়ে গেলেও ট্রাম্প ভারত সফর করেননি, যদিও গত সপ্তাহে তিনি চীন ভ্রমণ করেছেন এবং বলেছেন তিনি ইরানের সাথে শান্তি চুক্তি সই করতে পাকিস্তান যেতে প্রস্তুত।
সবসময় এমনটা ছিল না। গত ২৫ বছরে জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা, ট্রাম্প এবং জো বাইডেন—চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্টই ভারতের সাথে সম্পর্কের বিকাশ ঘটিয়েছেন। ওয়াশিংটন ভারতকে চীনের বিপরীতে এক ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দেখে আসছিল। ওবামা দুইবার ভারত সফর করেছেন। বিপরীতে বুশের পর আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তান সফর করেননি।
চীনের প্রভাব মোকাবিলায় ভারত রাশিয়ার বদলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে জেট ও ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে শুরু করে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া মিলে গঠন করে 'কোয়াড'। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প এশিয়ার ওপর নজর কমিয়ে দিয়েছেন। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া-তে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কোয়াডের ওপর আগ্রহ হারিয়েছে। ২০২৫ সালে কোনো কোয়াড সম্মেলন হয়নি এবং পরবর্তীটি কবে হবে তাও অনিশ্চিত। তিনি বলেন, "ভারত সম্ভবত ট্রাম্প প্রশাসনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের ভৌগোলিক কাঠামোর সাথে খাপ খাচ্ছে না।"
পরিবর্তে ট্রাম্প এখন শুল্ক যুদ্ধ, অভিবাসন নীতি এবং ভেনেজুয়েলা ও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অপারেশনে তার সমস্ত শক্তি ব্যয় করছেন। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, গত বছরের যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব ট্রাম্পকে না দেওয়ায় মোদি ও ট্রাম্পের সম্পর্কে শীতলতা তৈরি হয়েছে—অথচ এর আগে তারা হিউস্টন ও আহমেদাবাদে একসাথে জনসভা করেছিলেন।
ট্রাম্প ভারতের বিরুদ্ধে সংরক্ষণবাদের অভিযোগ তুলেছেন, রাশিয়ার সস্তা তেল কেনা বন্ধ করতে চাপ দিয়েছেন এবং ইরানের একটি বড় বন্দর প্রকল্পে ভারতকে দেওয়া ছাড় প্রত্যাহার করেছেন। তার প্রশাসন এইচ-১বি ভিসা বন্ধ করে দিয়েছে যা মূলত ভারতীয় আইটি পেশাজীবীদের জন্য বড় আঘাত। এমনকি ট্রাম্পের 'মাগা' আন্দোলনের একটি অংশ এখন ভারতীয়দের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বর্ণবাদী মন্তব্য করছে।
'এখনও শেষ হয়নি'
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত বা পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্কের এই চিত্র যে স্থায়ী হবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। সাংবাদিক আলিয়া জেহরা লিখেছেন যে পাকিস্তানের প্রতি ওয়াশিংটনের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমান প্রশাসনের পর বজায় থাকবে কি না তা নিশ্চিত নয়।
জিন্দাল স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ডিন শ্রীরাম চুলিয়া বলেন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ধাক্কা খেলেও এটি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেন, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং ভারত 'প্যাক্স সিলিকা'র মতো গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন উদ্যোগে যোগ দিয়েছে যা সেমিকন্ডাক্টর ও খনিজ সম্পদে চীনের আধিপত্য রুখতে তৈরি। তিনি মনে করেন ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ অংশীদারিত্ব হয়তো হবে না, তবে অর্থনীতির কিছু ক্ষেত্রে এটি বজায় থাকবে। তিনি আরও মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানকে একই পাল্লায় মাপছে না, কারণ ভারতের অর্থনীতি পাকিস্তানের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী।
আগামীর পথ
তবে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের আসল কাঁটা কাশ্মীর ইস্যু এখনও অমীমাংসিত। ম্যাসাচুসেটস কলেজ অফ লিবারেল আর্টস-এর সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জুনায়েদ বলেন, কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণই এই উত্তেজনার চাবিকাঠি। কাশ্মীর এখন বিশ্বের অন্যতম সামরিকায়িত অঞ্চল যেখানে সাড়ে সাত লাখ ভারতীয় সেনা রয়েছে। কয়েক দশকের সংঘাতে ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
২০১৯ সালে মোদি সরকার কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয় এবং একে সরাসরি দিল্লির নিয়ন্ত্রণে আনে। জুনায়েদ প্রশ্ন করেন, "কাশ্মীরকে দমন করে রেখে ভারত আসলে কী পাচ্ছে?" তিনি মনে করেন একমাত্র আলোচনার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। বর্তমানে কাশ্মীর একটি "বারুদের স্তূপ" হয়ে আছে। দক্ষিণ এশিয়ার সমৃদ্ধি নির্ভর করছে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অতি-জাতীয়তাবাদী কথাবার্তা কমিয়ে গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের ওপর।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অচিন ভানাইক বলেন, ভারতকে পাকিস্তানের 'নন-স্টেট অ্যাক্টর' বা সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং দেশটির নিয়মিত সামরিক বাহিনীর মধ্যে পার্থক্য করতে শিখতে হবে। তিনি পরামর্শ দেন নিয়ন্ত্রণ রেখার দুই পাশে ১০ কিলোমিটারের একটি অসামরিক এলাকা গঠন করা উচিত যা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী তদারকি করবে।
আইসিজি-র দন্তি সতর্ক করে বলেন, মূল বিরোধের সমাধান না হলে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে নতুন সংঘাত অনিবার্য। চীনের সরাসরি সামরিক সমর্থন থাকায় ভারত এখন আর পাকিস্তানকে কেবল দ্বিপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার বিলাসিতা করতে পারে না। এই হামলা, যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক শীতলতার চক্র ভাঙার একমাত্র উপায় হলো দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের গোপন আলোচনা বা 'ব্যাক চ্যানেল' চালু করা।
