চার অধ্যাদেশ বাতিল: সংসদ কি পথ হারাইয়াছে?
নতুন গঠিত জাতীয় সংসদ সম্প্রতি চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। তবে যে পদ্ধতিতে এগুলো বাতিল করা হয়েছে, তা নিয়ে একটি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্নটি হলো—সংসদ কি অধ্যাদেশ বাতিলের সঠিক আইনি প্রক্রিয়াটি এড়িয়ে গেছে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ কোনো অধ্যাদেশ কেবল তখনই বাতিল করতে পারে, যখন সেই অধ্যাদেশের বিপক্ষে একটি রেজুলেশন পাস করা হয়। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে এ ধরনের বিধিবদ্ধ প্রস্তাব পাসের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া রয়েছে।
কিন্তু বর্তমান সংসদ এই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ঠিক বিপরীত পথ বেছে নিয়েছে। তারা প্রস্তাব পাসের পরিবর্তে চারটি আলাদা 'বিল' পাসের মাধ্যমে অধ্যাদেশগুলো বাতিল করেছে। অধ্যাদেশ বাতিলের এই প্রক্রিয়াটি সংবিধান কিংবা জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।
জাতীয় সংসদ গত ৬ এপ্রিল একটি বিল পাসের মাধ্যমে 'জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ' বাতিল করে। এরপর ৯ এপ্রিল পৃথক তিনটি বিল পাসের মাধ্যমে 'সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ', 'সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ' এবং 'জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ' বাতিল করা হয়।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান পৃথক দুই দিনে এই চারটি বিল সংসদে উত্থাপন করেন। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য গঠিত একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই অধ্যাদেশগুলো বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সংসদ কোনো কমিটির প্রতিটি সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে আইনত বাধ্য নয়। একইভাবে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশের মাধ্যমে করা প্রতিটি আইনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার ক্ষেত্রেও নতুন সংসদের ওপর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
সংসদ যদি কোনো অধ্যাদেশের মাধ্যমে করা আইনের কার্যকারিতা বজায় রাখতে চায়, তবে অধ্যাদেশটি সংসদে পেশ করার ৯০ দিনের মধ্যে সেটিকে প্রতিস্থাপন করে বিল পাস করতে পারে। সংসদ কোনো অধ্যাদেশকে সরাসরি অনুমোদন বা অনুসমর্থন করতে পারে না। এমনকি নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পর কোনো অধ্যাদেশ অকার্যকর হয়ে গেলেও সংসদ চাইলে একই বিষয়বস্তু নিয়ে নতুন করে বিল পাস করে আইন প্রণয়ন করতে পারে।
সংসদ যদি কোনো অধ্যাদেশ পেশ করার পরপরই সেটি বাতিল করতে চায়, কিংবা নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই তা অকার্যকর করতে চায়, তবে সংবিধানের ৯৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সেই অধ্যাদেশের বিপক্ষে একটি 'অননুমোদন প্রস্তাব' পাস করার সুযোগ রয়েছে। এটি একটি বিধিবদ্ধ প্রস্তাব, যা সংবিধানের সুনির্দিষ্ট বিধানের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়।
সংসদে এ ধরনের কোনো বিধিবদ্ধ প্রস্তাব পাস হলে তা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক এবং এটি আইনের মতোই শক্তিশালী।
অন্য একটি বিধিবদ্ধ প্রস্তাবের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যদি সংসদ মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে কোনো অনাস্থা প্রস্তাব পাস করে, তবে সরকারের টিকে থাকার আর কোনো পথ থাকে না এবং সরকারের পতন ঘটে।
একইভাবে, সংসদ যদি স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারকে অভিশংসন বা অপসারণ করতে চায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব পাস করতে হয়। একবার সেই প্রস্তাব পাস হয়ে গেলে তারা আর পদে বহাল থাকতে পারেন না।
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে এ ধরনের বিধিবদ্ধ প্রস্তাব পাসের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে বিভিন্ন ধরণের সাধারণ প্রস্তাবের উল্লেখ আছে। তবে এ ধরণের সাধারণ প্রস্তাব সংসদে পাস হলেও এর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই এবং তা সরকারের ওপর বাধ্যতামূলক নয়।
সংসদ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ খন্দকার আব্দুল হকের 'পার্লামেন্টারি প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রসিডিউর' বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে পঞ্চম এবং সপ্তম জাতীয় সংসদে প্রায় এক ডজন অধ্যাদেশ বাতিলের জন্য বিধিবদ্ধ প্রস্তাব উত্থাপন ও আলোচনা করা হয়েছিল। সেই সব ক্ষেত্রে সংবিধানের ৯৩ (২) অনুচ্ছেদ এবং কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৪ বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়।
তবে ওই প্রস্তাবগুলোর একটিও পাস হয়নি। কারণ প্রস্তাবগুলো ছিল বিরোধী দলের পক্ষ থেকে। অন্যদিকে তৎকালীন সরকারগুলো ওই অধ্যাদেশগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগ্রহী ছিল এবং সেগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য আলাদা বিল উত্থাপন করেছিল। সংসদ সচিবালয় থেকে প্রায় দুই দশক আগে খন্দকার আব্দুল হকের এই বইটি প্রকাশিত হয়। ভারতের পার্লামেন্টেও বিধিবদ্ধ প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে অধ্যাদেশ বাতিলের নজির রয়েছে। সংসদ বিষয়ক দুই খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ এম এন কৌল এবং এস এল শাকধের-এর লেখা 'প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রসিডিউর অব পার্লামেন্ট' বইয়ে এ ধরণের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধ্যাদেশ বাতিলের জন্য বিল পাসের বদলে প্রস্তাব পাসের যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, বর্তমান সংসদ তা এড়িয়ে যাওয়ায় এক ধরণের আইনি অসংগতি তৈরি হয়েছে।
সাংবিধানিক বিধানটি কী?
সংবিধানের ৯৩ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, '(১) দফার অধীনে প্রণীত কোনো অধ্যাদেশ জারির পর সংসদের প্রথম বৈঠকে তা উপস্থাপিত হবে এবং সংসদ কর্তৃক আগে বাতিল না হয়ে থাকলে, অধ্যাদেশটি উপস্থাপনের ৩০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তা অকার্যকর হয়ে যাবে। তবে উক্ত সময়সীমা পার হওয়ার আগে যদি সংসদ অধ্যাদেশটির ওপর কোনো অননুমোদন প্রস্তাব পাস করে, তবে প্রস্তাবটি পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা শেষ হবে।'
কার্যবিধির নিয়মাবলীতে কী বলা আছে?
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৪ বিধিতে 'অধ্যাদেশ অননুমোদনের প্রস্তাব' শিরোনামের অধীনে বলা হয়েছে:
(১) সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদের অধীনে প্রণীত কোনো অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপিত হওয়ার পর, কোনো সদস্য অধ্যাদেশটি অননুমোদনের জন্য ৯৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারেন। এর জন্য তাকে প্রস্তাব উত্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করে অন্তত তিন দিন আগে সচিবকে লিখিত নোটিশ দিতে হবে।
(২) যদি একই অধ্যাদেশের ওপর একের বেশি অননুমোদন প্রস্তাবের নোটিশ পাওয়া যায়, তবে লটারি বা ব্যালট ছাড়াই নোটিশ পাওয়ার ক্রম অনুযায়ী সেগুলো গ্রহণ করা হবে। অধ্যাদেশটি উপস্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ নেতার সঙ্গে পরামর্শ করে স্পিকার আলোচনার দিন নির্ধারণ করবেন। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাবের বিষয়ে 'বেসরকারি সদস্যদের নোটিশ' সংক্রান্ত নিয়মগুলো কার্যকর হবে না। তবে শর্ত থাকে, অধ্যাদেশ উপস্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে যদি এমন কোনো একটি প্রস্তাব সংসদে পাস হয়ে যায়, তবে বাকি সব প্রস্তাব বাতিল বলে গণ্য হবে।
(৩) এ ধরনের কোনো প্রস্তাবে কোনো সংশোধনী আনা যাবে না।
(৪) অধ্যাদেশ অননুমোদনের প্রস্তাবটি অবশ্যই পুরো অধ্যাদেশটির বিরুদ্ধে হতে হবে; অধ্যাদেশের কোনো সুনির্দিষ্ট ধারা বা তফশিলের বিরুদ্ধে আংশিক প্রস্তাব আনা যাবে না।
অতি দ্রুত গতিতে আইন প্রণয়ন!
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে এটি বলা যেতে পারে যে, সংসদ যখন অতি দ্রুত গতিতে আইন তৈরি করছে, তখন চারটি অধ্যাদেশ বাতিলে তারা সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটি ২ এপ্রিল সংসদে তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। কমিটি ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত রেখে সেগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য আলাদা বিল আনার সুপারিশ করে। ২০টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ৩০ দিনের নির্ধারিত সময়সীমা শেষে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হতে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া, বাকি চারটি অধ্যাদেশ সরাসরি বাতিলের সুপারিশ করে কমিটি।
এখন সংসদ মূলত সময়ের সাথে পাল্লা দিচ্ছে। গত ১২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ৩০ দিনের সাংবিধানিক সময়সীমা ১০ এপ্রিল শেষ হচ্ছে। বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে সংসদকে ১০২টির মতো বিল পাস করতে হচ্ছে।
ফলে সংসদ অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে কাজ করছে। গত ৬ এপ্রিল থেকে পরবর্তী তিন দিনে ৩৫টি বিল পাস করা হয়েছে— যার মধ্যে ৬ এপ্রিল ৭টি, ৮ এপ্রিল ১৪টি এবং ৯ এপ্রিল ১৪টি বিল পাস হয়।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং নিম্ন আদালতের ওপর সর্বোচ্চ আদালতের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আলাদা সচিবালয় গঠন সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ বাতিলে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এর ফলে নিম্ন আদালতের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে, যা সংবিধানে উল্লেখিত 'ক্ষমতার পৃথকীকরণ' নীতির পরিপন্থী।
আইনমন্ত্রী অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন, বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলো বিস্তারিত পর্যালোচনার পর আবারও বিল আকারে সংসদে পেশ করা হবে। তবে বিগত সরকারগুলোর আমলে বিচার বিভাগের ব্যাপক রাজনৈতিকীকরণের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে মন্ত্রীর এই আশ্বাসে জনমনে স্বস্তি ফেরেনি।
বিশেষ সংসদীয় কমিটি যখনই বিচার বিভাগ সংক্রান্ত দুটিসহ চারটি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে, তখন থেকেই সরকার কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী গত ৪ এপ্রিল বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকেও দলটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলে সরকারের গৃহীত পদ্ধতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
