সিআইএর গোপন প্রযুক্তি ‘গোস্ট মার্মার’ দিয়ে হৃৎস্পন্দন শনাক্ত করে ইরানে নিখোঁজ মার্কিন সেনাকে উদ্ধার করা হয়
সিআইএ-এর গোপন প্রযুক্তি 'গোস্ট মার্মার' ব্যবহার করে হৃৎস্পন্দন শনাক্ত করে ইরানে বিধ্বস্ত বিমানের দ্বিতীয় মার্কিন বিমানচালককে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিমানচালকের কলসাইন 'ডুড ৪৪ ব্রাভো' হিসেবে পরিচিত। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে 'উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কর্নেল' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি এফ–১৫ই স্ট্রাইক ঈগল জেটের ওয়েপনস সিস্টেম অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। শুক্রবার ইরানের ইসফাহানের দক্ষিণপশ্চিমে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর দুই বিমানসেনাকে উদ্ধারে অভিযান শুরু হয়।
পাইলট নিরাপদে ইজেক্ট করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং ওইদিনই দুটি সামরিক হেলিকপ্টারের সাহায্যে তাকে উদ্ধার হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় অফিসার আহত অবস্থায় শত্রুর সীমারেখার ২০০ মাইল ভিতরে পরে ছিলেন। হাতে শুধু একটি হ্যান্ডগান নিয়ে ৩৬ ঘণ্টা মরুভূমিতে আটকে ছিলেন তিনি।
সারভাইভাল, ইভেশন, রেজিস্ট্যান্স ও এস্কেপ (সিরে) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই বিমানচালক একটি বোয়িং-নির্মিত কমব্যাট সারভাইভার ইভেডার লোকেটর বীকন সক্রিয় করতে সক্ষম হন। তবে পর্বতের খাঁজে লুকিয়ে থাকার কারণে তার সঠিক অবস্থান অনিশ্চিত ছিল।
প্রসঙ্গত, সারভাইভাল, ইভেশন, রেজিস্ট্যান্স ও এস্কেপ (সিরে) হলো সামরিক বাহিনীর পাইলট ও বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের দেওয়া একটি নিবিড় প্রশিক্ষণ, যা প্রতিকূল বা বন্দী অবস্থায় বেঁচে থাকা এবং নিরাপদে ফিরে আসতে শেখায়। এর মাধ্যমে জঙ্গল, মরুভূমি বা বরফাচ্ছন্ন এলাকায় টিকে থাকা (Survival), শত্রুর চোখ ফাঁকি দেওয়া (Evasion), জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য না দেওয়া (Resistance) এবং পালিয়ে আসা (Escape) শেখানো হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা এটি শুরু করে। এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকা এবং শত্রু এলাকা থেকে নিরাপদে ফিরে আসা।
নিউইয়র্ক পোস্ট জানিয়েছে, সিআইএ-এর নতুন 'গোস্ট মার্মার' প্রযুক্তির মাধ্যমে পরদিন রোববার ভোরের আগে কমান্ডো দল তাকে শনাক্ত ও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
প্রযুক্তিটি দীর্ঘ-পরিসরের কোয়ান্টাম ম্যাগনেটোমেট্রি ব্যবহার করে মানুষের হৃদস্পন্দনের বৈদ্যুতচৌম্বক সংকেত শনাক্ত করে এবং এআই সফটওয়্যারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মূল সংকেত আলাদা করে।
সোমবার হোয়াইট হাউসে 'অপারেশন ডারিং'- বিষয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প সিআইএ পরিচালক জন রাটক্লিফকে 'অসাধারণ কাজ' করার জন্য প্রশংসা করেন এবং উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করার জন্য আমন্ত্রণ জানান।
তবে রাটক্লিফ এই অভিযানে ব্যবহৃত প্রযুক্তির নাম প্রকাশ না করে বলেন, 'আমাদের সংস্থা এমন চমৎকার প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, যা অন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থার নেই।'
তিনি এই উদ্ধার অভিযানকে 'মরুভূমির মাঝখানে একটি রুটির টুকরো খুঁজে বের করার সমতুল্য' হিসেবে বর্ণনা করেন।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, প্রযুক্তিটি স্কঙ্ক ওয়ার্কস দ্বারা তৈরি করা হয়েছে এবং ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারে পরীক্ষিত হয়েছে। ভবিষ্যতে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংবাদসূত্রের তথ্য অনুযায়ী, 'এটি এমন যেন স্টেডিয়ামে কণ্ঠ শোনা, তবে স্টেডিয়ামটি এক হাজার বর্গমাইল মরুভূমি। সঠিক অবস্থায়, যদি আপনার হৃদস্পন্দন চলে, আমরা আপনাকে খুঁজে বের করতে পারব।'
সূত্র জানিয়েছে, ইরানের শূন্য ও প্রত্যন্ত মরুভূমি ছিল এই প্রযুক্তির 'প্রথম ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য আদর্শ'। কারণ সেখানে বৈদ্যুতচৌম্বক বিঘ্ন কম থাকায় পরিবেশ ছিল প্রায় নিখুঁত। মানুষের সংকেত কম থাকায় প্রযুক্তি সহজে কাজ করেছে, আর রাতে জীবন্ত শরীর ও মরুভূমির তাপমাত্রার পার্থক্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
সূত্র আরও বলেন, সাধারণত এই ধরনের সংকেত এত দুর্বল যে হাসপাতালের পরিবেশে সেন্সর বুকের কাছে চেপে ধরলেই শুধুমাত্র হার্টবিট মাপা সম্ভব হয়।
তবে কোয়ান্টাম ম্যাগনেটোমেট্রি প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম হীরার ক্ষুদ্রতম ত্রুটি বা ডিফেক্টের চারপাশে তৈরি সেন্সরগুলোর সাহায্যে এখন অনেক দূর থেকে এই সংকেত শনাক্ত করা সম্ভব।
তারা প্রযুক্তিটির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি সর্বত্র কার্যকর নয়। এটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে প্রত্যন্ত, কম গোলমালের পরিবেশে এবং প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রচুর সময় লাগে।
