টাইটানিক থেকে বেঁচে ফেরা ‘মিস আনসিঙ্কেবল’ সমুদ্রে বেশ কয়েকবারই অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন
১৯১৬ সালের ২১ নভেম্বরের সকালে ব্রিটিশ সমুদ্রযাত্রী জাহাজ ব্রিটানিক তুরস্কের গ্যালিপলি যুদ্ধক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে এজিয়ান সাগর পাড়ি দিচ্ছিল। জাহাজটিকে তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে একটি হাসপাতাল জাহাজে রূপান্তর করা হয়েছিল। নার্স ভায়োলেট জেসপ তখন সকালের প্রার্থনা শেষে নাশতা করতে বসেছিলেন, ঠিক সেই সময় একটি চাপা বিস্ফোরণে জাহাজটি কেঁপে ওঠে। ব্রিটানিক একটি জার্মান মাইনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল এবং দ্রুত ডুবে যেতে শুরু করেছিল।
লাইফবোটে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে জেসপ দ্রুত নিজের কেবিনে ফিরে যান কিছু মূল্যবান জিনিসপত্র নিতে। এর মধ্যে ছিল তার প্রার্থনার বই এবং একটি বিশেষ ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী। নিজের স্মৃতিকথায় তিনি এক বন্ধুর কথা স্মরণ করেছিলেন: 'আরেকটি বিপর্যয়ে যাওয়ার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হবে যেন তোমার টুথব্রাশ সঙ্গে থাকে।'
টাইটানিক জাহাজডুবিসহ অতীতের সমুদ্র দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই জেসপ সেই উপদেশ হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছিলেন।
তিনি নিজের স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, 'টাইটানিক দুর্ঘটনার পর যখন আমি অভিযোগ করেছিলাম যে আমি একটি টুথব্রাশও জোগাড় করতে পারিনি, তখন সবাই আমাকে নিয়ে অনেক হাসাহাসি করেছিল।'
"ডুবন্ত জাহাজের রানি" এবং "মিস আনসিঙ্কেবল" বা "ডুবে না যাওয়া নারী" হিসেবে স্মরণীয় জেসপ সমুদ্রে এই সমস্ত বিপর্যয় সহ্য করার পাশাপাশি গুরুতর অসুস্থতা এবং ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি বা দুঃখজনক ঘটনাগুলো কাটিয়ে উঠতে তার গভীর বিশ্বাস এবং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করেছিলেন।
ব্রিটানিকে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও, অদম্য জেসপ ৩২ বছর পর তার অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত সমুদ্রগামী জাহাজগুলোতে সেবা দেওয়া বা কাজ করা অব্যাহত রেখেছিলেন।
লেখক ও ব্রিটানিক বিশেষজ্ঞ সাইমন মিলস বলেন, 'খুব সহজভাবে বলতে গেলে, তার কাজের প্রয়োজন ছিল, আর সমুদ্রের জীবনই ছিল তার একমাত্র পরিচিত জগৎ। পরে তিনি লিখেছিলেন, যত দ্রুত সম্ভব কাজে ফিরে যেতে হবে, না হলে তিনি হয়তো সাহস হারিয়ে ফেলবেন। তাই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আবার সমুদ্রে ফিরে যান।'
আরাম ও গতির জন্য নির্মিত আর. এম. এস. অলিম্পিক ছিল সে সময়ের সবচেয়ে বড় জাহাজ। ১৯১১ সালে প্রথম যাত্রার কয়েক মাস পর এটি আরেকটি জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইংল্যান্ডে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছিল।
'বেঁচে থাকার প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি'
১৮৮৭ সালে আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া ভায়োলেট কনস্ট্যান্স জেসপ ছিলেন আইরিশ ক্যাথলিক অভিবাসীদের কন্যা। তার পরিবার দক্ষিণ আমেরিকায় গিয়ে ভেড়ার খামার গড়ে তুলেছিল। ছোটবেলা থেকেই নানা অসুস্থতা তাকে ঘিরে ছিল, যার মধ্যে টাইফয়েড ও যক্ষ্মাও ছিল। যক্ষ্মা প্রায় তার জীবন কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু তিনি অলৌকিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
তার স্মৃতিকথার সম্পাদক প্রয়াত জন ম্যাকস্টোন-গ্রাহাম লিখেছিলেন, 'ভায়োলেটের একগুঁয়ে, প্রায় ভয়ংকর রকমের বেঁচে থাকার ইচ্ছাশক্তিই তাকে সুস্থ করে তুলেছিল।'
১৯০৩ সালে তার বাবা মারা যাওয়ার পর, ১৬ বছর বয়সী জেসপ এবং তার পরিবার ইংল্যান্ডে চলে আসেন।
তার সন্তানদের অন্নসংস্থান করতে, মা ক্যাথরিন একজন স্টুয়ার্ডেস বা পরিচারিকা—মূলত আটলান্টিক মহাসাগর পার হওয়া রয়্যাল মেইল লাইনের বাষ্পীয় জাহাজগুলোতে ধনী যাত্রীদের সেবিকা—হিসেবে কাজ শুরু করেন।
সমুদ্রে পাঁচ বছর কাটানোর পর ক্যাথরিন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২১ বছর বয়সী ভায়োলেট তখন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।
তিনি তার মায়ের পথ অনুসরণ করেন এবং একজন পরিচারিকা বা স্টুয়ার্ডেস হন।
যদিও এই পদের জন্য তাকে খুব কম বয়সী মনে করা হতো, তবুও ভায়োলেটের মনোরম ব্যক্তিত্ব এবং ভাষার দক্ষতা—তিনি ইংরেজি, স্প্যানিশ এবং ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলতে পারতেন—তাকে চাকরিটি পেতে সাহায্য করেছিল।
একটি ফরাসি সাময়িকীর চিত্রে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ ও মৃতদেহ উদ্ধারে যাওয়া একটি জাহাজে প্রার্থনার দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছিল।
জেসপ—একজন ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক যিনি ঘনঘন প্রার্থনা করতেন। তিনি সুরক্ষার জন্য একটি হিব্রু প্রার্থনা স্মরণ করেছিলেন এবং টাইটানিক একটি হিমশৈলে আঘাত করার ও ডুবে যাওয়ার কয়েক মুহূর্ত আগে তা বলা বা পাঠ করা শুরু করেছিলেন।
১৯১১ সালে এই তরুণী পরিচারিকা বা স্টুয়ার্ডেস অত্যন্ত জমকালোভাবে সজ্জিত রাজকীয় ডাকবাহী জাহাজ অলিম্পিকে যোগ দেন—যা ছিল তার সময়ের সবচেয়ে বড় জাহাজ এবং হোয়াইট স্টার লাইনের দ্বারা পরিচালিত বিলাসবহুল জাহাজের ত্রয়ীর প্রথমটি।
সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু ১৯১১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর যাত্রীবাহী জাহাজটি ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচ.এম.এস. হকের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। অলিম্পিকের পানির নিচের অংশে বিশাল ফাটল সৃষ্টি হয়েছিল, তবে সেটি কোনোভাবে ইংল্যান্ডে ফিরে আসতে সক্ষম হয়।
অলিম্পিক মেরামতের জন্য বন্দরে থাকায় জেসপ তার সহোদর জাহাজ আর.এম.এস. টাইটানিকে বদলি হন। সাত মাসেরও কম সময় পরে, ১৯১২ সালের ১৪ এপ্রিল, জাঁকজমকপূর্ণ জাহাজটি প্রথম যাত্রার চতুর্থ দিনে একটি হিমশৈলে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায়। এতে ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি যাত্রী ও নাবিক প্রাণ হারান।
সেই ভয়াবহ রাতে রাত ১১টা ৪০ মিনিটে জেসপ তার প্রার্থনা শেষ করে নিজের শয্যায় ছিলেন, তখন তিনি একটি 'মৃদু, ছিঁড়ে যাওয়া, চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার মতো শব্দ' শুনতে পান। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন এটি হয়তো মহড়া। কারণ তথাকথিত 'অডুবনীয়' টাইটানিক তো কখনোই ডুবে যেতে পারে না। কিন্তু তিন ঘণ্টারও কম সময় পরে জেসপ একটি লাইফবোটে ভেসে ছিলেন এবং আতঙ্ক নিয়ে দেখছিলেন কীভাবে বিশাল জাহাজটি অন্ধকার, বরফশীতল উত্তর আটলান্টিকের পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। তিনি মনে করেছিলেন, 'নিশ্চয়ই সবকিছু একটা দুঃস্বপ্ন।'
'ধর্মবিশ্বাস'
১৯১৪ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন জেসপ একজন সেবিকা বা নার্স হিসেবে কাজ করার জন্য স্বেচ্ছাসেবী হয়েছিলেন।
তিনি কিছু সময়ের জন্য স্থলভাগের হাসপাতালগুলোতে কাজ করেছিলেন, তারপর ব্রিটানিকে চড়ে সমুদ্রে সেবা করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
১৯১৬ সালে গ্রীক দ্বীপ কেয়ার কাছে জাহাজটি যখন একটি মাইনে আঘাত করে, তখন জেসপ একটি লাইফবোটে বা উদ্ধারকারী নৌকায় ছিলেন। কিন্তু লাইফবোটটি ব্রিটানিকের তখনও ঘূর্ণায়মান পাখা বা প্রপেলারের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে এবং এক পর্যায়ে প্রপেলারের আঘাতে মানুষ এবং নৌকাগুলো টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ায় জল রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল।
জেসপ সমুদ্রে ঝাঁপ দেন এবং মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান তবে মাথার খুলিতে গুরুতর ফাটল বা আঘাত এবং পায়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল।
জেসপ সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান, কিন্তু তার মাথার খুলিতে মারাত্মক ফাটল এবং পায়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল। পরে একটি ব্রিটিশ ডেস্ট্রয়ার জাহাজে উঠে তিনি পরিচিত দুটি মুখ দেখতে পান—সেই দুই চিকিৎসক, যাদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি সেদিন সকালে প্রার্থনা করেছিলেন। তাদের একজন বলেছিলেন, 'আজ তোমাকে কী বাঁচিয়েছে, তরুণী, আমি তা জানি।'
জেসপের সেই আঘাত থেকে সেরে উঠতে তিন বছর সময় লেগেছিল।
এর মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হয় এবং আবার আটলান্টিক পাড়ি দিতে শুরু করে সমুদ্রযাত্রী জাহাজগুলো। সমুদ্রে তিনটি বড় বিপর্যয় থেকে বেঁচে ফেরার পর অন্য কেউ হয়তো মনে করতেন তার ভাগ্য ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু জেসপ ছিলেন আলাদা। ১৯২০ সালে তিনি আবারও পুনর্নির্মিত অলিম্পিক জাহাজে যোগ দেন এবং ১৯৫০ সালে ৬৩ বছর বয়সে অবসর নেওয়া পর্যন্ত স্টুয়ার্ডেস হিসেবে কাজ চালিয়ে যান। ১৯৭১ সালে ইংল্যান্ডে ৮৩ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।
জীবনের এত প্রতিকূলতা মোকাবিলা করার শক্তি তিনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন? এক বন্ধুকে তিনি একবার বলেছিলেন, 'শুধু বেঁচে থাকার ইচ্ছাশক্তি। আর ঈশ্বরের অলৌকিক সহায়তায় গভীর বিশ্বাস।'
