পশ্চিমে গুরুত্ব হারানো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কৌশলগত বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে চীন ও ভারত
চীনের উত্তরাঞ্চলের ইনার মঙ্গোলিয়ার চিফেং এলাকার বিস্তীর্ণ, বাতাসে ভরা তৃণভূমিতে পাহাড়ের চূড়ায় সারি সারি সাদা বায়ু টারবাইন দাঁড়িয়ে আছে—যেন কয়লা থেকে হাইড্রোজেন শিল্পকে সরিয়ে নিতে বেইজিংয়ের প্রচেষ্টার নীরব প্রহরী এরা।
এগুলো একটি ২ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের অংশ—যা এ ধরনের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ। এখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে ইলেক্ট্রোলাইজারের মাধ্যমে হাইড্রোজেন উৎপাদন করা হয়, যা সার, সামুদ্রিক জ্বালানি এবং কম নির্গমনযুক্ত ইস্পাত উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
ভারতও চীনের মতো 'গ্রিন হাইড্রোজেন' নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা করেছে, তবে তাদের লক্ষ্য আরও স্পষ্ট ও আক্রমণাত্মক।
প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকি সহায়তায়, ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ৫০ লাখ মেট্রিক টন গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে নয়াদিল্লি—যা বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারের পাঁচ গুণ এবং বিশ্লেষকদের মতে সেই সময়ে চীনের সম্ভাব্য উৎপাদনের প্রায় দ্বিগুণ।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই দুই দেশের বিশাল বিনিয়োগ এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন পশ্চিমা দেশগুলো দশকের শুরুতে নির্ধারিত তাদের উচ্চাভিলাষী গ্রিন হাইড্রোজেন লক্ষ্য থেকে নীরবে সরে আসছে, কারণ ব্যয় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয়ে গেছে।
চীন ও ভারতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো—তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও ক্ষমতা আছে বাজার তৈরি করার। তারা প্রকল্পে অর্থায়ন, চাহিদা তৈরি এবং বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের মাধ্যমে খরচ কমিয়ে বাজারকে এগিয়ে নিচ্ছে।
ভারত ভর্তুকির পাশাপাশি তেল শোধনাগার, সার কারখানা ও ইস্পাত শিল্পের সঙ্গে সরবরাহ চুক্তি যুক্ত করে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে, ফলে প্রকল্পগুলো শুরু থেকেই অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর হয়ে উঠছে।
ভারতের মূল উদ্দেশ্য হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। দেশটিতে অধিকাংশ হাইড্রোজেন আমদানিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপন্ন হয়, যার সরবরাহ মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন যুদ্ধ ও মহামারির কারণে বারবার বাধার মুখে পড়ছে।
অন্যদিকে, চীন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও বড় আকারের পরিকল্পিত শিল্প প্রকল্পের মাধ্যমে এই খাতে তার আধিপত্য বজায় রাখতে চায়, বিশেষ করে যখন শিল্পটি পরিষ্কার জ্বালানির দিকে যাচ্ছে।
মার্চ মাসে ঘোষিত তাদের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় বেইজিং গ্রিন হাইড্রোজেনকে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস ও এআই-নির্ভর রোবোটিক্সের মতো অগ্রবর্তী শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করেছে—যা ইঙ্গিত দেয় এই খাতে আরও বিনিয়োগ আসবে।
চীন: গতি ও ব্যাপ্তি
গত বছর চীন গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদনে ৩.৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বলে জানিয়েছেন রিস্টাড এনার্জির হাইড্রোজেন প্রধান মিন খোই লে।
রিস্টাডের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে চীনে বছরে প্রায় ২৬ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হবে, যার জন্য বিনিয়োগ হবে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার।
২০২৫ সালের অধিকাংশ বিনিয়োগ গেছে চিফেং প্রকল্পে, যা পরিচালনা করছে চীনা উইন্ড টারবাইন নির্মাতা 'এনভিশন এনার্জি'। তারা এশিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে গ্রিন হাইড্রোজেন ও অ্যামোনিয়া রপ্তানি করতে চায় এবং ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ কোরিয়ার লোটে ফাইন কেমিক্যাল-এ প্রথম চালান পাঠিয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হাইড্রোজেন বিশেষজ্ঞ হোসে বারমুডেজ বলেন, 'এক-দুই বছর আগে গ্রিন হাইড্রোজেনে চীন তেমন দৃশ্যমান ছিল না, কিন্তু এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর প্রায় সবই তাদের।'
গত বছর চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক হাইড্রোজেন উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ করে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টনে উন্নীত করেছে—যা বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি এবং ২০২৫ সালের লক্ষ্য আগেই ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন আগোরা এনার্জি চায়নার কেভিন তু।
ইনার মঙ্গোলিয়ার মতো উচ্চ বায়ু ও সূর্যালোকপূর্ণ অঞ্চলে গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদন খরচ প্রতি কেজিতে প্রায় ২ ডলারে নেমে এসেছে, যা কয়লাভিত্তিক হাইড্রোজেনের কাছাকাছি। গড়ে চীনে এই খরচ প্রায় ৪ ডলার।
ভারত: অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরি
ভারত ২০২৩ সালে ন্যাশনাল গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন চালুর পর উৎপাদন খরচ পাঁচ ডলার থেকে কমিয়ে প্রায় ২৭৯ রুপি (প্রায় ৩ ডলার) প্রতি কেজিতে নামিয়েছে।
মিশনের প্রধান অভয় বকরে রয়টার্সকে বলেন, প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়ার ফলে ২০৩২ সালের মধ্যে খরচ প্রায় ২ ডলারে নেমে আসবে।
তিনি জানান, আগামী বছর থেকেই বড় পরিমাণে উৎপাদন শুরু হবে এবং দ্রুত বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ লাখ টনের লক্ষ্যে পৌঁছানো হবে।
এই উদ্যোগের আওতায় লারসেন অ্যান্ড টুব্রো, ভারত পেট্রোলিয়াম, গেইল এবং জেএসডব্লিউ স্টিল-এর মতো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে প্রায় আট হাজার টন গ্রিন হাইড্রোজেন ও এর উপজাত উৎপাদন করছে।
ভারত সরকার রিভার্স অকশন পদ্ধতির মাধ্যমে চাহিদা তৈরি করছে, যেখানে সরবরাহকারীরা কম দামে চুক্তি জিততে প্রতিযোগিতা করে—ফলে বাজারে সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য মূল্য নির্ধারণ হয়।
গত মাসে সরকার জানায়, সরবরাহকারী ও সার কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৭ লাখ ২৪ হাজার টন গ্রিন অ্যামোনিয়ার চুক্তি হয়েছে, যা দেশের মোট হাইড্রোজেন চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে শক্তিশালী খাতভিত্তিক উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব প্রয়োজন, যাতে রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ানো যায়।
তারা আরও বলেন, বিশ্বের অন্যতম সস্তা নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুবিধা থাকায়, বৈশ্বিক বাজারে বড় অংশ দখলের ভালো সুযোগ রয়েছে ভারতের সামনে।
