সিচুয়েশন রুম বৈঠক শেষেও দোদুল্যমান ট্রাম্প, ইরানের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে কোনো ঘোষণা দিতে পারেননি
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তি নিয়ে এগোবেন কি না, তা নিয়ে শুক্রবার হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি তিনি। অন্যদিকে ইরানও জানিয়েছে, চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত রূপ পায়নি।
বৈঠকের আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি 'চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে' পৌঁছাতে চান। তবে পরে প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টার বৈঠকটি কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এবং প্রকাশ্যে মন্তব্য করার অনুমতি না থাকা ওই কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প কেবল এমন একটি চুক্তিতেই সই করবেন যা তার বেঁধে দেওয়া 'রেডলাইন' বজায় রাখবে এবং ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় রাশ টানবে।
সংবাদমাধ্যমে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে একটি খসড়া চুক্তি নিয়ে ঐকমত্যের খবর প্রকাশের পরদিনই এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের কথা নিশ্চিত করেন ট্রাম্প। এ চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনার পাশাপাশি বর্তমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হতে পারে।
সমাজমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, 'ইরানকে অবশ্যই এই শর্তে রাজি হতে হবে যে তারা কখনও কোনো পারমাণবিক অস্ত্র বা বোমা তৈরি করবে না।' তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য হরমুজ ফের খুলে দিতে হবে এবং প্রণালিটিতে পাতা সমস্ত সামুদ্রিক মাইন ধ্বংস করতে হবে।
অন্যদিকে ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী শুক্রবার বলেছেন, কোনো 'আশ্বাস বা মুখের কথায়' আস্থা নেই তাদের, তেহরান কেবল 'পদক্ষেপে' বিশ্বাসী। গত এক বছরে আলোচনা চলাকালীনই আমেরিকা ও ইসরায়েল দুবার ইরানে হামলা চালানোর কারণেই ইরানের এই অবিশ্বাস।
সমাজমাধ্যম এক্স-এ মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ লিখেছেন, 'অপর পক্ষ পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে না। আমরা আলোচনার মাধ্যমে নয়, মিসাইলের মাধ্যমে ছাড় আদায় করি।'
পারমাণবিক জট কাটেনি
পরে, ট্রাম্পের বৈঠক শেষ হওয়ার আগেই, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগেই দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, চুক্তিটি 'এখনও চূড়ান্ত হয়নি।'
গত বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিছু সাধারণ শর্তাবলিতে পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন, যার খুঁটিনাটি পরবর্তী আলোচনাগুলোতে চূড়ান্ত করা হবে।
তবে শুক্রবার বাগেই বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা এখন 'যুদ্ধ অবসানের দিকেই মন দিচ্ছেন এবং এই মুহূর্তে পরমাণু পরিকল্পনার খুঁটিনাটি নিয়ে কোনো আলোচনা করছেন না।'
ইরান আরও চায়, লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতিও এ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হোক। একইসঙ্গে বিভিন্ন দেশে জব্দ থাকা নিজেদের কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড় করার দাবিও জানাচ্ছে তেহরান।
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ ও দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি শুক্রবার সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ইরান স্পষ্ট শর্ত দিচ্ছে—'নগদের বদলে নগদ, বাকির বদলে বাকি, বিনিময় ছাড়া কিছুই মিলবে না।'
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) দেওয়া তথ্য অনুসারে, ইরানের কাছে বর্তমানে ৪৪০.৯ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের স্তর থেকে এটি মাত্র এক প্রযুক্তিগত ধাপ দূরে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। তবে তারা তাদের মজুত ইউরেনিয়াম ত্যাগের বিষয়ে কখনও প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, গত বছর মার্কিন বিমান হামলায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি পরমাণু কেন্দ্রে এই বিপুল পরিমাণ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে।
চুক্তির শর্ত হিসেবে ইরানকে এই পরমাণু উপাদান পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে—শুক্রবার নিজের এই পুরনো দাবিতেই ফের অনড় অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্প। সমাজমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, আইএইএর সঙ্গে সমন্বয় করে আমেরিকা ওই উপাদান মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করবে এবং তা 'সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হবে'।
হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার প্রস্তাব
একজন মার্কিন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের টোল আদায় করতে পারবে না। একইসঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ থেকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সমস্ত সামুদ্রিক মাইন সরিয়ে ফেলতে হবে।
এর বিনিময়ে আমেরিকাও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে ধাপে ধাপে অবরোধ তুলে নেবে এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে রাজি হবে, যাতে ইরান তেল বিক্রি বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগেই বলেছেন, হরমুজের দুই প্রান্তে অবস্থিত ইরান ও ওমান যৌথভাবে এই নৌপথ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে। 'নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই' জলপথটিতে নৌযান চলাচলের রূপরেখা প্রস্তুত করা হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্স-এ লিখেছেন, শুক্রবার সকালেই ওমানের প্ররাস্ত্রমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে তার ফোনালাপ হয়েছে। যেকোনো ধরনের 'হুমকির মুখে' ওমানের পাশে থাকার বার্তাও দিয়েছেন তিনি।
অবশ্য গত বুধবারই মিত্র দেশ ওমানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ভাগাভাগি করার বিষয়ে ওমান যদি ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করে, তাহলে আমেরিকা দেশটিকে 'উড়িয়ে দেবে'।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে ইরান। এর আগে এই নৌপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত ছিল। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে গেছে, যার ধাক্কা মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে।
ইরানের বলেছে, তারা কিছু বাণিজ্যিক জাহাজকে এই রুট দিয়ে যাতায়াত করতে দিচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে দৈনিক ১০০টিরও বেশি জাহাজ হরমুজ দিয়ে চলাচল করত, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৪টির কাছাকাছি।
তবে এর পাশাপাশি বেশ কিছু জাহাজ থেকে ইরান শুল্ক আদায় করছে। এছাড়া চলতি মাসের শুরুতেই নৌপথটি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক সংস্থাও গঠন করেছে। এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় চলতি সপ্তাহেই ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আমেরিকা।
পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি নামক ওই ইরানি সংস্থা শুক্রবার আমেরিকার এই নতুন নিষেধাজ্ঞার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তবে একইসঙ্গে তারা দাবি করেছে, এই নিষেধাজ্ঞা আসলে তাদের 'সফল পারফরম্যান্সেরই' প্রমাণ।
