কওমি শিক্ষার্থীদের বাধায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্থগিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রদর্শনী, সংস্কৃতিপ্রেমীদের ক্ষোভ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় 'বনলতা এক্সপ্রেস' সিনেমার প্রদর্শনীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে প্রচারণা চালানোর পর কোনো অবস্থাতেই সিনেমাটি প্রদর্শন করতে না দেওয়ার বিষয়ে কওমি শিক্ষার্থীদের ঘোষণার পর বিশৃঙ্খলা এড়াতে সিনেমাটির প্রদর্শন স্থগিত করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি।
শুক্রবার (২৯ মে) বিকেলে জেলা শহরের কান্দিপাড়াস্থ জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসায় অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকের পর সিনেমা প্রদর্শন করতে না দেওয়ার ঘোষণা দেয় কওমি শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে সিনেমাটির প্রদর্শনী স্থগিত করে বিবৃতি দেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি। এদিকে সিনেমা প্রদশর্নীতে বাধা দেওয়ায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ জানিয়েছেন সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে আজ শনিবার বিকেল ৩টায় শহরের অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে 'বনলতা এক্সপ্রেস'-এর প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। যদিও বিতর্কের মুখে গতকাল বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিনেমা প্রদর্শনীর অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে দাবি করে।
মূলত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমা প্রদর্শনীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে প্রচারণা চালায় কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। এরপরই বিষয়টি নিয়ে বির্তক শুরু হয়।
কওমি ঐক্যপরিষদ নেতা নাসরুল্লাহ মুয়াজ নিজের ফেসবুক আইডিতে 'বনলতা এক্সপ্রেস' সিনেমা প্রদর্শনীর ফটোকার্ডে লাল ক্রসচিহ্ন দিয়ে পোস্টে লেখেন: 'ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেম-ওলামার শহর। এই শহরে আল্লামা ফখরে বাঙ্গাল (রহ.) একসময় সিনেমা বন্ধ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, কিছু কুচক্রি মহল আবারও শহরে সিনাম চালু করার উপচেষ্টায় লিপ্ত। সাধারণ ছাত্রসমাজ ও সচেতন জনগণের পক্ষ থেকে জোর দাবি জানাচ্ছি এ ধরনের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আমরা প্রশাসনের সুদৃষ্টি ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছি, যাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন থাকে।'
গতকাল বিকেলে জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসায় শীর্ষ আলেম ও কওমি ঐক্যপরিষদ নেতৃবৃন্দের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কওমি ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা, জেলা হেফাজতে ইসলামের সেক্রেটারি মাওলানা আলী আজম। বৈঠকে কোনো অবস্থাতেই সিনেমা প্রদর্শন করতে দেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া সিনেমা প্রদর্শনের নামে কেউ যেন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সেজন্য বাদ যোহর জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসায় সতর্কতামূলক অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে 'বনলতা এক্সপ্রেস'-এর প্রদর্শনী স্থগিত করে বিবৃতি দিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে কর্তৃপক্ষ প্রদর্শনীর ভেন্যুটির অনুমতি প্রত্যাহার করায় সিনেমা প্রদশর্নী সাময়িক সময়ের জন্য স্থগিত করার কথা জানানো হয় বিবৃতিতে।
তবে সিনেমা প্রদর্শনীতে বাধা দেয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার শাহরিয়ার বলেন, 'ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় বাধার সম্মুখীন হওয়ার পরও আমরা চেষ্টা করেছিলাম সিনেমাটি প্রদর্শন করতে। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ হামলার আশঙ্কায় সিনেমা প্রদর্শনের অনুমতি বাতিল করেছে। ফলে আমরা চেষ্টা করেও কোনো ভেন্যু না পাওয়ায় প্রদর্শনী স্থগিত করেছি। প্রশাসন থেকেও কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমাদেরকে বলা হয়েছে আপাতত এটা বন্ধ রাখতে।'
তিনি আরও বলেন, 'এটা কোনোভাবেই কাম্য না। ওনারা (কওমি শিক্ষার্থী) যদি এটা না চায়, তাহলে ওনারা প্রত্যাখান করুক যে ওনারা আসবে না। কিন্তু যারা এটা করতে চায়, তাদের অবশ্যই করতে দিতে হবে।'
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক আব্দুন নূর বলেন, "'বনলতা এক্সপ্রেস'-এর প্রদর্শনী বন্ধ করাকে ঘিরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সম্পর্কে সারা দেশ, এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গণে একটা নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। সরকারি আইন অনুযায়ী সিনেমা প্রদর্শন নিষিদ্ধ নয়। এখানে সরকারি আইন অমান্য হয়েছে। এটি গণতন্ত্রের পরিপন্থী।'
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ বলেন, 'সিনেমা প্রদর্শনের বিষয়ে আমাদের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। তবে ফেসবুকে নানা রকম আলোচনার কারণে অনানুষ্ঠানিকভাবে জেনেছি। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় আপাতত "বনলতা এক্সপ্রেস"-এর প্রদর্শনী বন্ধ থাকবে।'
