কোরবানির ঈদ ঘিরে মশলা আমদানিতে সংকট নেই, তবুও পাইকারি ও খুচরা দরে বড় ফারাক
ঈদুল আজহা সামনে রেখে দেশে মসলার কোনো সংকট নেই। নিয়মিত আমদানি ও পর্যাপ্ত মজুদের কারণে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে পাইকারি ও খুচরা দামের মধ্যে বড় ব্যবধানের কারণে চাপ বাড়ছে ভোক্তাদের ওপর।
আমদানিকারকেরা বলছেন, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও যুদ্ধজনিত বিঘ্ন থাকলেও সরবরাহ শৃঙ্খল সচল রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ভারত থেকে নিয়মিত চালান আসছে, পাশাপাশি বিদ্যমান মজুদও মৌসুমি চাহিদা পূরণে সহায়তা করছে।
তবে খুচরা বাজারে দাম চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি কেন্দ্র চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
আমদানিতে কোনো সংকট না থাকলেও খুচরা পর্যায়ের লাগামহীন মুনাফার কারণে কোরবানির মৌসুমে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে পৌঁছে যাচ্ছে এসব পণ্য। বিশেষ করে জায়ফল, রসুন ও দারুচিনির মতো কোরবানির রান্নার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের ক্ষেত্রে এই ফারাক বেশি।
খাতুনগঞ্জ ও নগরীর খুচরা বাজারের দর বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাইকারি বাজারে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া প্রতি কেজি জায়ফল খুচরা বাজারে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে পাইকারিতে ৩৫০ থেকে ৪৪০ টাকার দারুচিনি খুচরায় ৬০০ টাকা এবং ১ হাজার ২০ টাকার গোলমরিচ ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।
এলাচ ও জিরার মতো দামি মসলায় ব্যবধান আরও বেশি। খাতুনগঞ্জে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকায় পাওয়া এলাচ খুচরা বাজারে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কেজি প্রতি ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দিচ্ছেন ক্রেতারা। পাইকারিতে ১৮০ টাকার আস্ত হলুদ খুচরায় ৩০০ টাকা এবং ২৩০ টাকার মরিচ ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের বাজারে পার্থক্য আরও স্পষ্ট। পাইকারিতে দেশি রসুন ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও খুচরায় তা ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠছে। ৯০ থেকে ১০০ টাকার আদা খুচরায় ১৬০ টাকা এবং পাইকারিতে ২০ থেকে ২৮ টাকার পেঁয়াজ খুচরা বাজারে ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
উচ্চ আমদানি শুল্ক ও তদারকির ঘাটতি
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই অস্বাভাবিক মূল্য পার্থক্যের পেছনে উচ্চ আমদানি শুল্ক ও তদারকির ঘাটতি রয়েছে।
আমদানিকারকদের তথ্যমতে, বর্তমানে ৫০০ টাকার জিরার ওপর প্রায় ৫০.৮ শতাংশ বা ২৫০ টাকা শুল্ক দিতে হয়। একইভাবে প্রতি কেজি এলাচে ৬৫০ টাকা এবং গোলমরিচে ২২০ টাকা শুল্ক দিতে হচ্ছে। এই উচ্চ শুল্কের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী স্থলবন্দর দিয়ে অবৈধভাবে পণ্য আনায় বৈধ আমদানিকারকেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দরে নজরদারি জোরদার হলেও স্থলবন্দরগুলোতে তা কার্যত নেই।
এছাড়া কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রাইজ অ্যাসেসমেন্টের জন্য বড় সুপারশপে অভিযান চালালে খুচরা পর্যায়ে আতঙ্কে দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়, যা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, কোরবানি কেন্দ্রিক কেনাবেচা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বাড়বে। তবে শুল্ক কাঠামো ও খুচরা বাজারের এই লাগামহীন মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সাধারণ মানুষের জন্য কোরবানির আনন্দ ম্লান হয়ে যেতে পারে।
খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস মিয়া টিবিএসকে বলেন, "বর্তমানে বাজারে পেঁয়াজের চাহিদা কিছুটা কম। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং পাইপলাইনেও পর্যাপ্ত পণ্য আছে। তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে মজুদ করা পেঁয়াজ নষ্ট হচ্ছে, ফলে আমরা লোকসানে আছি। কোরবানিতে দাম কিছুটা বাড়লে কৃষকেরা তাদের খরচ তুলতে পারবেন। এখন কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।"
পাইকারি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, লোকসান সত্ত্বেও পাইকারি বাজারে দাম বাড়েনি। বরং স্থিতিশীল সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও খুচরা বাজারে উচ্চ দামই বহাল রয়েছে, যার প্রতিফলন বাজারে দেখা যাচ্ছে না।
তাদের বলছেন, শুল্ক কাঠামো ও খুচরা বাজারের লাগামহীন মুনাফা নিয়ন্ত্রণে না আনলে সাধারণ মানুষের জন্য ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে যেতে পারে।
আমদানি ও সরবরাহ স্থিতিশীল
ব্যবসায়ীদের মতে, আমদানি স্বাভাবিক থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থাও ঠিক রয়েছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬০.৫ মেট্রিক টন ১২ ধরনের মসলা আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ৬৯ হাজার ৫৫৯ মেট্রিক টন রসুন, ৬২ হাজার ৩৯৪ মেট্রিক টন আদা এবং ১২ হাজার ৫৩৪ মেট্রিক টন দারুচিনি রয়েছে।
এ ছাড়া জিরা ২ হাজার ৭৯৩ মেট্রিক টন, গোলমরিচ ২ হাজার ৩২১ মেট্রিক টন, লবঙ্গ ১ হাজার ২৫৭ মেট্রিক টন এবং এলাচ ১ হাজার ৯৮ মেট্রিক টন আমদানি হয়েছে। তুলনামূলক কম পরিমাণে আমদানি হয়েছে হলুদ ৭৫৩ মেট্রিক টন, জায়ফল ৩৪৬ মেট্রিক টন, জয়িত্রী ৩৪৫ মেট্রিক টন এবং মরিচ ৮৬ মেট্রিক টন।
ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবানির চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে দেশে ৩০০ টন এলাচ, ১ হাজার ৩০০ টন দারুচিনি এবং ২ হাজার ৫০০ টন জিরার পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এমনকি জিরার দাম ভবিষ্যতে আরও কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বন্দর কাস্টমস ও ভ্যাটবিষয়ক সম্পাদক রাইসুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, "লোহিত সাগর বা হরমুজ প্রণালীর সংকটের সঙ্গে মশলা আমদানির দেশগুলোর সরাসরি যোগসূত্র না থাকায় জাহাজ ভাড়া বাড়লেও তা বাজারে বড় প্রভাব ফেলবে না। বর্তমানে কোরবানির চাহিদার বিপরীতে দেশে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।"
