‘অমরত্বের’ সন্ধানে পুতিন: চলছে ২৬ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প, করতে চান অঙ্গ ‘মেরামত’!
মার্কিন প্রযুক্তি জগতের ধনকুবের জেফ বেজোস, স্যাম অল্টম্যান বা পিটার থিয়েলের মতো মানুষের আয়ু বাড়াতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করছেন ভ্লাদিমির পুতিনও। তবে এসব গবেষণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে সন্দিহান সমালোচকদের একাংশ।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কোষের বার্ধক্য ঠেকাতে জিন-থেরাপির মতো ওষুধ তৈরিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গবেষণায় অন্তত ২৬ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছেন ৭৩ বছর বয়সি রুশ প্রেসিডেন্ট। এ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে 'নিউ হেলথ প্রিজারভেশন টেকনোলজিস'।
গত মাসে রুশ সরকার ঘোষণা করেছে, এ প্রকল্পের আওতায় বিজ্ঞানীরা যে জিন থেরাপি তৈরি করছেন, সেটি কোষের বার্ধক্যের গতি ধীর করে দিতে পারে।
রাশিয়ার উপ-বিজ্ঞানমন্ত্রী দেনিস সেকিরিনস্কি এপ্রিলে দাবি করেছিলেন, 'এই ওষুধ বার্ধক্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক সম্ভাবনাগুলোর একটি।'
তবে পুতিনের এই দীর্ঘায়ু লাভের ইচ্ছা নতুন নয়। ১৬ বছর বয়স থেকেই নাকি এই বিষয়ে আচ্ছন্ন তিনি। আর সেই 'নেশা' থেকেই গত কয়েক দশক ধরে এমন একাধিক প্রকল্পে উৎসাহ দিচ্ছেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
পুতিনের নির্দেশে চলা অন্য গবেষণাগুলোর মধ্যে রয়েছে জেনোট্রান্সপ্ল্যান্টেশন বা শূকরের শরীরে মানুষের অঙ্গ তৈরি করে তা প্রতিস্থাপন করা এবং বায়োপ্রিন্টিং বা থ্রি-ডি প্রিন্টারের সাহায্যে সজীব কলার অবয়ব তৈরি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ সরকারের অনুদানে গবেষণারত বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি ও মানুষের কার্টিলেজ টিস্যু তৈরিতে সফল হয়েছেন। চলতি দশকের শেষেই মানুষের সম্পূর্ণ অঙ্গ প্রতিস্থাপনের উপযোগী করে তৈরি করা যাবে বলে দাবি তাদের।
২০২৪ সালের এপ্রিলে পুতিন নিজেই প্রকাশ্যে এই উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেছিলেন। ২০৩০ সালের মধ্যে এই আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে পৌনে ২ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে বলেও দাবি করেন তিনি।
ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলাআ হয়েছে, 'রুশ ফেডারেশনে এ-সংক্রান্ত একগুচ্ছ বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মসূচি চলছে। সরকারের পূর্ণ সমর্থনে একাধিক প্রথম সারির গবেষণা প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নিয়েছে।'
এ উদ্যোগের নেতৃত্বে রয়েছেন পুতিনের নিজের কন্যা, ৪১ বছর বয়সি এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট (হরমোন বিশেষজ্ঞ) মারিয়া ভোরোন্তসোভা। সরকারি জিনতত্ত্ব সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর তদারকি করছেন তিনিই।
এছাড়া এ প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রখ্যাত রুশ পদার্থবিদ মিখাইল কোভালচুক। তার ভাই ইউরি আবার পুতিনের ঘনিষ্ঠ অর্থলগ্নিকারী হিসেবে পরিচিত।
রুশ সংবাদমাধ্যমে কোভালচুক বলেন, 'অমরত্ব নিয়ে আলোচনা করা কঠিন, তবে মানুষের শরীরকে মেরামত করার ক্ষমতা যে আগামী দিনে বহুগুণ বাড়বে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।' অদূর ভবিষ্যতেই মানুষ নিজের প্রয়োজনমতো অঙ্গ প্রতিস্থাপন ও তা সারিয়ে তুলতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।
তবে সমালোচকরা বলছেন, এ-সংক্রান্ত গবেষণাপত্র বিশেষজ্ঞ মহলে পর্যালোচিত হয়ে প্রকাশের নজির প্রায় নেই। গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা রাশিয়ার দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতাকে খুশি রাখতেই গবেষকদের এই অংশ সম্ভবত তার সবকিছুতে 'হ্যাঁ' বলছেন।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশ ছাড়েন রাশিয়ায় বায়োপ্রিন্টিংয়ের পথিকৃৎ আলেকজান্ডার অস্ত্রভস্কি। তিনি বলেন, 'গবেষণাপত্র প্রকাশিত না হওয়ার অর্থ, তার বাস্তব কোনো ফলও মেলেনি। তাদের এই দাবিগুলিকে বড়জোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা স্বপ্ন হিসেবেই ধরে নেওয়া যেতে পারে।'
তিনি আরও বলেন, "বিচ্ছিন্ন থেকে বিজ্ঞান সাধনা করা অসম্ভব। নিজেদের গবেষণার অনুদান নিশ্চিত করতে পুতিন যা শুনতে চাইছেন, তারা সম্ভবত তাকে সেটাই বলছেন।'
২০২৪ সালে মারা যান রাশিয়ার অন্যতম শীর্ষ চিকিৎসক ভ্লাদিমির খাভিনসন। মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল পুতিনের আয়ু বাড়ানো। মানুষের আয়ু বাড়িয়ে ১২০ বছর করারও স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
স্বাস্থ্য নিয়ে পুতিনের বাড়াবাড়ি রকমের সচেতনতা দীর্ঘ দিন ধরেই জনসমক্ষে স্পষ্ট।
পেশিবহুল খালি গায়ে ঘোড়া বা মোটরবাইকে আরোহী প্রেসিডেন্ট—কিংবা ভালুক শিকার বা মাছ ধরার সময় তার বিভিন্ন ছবি সমাজমাধ্যমে এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে গত কয়েক বছরে তা নিয়ে প্রচুর মিমও তৈরি হয়েছে।
অন্যান্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গেও নিজের দীর্ঘায়ূ পরিকল্পনা নিয়ে অনেকবার কথা বলেছেন পুতিন। ২০২৫ সালে চালু থাকা একটি মাইকে শোনা যায়, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে তিনি বলছেন, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে মানুষ অনন্তকাল বাঁচতে পারে। আবার ২০১৮ সালে অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর সেবাস্টিয়ান কুর্জের কাছে বরফশীতল ক্রায়োথেরাপি চেম্বারে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার উপকারিতা সম্পর্কেও তিনি কথা বলেছিলেন।
ধারণা করা হয়, দীর্ঘায়ু নিয়ে পুতিনের এই মোহ শুরু হয়েছিল ১৯৬৮ সালে। ওই বছর মুক্তি পায় সোভিয়েত চলচ্চিত্র 'ডেড সিজন'। চিকিৎসাবিজ্ঞানে নানা পরীক্ষার মাধ্যমে মানবজাতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সিআইএর গুপ্তচরদের সঙ্গে নাৎসি চিকিৎসকদের হাত মেলানোর গল্প দেখানো হয়েছিল সেই ছবিতে।
এই ছবিটি পুতিনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি নিজেই বলেলেন, ১৯৭৫ সালে তার কেজিবিতে যোগ দেওয়ার পেছনে এই ছবির বড় অনুপ্রেরণা ছিল।
দীর্ঘায়ু নিয়ে পুতিনের এই মোহ এবং তা ঘিরে তৈরি হওয়া তার ভাবমূর্তির কারণে গত কয়েক বছর ধরে তার স্বাস্থ্য নিয়ে নানা জল্পনা ও ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব পিছু ছাড়েনি।
গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি ভিডিওতে রুশ প্রেসিডেন্টের হাত-পা কাঁপতে দেখা গেছে। তার চেহারায় দৃশ্যমান পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করে অনেকেই দাবি করেছেন, পুতিন কার্যত মৃত্যুশয্যায়। এমনকি তিনি ইতিমধ্যেই মারা গেছেন এবং রুশ জনতাকে ধোঁকা দিতে তার জায়গায় 'বডি ডাবল' ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও জল্পনা ছড়িয়েছে।
