যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ কি দীর্ঘস্থায়ী ‘স্থবির’ সংঘাতে রূপ নিচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান অভিযানের দুই মাস অতিবাহিত হলেও আলোচনার পথ এখনো রুদ্ধ। হরমোজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি অবরোধে বিশ্বজ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এখনো অমীমাংসিত। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, এ সংঘাত কি দীর্ঘস্থায়ী কোনো 'স্থবির' দ্বন্দ্বে রূপ নিতে যাচ্ছে?
এই অচলাবস্থার ইঙ্গিত দিয়ে মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার বিষয়ে ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার শীর্ষ নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মধ্যে ইরানের নতুন একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার একদিন পর কেলি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র "তাড়াহুড়ো করে কোনো খারাপ চুক্তিতে যাবে না।"
গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সব ধরনের সামরিক বিকল্প এখনো বহাল রয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার এক 'স্থবির সংঘাতের' আশঙ্কা নিয়ে সতর্ক করেছে, যেখানে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের সহিংসতার সূত্রপাত ঘটতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান স্থগিত রাখার সম্ভাবনা দেখছেন, তবে প্রয়োজনে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলার বিকল্প পথটি খোলা রাখতে চান।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থায়ী কোনো চুক্তির অনুপস্থিতিতে নিয়মিত বিরতিতে হামলার পাশাপাশি একটি নিম্ন-তীব্রতার সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
কাতারস্থ জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান বিশেষজ্ঞ মেহরান কামরাভা আল-জাজিরাকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধকে এরই মধ্যে 'স্থবির' বলা যেতে পারে, কিন্তু এই 'যুদ্ধও নেই-চুক্তিও নেই' পরিস্থিতির খরচ উভয় পক্ষের জন্যই অনেক বেশি। কামরাভা বলেন, "ইরান তার বন্দরগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরুদ্ধ রাখতে পারবে না, আবার যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ বজায় রাখতে পারবে না। সাময়িকভাবে আমরা একটি স্বল্পমেয়াদি স্থবির সংঘাত দেখতে পারি, কিন্তু এটি কয়েক মাস বা বছর ধরে চলতে পারে না।"
আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'কুইন্সি ইনস্টিটিউট'-এর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম মাসে ওয়াশিংটনের খরচ হয়েছে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার। ২০০৩ সালের ইরাক অভিযানের মতো বড় আকারের স্থল অভিযানে প্রতি মাসে অন্তত ৫৫ বিলিয়ন ডলার এবং বছরে ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হতে পারে। থিঙ্ক ট্যাঙ্কটি সতর্ক করেছে যে, এটিও একটি বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক সুবিধা দিলেও পরিষ্কার কোনো উপসংহার ছাড়া এই ধিকিধিকি সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে।
গত ১৩ এপ্রিল থেকে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি বন্দর ও জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। গত সপ্তাহে তৃতীয় একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করা হয়েছে, যা ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর এ অঞ্চলে বৃহত্তম সামরিক জমায়েত। প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা বর্তমানে এ অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, হরমোজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রেও অনুভূত হচ্ছে। সেখানে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ৪.১৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নামিয়েছে; বর্তমানে তার জনপ্রিয়তা মাত্র ৩৪ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার সময় ছিল ৪৭ শতাংশ। কামরাভা বলেন, মার্কিন অর্থনীতি এই ধাক্কা সইতে পারলেও মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থা তা সইতে পারবে কি না সেটিই বড় প্রশ্ন।
ট্রাম্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ চলার কথা ছিল। ওসলো শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট (প্রিও)-এর গবেষক চ্যান্ডলার উইলিয়ামস বলেন, এই সংঘাত প্রত্যাশার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। তিনি বলেন, "যখন কোনো দেশ বা সরকার ব্যাপকভাবে নিখুঁত বিমান হামলার ওপর নির্ভর করে, তখন তা সমাধানের চেয়ে উত্তেজনা বেশি সৃষ্টি করে। প্রশ্ন হলো, এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কি এখন একটি সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে পরিণত হচ্ছে কি না?"
উইলিয়ামসের মতে, ওয়াশিংটন এখন ট্রাম্পের নিয়মিত হামলার হুমকির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের ওপর বাজি ধরছে। অন্যদিকে ইরান হরমোজ প্রণালিকে ব্যবহারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করতে চাইছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর এক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সামরিক উত্তেজনা ইরানে কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে শস্য আমদানিতে বাধা আসায় ৯ কোটি মানুষের এই দেশে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৭ অর্থবছরের জন্য স্বায়ত্তশাসিত ড্রোনের জন্য ৫৩.৬ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ চেয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৪,০০০ শতাংশ বেশি। কিংস কলেজ লন্ডনের ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইকেল কের আল-জাজিরাকে বলেন, "যদি সংঘাতের কৌশল ড্রোন যুদ্ধ ও নিম্ন-তীব্রতার সংঘাতের দিকে মোড় নেয়, তবে আক্রমণকারীর খরচ কমবে কিন্তু আক্রান্তের ওপর প্রভাব হবে অনেক বেশি।"
ইসরায়েল প্রায়ই গাজা ও লেবাননে তাদের 'ঘাস কাটা' কৌশলের কথা উল্লেখ করে, যার অর্থ হলো শান্ত সময়ের সাথে মাঝে মাঝে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি বেছে নিতে পারে। তবে কের সতর্ক করে বলেন, ইরানের ড্রোন ও মিসাইল সক্ষমতা বিবেচনায় এই কৌশলের ঝুঁকি অনেক বেশি। তিনি বলেন, "যদি আপনি ইরানের বিরুদ্ধে ঘাস কাটার কৌশল নেন, তবে ইরানকে কাতার, ইউএই, কুয়েত বা মার্কিন জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো থেকে কে ঠেকাবে?"
কের আরও বলেন, পশ্চিমাদের এই প্রত্যাশা যে বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ইরানের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাক্সে বন্দি করা যাবে, তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। তিনি বলেন, "মার্কিন বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ইরানকে ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য করার ধারণা কখনোই কাজ করবে বলে আমি মনে করি না।"
