'ক্ষমতার জন্য বিএনপি গড়িনি': জিয়াউর রহমানের শেষ ও ট্র্যাজিক চট্টগ্রাম সফর নিয়ে রাজনৈতিক সতীর্থের স্মৃতিচারণা
'সময়টা ১৯৮১ সালের ২৯ মে। রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১টা। প্রেসিডেন্ট শুধু আমাকেই কেন তার কক্ষে ডাকলেন, ভেবে কিছুটা অবাক হয়েছিলাম। আমি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তার কক্ষে ঢুকলাম (পরবর্তীতে এই সার্কিট হাউসটিকে জিয়াউর রহমানের নামে জাদুঘর করা হয়)।'
'প্রেসিডেন্ট পূর্বমুখী হয়ে বসেছিলেন, আর আমি ঠিক তার মুখোমুখি, পশ্চিম দিকে মুখ করে বসলাম। তার পরনে ছিল সাদা পায়জামা আর টি-শার্ট। পাশে একটি ছোট টেবিলে পানির জগ আর গ্লাস রাখা। তিনি আমার ও আমার পরিবারের খোঁজখবর নিলেন।'
'এরপর প্রেসিডেন্ট জিয়া হঠাৎ আমাকে প্রশ্ন করলেন, "শোনো জাহাঙ্গীর, তুমি কি জানো আমি কেন বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছি?" আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে তিনি নিজেই এর জবাব দিলেন।'
'তিনি বললেন, "আমি ক্ষমতার জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করিনি। আমার মূল লক্ষ্য হলো—এই দলের নেতা-কর্মীরা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষক হিসেবে কাজ করবে।"'
'সেদিন রাতের খাবার শেষে প্রেসিডেন্ট জিয়া কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে সার্কিট হাউসের লাউঞ্জে বসে সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর তিনি তার কক্ষে ফিরে যান। পাঁচ মিনিট পর তিনি আবার বেরিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসেন, কিন্তু শুধু আমাকে সঙ্গে নিয়েই নিজের কক্ষে যান।'
'এটি ছিল ১৯৮১ সালের ২৯ মে-র সেই ভয়াবহ ও ট্র্যাজিক রাতের টুকরো টুকরো কিছু ঘটনার বিবরণ। এর কয়েক ঘণ্টা পরই একদল বিপথগামী সেনাসদস্য সার্কিট হাউসে হামলা চালায়। তাদের হাতে নিহত হন জিয়াউর রহমানের মতো একজন বিরল ব্যক্তিত্ব, যার ছিল দূরদর্শিতা, অবিসংবাদিত রাষ্ট্রনায়কসুলভ গুণ, খাঁটি দেশপ্রেম এবং দুর্দান্ত সামরিক নেতৃত্ব।'
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কাটানো শেষ স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বাসসকে এ কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম।
১৯৮১ সালের ২৯ মে সকালে মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সদস্য এবং তৎকালীন মহাসচিব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ (বি চৌধুরী) দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এক দিনের সফরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে আসেন প্রেসিডেন্ট জিয়া।
জাহাঙ্গীর বলেন, '২৬ মে প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব কর্নেল মাহফুজ আমাকে ফোন করেন। তিনি আমাকে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি এম সলিমুল্লাহকে নিয়ে ঢাকায় প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে আসতে বলেন। পরদিন রাতে বঙ্গভবনে আমরা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করি। তখনই জানতে পারি, তিনি ২৯ মে চট্টগ্রাম সফরের সূচি ঠিক করেছেন।'
'১০ মে চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড পরিদর্শনের এত অল্প সময়ের মধ্যে তার আবার চট্টগ্রাম সফরের কথা শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম,' যোগ করেন জাহাঙ্গীর।
বঙ্গভবনে নৈশভোজের পর প্রেসিডেন্ট জিয়া তাদের নির্দেশ দেন, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে যেন কোনো লোকসমাগম না হয়। এমনকি তাদেরও বিমানবন্দরে আসতে নিষেধ করেন তিনি। তিনি জানান, সার্কিট হাউসে তাকে স্বাগত জানানোর জন্য তিনি ইতিমধ্যে ১০ জনকে নির্বাচন করেছেন।
চট্টগ্রামে ফিরে তারা দেখেন, নির্বাচিত সেই ১০ জনের মধ্যে তাদের দুজনের নামও রয়েছে। সকালে প্রেসিডেন্ট জিয়া তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে সার্কিট হাউসে পৌঁছালে তারা তাকে সেখানে স্বাগত জানান।
প্রেসিডেন্ট জিয়া বি চৌধুরী, ডা. আমেনা রহমান, সৈয়দ মহিবুল হাসান, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এবং ডা. এ এফ এম ইউসুফসহ অন্যদের নিয়ে সার্কিট হাউসে ওপরতলায় যান। তিনি লাউঞ্জে কিছুটা সময় কাটান এবং সবার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ও গল্পগুজব করেন।
স্মৃতি হাতড়ে জাহাঙ্গীর বলেন, 'একপর্যায়ে তিনি বারান্দার কাছে গিয়ে চট্টগ্রামে বসবাসের তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি বলেছিলেন, "আনিস (ব্যারিস্টার আনিস), এখানে একটা জমি খোঁজো। আমি এই শহরেই থাকব। জায়গাটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।"'
প্রেসিডেন্ট জুমার নামাজ আদায় করেন চন্দনপুরা মসজিদে, যা চারটি মিনারবিশিষ্ট একটি ঐতিহ্যবাহী ও স্থাপত্যশৈলীতে অনন্য স্থাপনা। বিকেলে সার্কিট হাউসের সম্মেলনকক্ষে তিনি আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ব্যবসায়ীদের মতো বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি তাদের কথা শোনেন এবং স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়া, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ ও দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
জাহাঙ্গীর জানান, রাতে খাবার শেষে প্রেসিডেন্ট স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেন। এরপর রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাকে ডাকা হয়।
প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নিজের শেষ কথোপকথনের কথা স্মরণ করে জাহাঙ্গীর বলেন, 'তিনি আমাকে বলেছিলেন, "দেখো জাহাঙ্গীর, আমি ক্ষমতার জন্য বিএনপি গঠন করিনি। আমার মূল লক্ষ্য হলো—এই দলের নেতা-কর্মীরা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষক হিসেবে কাজ করবে। এ জন্য একটি সুসংগঠিত, দক্ষ ও আদর্শিক কর্মী বাহিনী গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। আমি সলিমুল্লাহকে চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে যুব সমাবেশ আয়োজন করতে বলেছি এবং তোমাকে অবশ্যই তাকে সাহায্য করতে হবে।"'
তিনি আরও বলেছিলেন, 'খাঁটি কর্মী বাহিনী গড়তে আমাদের একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা দরকার। তুমি এখানে একটা উপযুক্ত জায়গা দেখো। আমি ফিরোজ নুনকে (প্রয়াত অধ্যক্ষ ফিরোজ নুন) বলব।'
আলোচনার মাঝখানে অনুমতি নিয়ে জাহাঙ্গীর প্রেসিডেন্ট জিয়াকে প্রশ্ন করেন, 'স্যার, আপনি কেন বারবার দলের কর্মীদের দেশের রক্ষক হওয়ার কথা বলছেন?'
ভৌগোলিক ও কৌশলগত কিছু দিকের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, 'কারণ, আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর সম্ভাব্য যেকোনো হুমকি মোকাবিলা করার জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখতে হবে।'
'৩০ মে রাত তখন ১টা ৩০ মিনিট। প্রেসিডেন্ট জিয়া নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে চট্টগ্রামের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার জিয়াউদ্দিন আহমদকে আমাদের দুজনের (আমি ও সভাপতি সলিমুল্লাহ) জন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা করতে বলেন। রাঙ্গামাটি-১০০০ নম্বরের একটি গাড়িতে করে আমরা সার্কিট হাউস ত্যাগ করি। যাওয়ার আগে আমরা প্রিয় প্রেসিডেন্টকে সালাম ও বিদায় জানাই। কে জানত এটাই হবে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে আমাদের শেষ বিদায়!' স্মৃতিকাতর হয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন জাহাঙ্গীর।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার এই শেষ চট্টগ্রাম সফর দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটানোর উদ্দেশ্যে ছিল বলে যে অপপ্রচার রয়েছে, তা উড়িয়ে দেন এই প্রবীণ রাজনীতিক।
তিনি বলেন, 'যদি তা-ই হতো, তবে তিনি বিবদমান দুই পক্ষকে একসঙ্গে ডাকতেন। মূলত তার সফরের উদ্দেশ্য ছিল দলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করা।'
তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান প্রয়াত মেজর জেনারেল মহব্বত জান চৌধুরী প্রেসিডেন্ট জিয়াকে চট্টগ্রাম সফর থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তিনি সেই পরামর্শ শোনেননি।
'প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যা করা দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের একটি অংশ ছিল,' দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, 'এ জন্যই আমরা দক্ষ ব্যক্তিদের যুক্ত করে জিয়া হত্যার বেসামরিক তদন্ত দাবি করেছিলাম। তাহলেই এই ষড়যন্ত্রের আসল উদ্দেশ্য ও ছক উন্মোচিত হতো।'
এ প্রসঙ্গে তিনি সে রাতের একটি ঘটনার কথা তুলে ধরেন।
জাহাঙ্গীর বলেন, 'রাত ১০টার দিকে তৎকালীন এডিসি (উন্নয়ন) মিস্টার রউফের সঙ্গে আমরা সার্কিট হাউসের নিচতলায় ছিলাম। সরকারি ল্যান্ডফোনে একের পর এক কল আসছিল। বেশির ভাগ কলারই প্রেসিডেন্ট জিয়ার সামরিক সচিব কর্নেল মাহফুজের সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন।'
জাহাঙ্গীর বলেন, 'বারবার ফোন আসায় বিরক্ত হয়ে একপর্যায়ে আমি কর্নেল মাহফুজকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনার কাছে এত ফোন আসছে কেন? কিন্তু কর্নেল মাহফুজ কোনো উত্তর দেননি। তিনি শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে কলগুলো দোতলায় ট্রান্সফার করতে বলেন।'
জাহাঙ্গীর জানান, একবার তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কেন তিনি বিএনপিতে যোগ দেবেন।
উত্তরে শাহ আজিজ বলেছিলেন, 'জিয়াউর রহমান একজন অসাধারণ মেধাবী মানুষ এবং একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি কখনোই আপস করেন না।'
৭৭ বছর বয়সী রাজনীতিক এবং প্রেসিডেন্ট জিয়ার দর্শনের একনিষ্ঠ অনুসারী জাহাঙ্গীর আলম তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বাসসকে বলেন, 'গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি জিয়াউর রহমানের প্রকৃত বিশ্বাস ছিল।'
