আতা চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে ভারতে—কম পানি, বৈরী আবহাওয়াতেও টিকতে পারে
অশোকা শিভারেড্ডির জন্ম এক কৃষক পরিবারে। কিন্তু দক্ষিণ ভারতের খরাপ্রবণ জেলা কোলারে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা তাদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল।
তিনি বলেন, "এই এলাকায় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র ৬০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার। পানির খোঁজে কৃষকদের ১ হাজার ৩০০ ফুট পর্যন্ত গভীর নলকূপ খনন করতে হয়। ফলে তাদের উপার্জনের সিংহভাগ টাকাই চলে যায় সেচের পেছনে।"
একের পর এক লোকসানের মুখে পড়ে ২০০৫ সালে তাঁর পরিবার কৃষিকাজ ছেড়ে দেয়। এরপর তারা বেঙ্গালুরু শহরে চলে আসেন এবং সেখানে একটি সবজির দোকান দেন।
পরবর্তীতে শিভারেড্ডি একজন এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) সফটওয়্যার প্রকৌশলী হন; তবে কৃষির প্রতি তাঁর যে টান, তা কখনোই ম্লান হয়নি। ২০১৮ সালে তিনি তাদের পারিবারিক খামারটিকে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেন।
নিজ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, "আমি এমন একটি ফসলের খোঁজ করছিলাম যা খুব কম পানিতে টিকে থাকতে পারে, কেবল বৃষ্টির পানিতেই বেড়ে ওঠে এবং যার জন্য খুব বেশি কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না।"
এই মানদণ্ডে আতাফল (কাস্টার্ড অ্যাপল) তাঁর কাছে একদম উপযুক্ত বলেই মনে হলো। বড় আকারের অ্যাভোকাডোর মতো দেখতে অসমতল বা খাঁজকাটা চামড়ার এই ফলটির ভেতরের অংশ বেশ ক্রিমি ও মিষ্টি, যার স্বাদ কিছুটা কাস্টার্ডের মতো। আর এ কারণেই এর ইংরেজি নাম হয়েছে 'কাস্টার্ড অ্যাপল'।
শিভারেড্ডির এলাকায় প্রাকৃতিকভাবেই বুনো আতাগাছ জন্মাত এবং স্থানীয় বাসিন্দারা সেই ফল সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করত। বিষয়টি শিভারেড্ডির কাছে বেশ সম্ভাবনাময় মনে হয়েছিল।
ফলন সর্বোচ্চ করার উদ্দেশ্যে তিনি প্রথাগত খামারের তুলনায় ঘন করে আতাগাছ রোপণ করেন। পাশাপাশি তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আতার তিনটি জাত নির্বাচন করেন, যার প্রতিটির আলাদা আলাদা গুণ বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাঁর এই নতুন পদ্ধতি বেশ ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি বলেন, "গত বছর আমি প্রায় ২০ টন আতা উৎপাদন করেছি। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ টনে। ভারতের বাজারে তো বটেই, বিদেশেও আতাফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।"
শুষ্ক বা খরা পরিস্থিতিতে আতা গাছ টিকে থাকতে পারলেও, এর বাণিজ্যিকভাবে চাষের ক্ষেত্রে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
আতার ঐতিহ্যবাহী জাত 'বালানগর;-এর স্থায়িত্বকাল (শেল্ফ লাইফ) খুবই কম, বড়জোর তিন থেকে চার দিন। ফলে কৃষকদের দ্রুত এটি বিক্রি করতে হয়, যা তাদের বিক্রির সুযোগকে সীমিত করে দেয়। তাছাড়া এই জাতে বীজের সংখ্যাও অনেক বেশি থাকে, ফলে ক্রেতারা খুব বেশি এ জাতের আতা পছন্দ করেন না।
ব্যাঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব হর্টিকালচার রিসার্চের (আইআইএইচআর) প্রধান বিজ্ঞানী ড. শক্তিভেল টি বলেন, "ঐতিহ্যবাহী জাতগুলোর স্বাদ ও সুবাস চমৎকার হলেও— এগুলোতে শাঁসের পরিমাণ কম, বীজের সংখ্যা বেশি এবং খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।"
তাঁর নেতৃত্বে একটি গবেষক দল 'অর্ক সহন' নামের একটি হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন করেছে। এই জাতের আতা সাধারণ তাপমাত্রায় প্রায় এক সপ্তাহ ভালো থাকে। এতে বীজের সংখ্যাও কম এবং শাঁসের পরিমাণ অনেক বেশি। গত ২০ বছরে এই বিশেষ জাতটির চাষ সমগ্র দক্ষিণ ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে।
ড. শক্তিভেল জানান, "বুনো জাতগুলোতে যেখানে মাত্র ৩০ শতাংশ শাঁস পাওয়া যেত, সেখানে 'অর্ক সহন'-এর মতো হাইব্রিড জাতে তা ৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এর ফলে কৃষকদের বাড়তি কোনো জমির প্রয়োজন ছাড়াই ব্যবহারযোগ্য ফসলের পরিমাণ কার্যত দ্বিগুণ হয়ে গেছে।"
তাঁর গবেষক দল এখন এই ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং শাঁস বা পাল্প বের করার আরও উন্নত উপায় নিয়ে কাজ করছে, যাতে আইসক্রিম ও মিল্কশেকের মতো প্রক্রিয়াজাত খাবারে এর ব্যবহার আরও বাড়ানো যায়।
তবে বর্তমানে তারা একটি বড় সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন—ফল থেকে বের করার পর আতার শাঁস খুব দ্রুত বাদামি রঙ ধারণ করে। আইআইএইচআর-এর গবেষকরা এমন কিছু নতুন যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন, যা আতার শাঁসের স্বাভাবিক দুধসাদা রঙ দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
ভারতের মহারাষ্ট্র প্রদেশ আতা উৎপাদনের শীর্ষে রয়েছে। দেশটির মোট আতা উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে এই রাজ্য থেকে।
এই মহারাষ্ট্রেই গত কয়েক দশক ধরে আতা চাষ করে আসছেন নবনাথ মলহারি কাসপাতে। তিনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে আতার বীজ সংগ্রহ করেন এবং সেগুলোকে নিজের খামারে এনে 'ক্রস-পলিনেশন' বা পরপরায়ণ ঘটান।
তিনি বলেন, "আতাফল নিয়ে আগে কেউ সেভাবে মাথা ঘামায়নি বা কোনো গবেষণাও করেনি। তাই আমি নিজেই এটি নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। আতার একটি নতুন জাত উদ্ভাবন করতে ১২ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে। তাই এটি চটজলদি কোনো কাজ নয়, বরং কয়েক দশকের নিরলস পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল।"
তাঁর দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফল হিসেবে আসে উচ্চ ফলনশীল জাত 'এনএমকে-০১', যা তাঁর নামের আদ্যক্ষর দিয়ে নামকরণ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে এই জাতটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসে।
তিনি আরও বলেন, "আমরা এখন প্রায় ৫০ একর জমিতে আতা চাষ করছি, প্রতি একরে ফলন হচ্ছে প্রায় ১০ টন। এই উন্নত জাতটি সহজে নষ্ট হয় না বলে বিদেশে রপ্তানির এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে আতা রপ্তানি শুরু করেছি, এমনকি ইউরোপেও পাঠাচ্ছি— যা এর আগে এত বড় পরিসরে কখনো করা সম্ভব হয়নি।"
কাসপাতের গবেষণার কাজ এখনও থেমে নেই। বর্তমানে তিনি এমন একটি জাত নিয়ে কাজ করছেন যা দেখতে আরও সুন্দর হবে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হবে অনেক বেশি।
মনোজ কুমার বারাই নামের এক ব্যবসায়ী যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং ইউরোপে এই 'এনএমকে-০১' জাতের আতা রপ্তানি করছেন। তিনি বলেন, "রপ্তানির জন্য আমরা 'এনএমকে-০১' জাতটিকে বেশি পছন্দ করি। কারণ অন্য জাতগুলোর তুলনায় এর স্থায়িত্বকাল বেশি; চামড়া বা খোসা বেশ পুরু, শাঁস বেশি এবং এটি খেতেও অনেক বেশি মিষ্টি।"
তবে আতার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নরম একটি ফল বিদেশে রপ্তানি করার পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল ও সূক্ষ্ম প্রক্তিয়ার মধ্যে দিয়ে যায়।
তিনি জানান, "আমাদের প্রতিটি ধাপ নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করতে হয়। ফল তোলার সময়, প্যাকেজিং হাউজে পাঠানো, বিমানবন্দরে স্থানান্তর, ফ্লাইটের সময়সূচি এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স—এখানে প্রতিটি ঘণ্টাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।"
মনোজ কুমার বলেন, "আতাফল তাপের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সামান্য সময়ের জন্য অতিরিক্ত তাপে থাকলে এর গুণগত মান ও স্থায়িত্ব কমে যায়।" তাই তীব্র গরম এড়াতে সড়কপথে সাধারণত রাতের বেলাতেই এই ফল পরিবহন করা হয়।
"মহারাষ্ট্রের মতো অঞ্চলে তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়। পরিবহনের সময়ও তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে, যা এই ফলের জন্য মোটেও অনুকূল নয়" –তিনি বলছিলেন।
গাছ থেকে ফল কাটার পর টানা পাঁচ ঘণ্টা 'প্রি-কুলিং' বা শীতলীকরণ করা হয়। এরপর সেগুলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা রেফ্রিজারেটেড ভ্যানে করে পাঠানো হয় এবং বিমানে তোলার আগে কোল্ড রুমে সংরক্ষণ করা হয়।
ফলগুলোকে সুরক্ষিত এবং ঠান্ডা রাখতে বিশেষ ধরনের ঢেউখেলানো কাগজের বাক্স (করুগেটেড বক্স) তৈরি করা হয়েছে। বারাইয়ের মতে, বর্তমানে আতাফল আস্ত রপ্তানি করার চেয়ে এর শাঁস বা গুঁড়ো (পাউডার) আকারে রপ্তানি করার প্রবণতা বাড়ছে, যা এই রপ্তানি শিল্পে একটি 'বিপ্লব' নিয়ে এসেছে।
বিদেশের আইসক্রিম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান, বেকারি এবং বিভিন্ন 'পাল্প-শট' ক্যাফেতে আতার এই শাঁস ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়াটিও সহজ নয়, কারণ আতার শাঁস মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (-১৮° সে.) তাপমাত্রায় সংরক্ষণ ও পরিবহন করতে হয়।
তা সত্ত্বেও এটি বিমান ভাড়ার তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী এবং এর ফলে কোনো ফল নষ্ট না করেই সপ্তাহজুড়ে বিপুল পরিমাণ শাঁস বিদেশে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।
এদিকে কোলারে ফিরে এসে শিভারেড্ডিও আস্ত আতা বিক্রির পাশাপাশি এর শাঁস বিক্রি করে নিজের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চান।
তিনি একটি শাঁস প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট বা কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন, যেখানে উৎপাদিত ফসলের অবিক্রিত অংশ ব্যবহার করা হবে।
তবে আতার শাঁস বের করা এবং তা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (-২০° সে.) তাপমাত্রায় ঠান্ডা করার জন্য যন্ত্রপাতির পেছনে বড় অংকের বিনিয়োগের প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, এর জন্য অনেক কৃষকের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।
তিনি বলেন, "আতা চাষের বিষয়টি একটি অদ্ভুত দোলাচলের মধ্যে রয়েছে। একদিকে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু অন্যদিকে এর চাষাবাদে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগেনি। কারণ এই ফসলটি প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত সহনশীল বা শক্ত প্রকৃতির। এটি অনুর্বর মাটিতেও জন্মায়, খুব কম পানির প্রয়োজন হয় এবং কেবল বৃষ্টির পানিতেই বেঁচে থাকে। ফলে কৃষকদের ব্যয়বহুল সেচব্যবস্থা, সেন্সর কিংবা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের প্রয়োজন হয় না। আর এ কারণেই প্রযুক্তির ব্যবহারও এটি চাষের বেলায় বেশ কম।"
