চীনা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে থাকতে পারে ইরান, বলছে সূত্র
গত মাসে ইরানের আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের যে এফ-১৫ যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হয়েছিল, সেটি মূলত চীনের তৈরি কাঁধে রেখে ব্যবহারযোগ্য একটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। এ বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ এই তথ্য জানিয়েছে।
এছাড়াও যুদ্ধের শুরুর দিকে চীন ইরানকে একটি দূরপাল্লার আর্লি-ওয়ার্নিং রাডার সরবরাহ করে থাকতে পারে, যা রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম মার্কিন স্টিলথ যুদ্ধবিমানগুলোকেও শনাক্ত করতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তারা এখনো এপ্রিল মাসে এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমানটি কীভাবে ভূপাতিত হয়েছিল তা তদন্ত করছেন। কয়েক দশকের মধ্যে এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে শত্রুপক্ষের হামলায় কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে।
সামরিক সরঞ্জামগুলো ঠিক কবে ইরানের হাতে পৌঁছেছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে ইরানের হাতে চীনা অস্ত্রের ব্যবহার এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংঘাত অবসানে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চাইছেন। যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো 'প্রতিরক্ষামূলক হামলা' নামে আখ্যায়িত সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
এই মাসের শুরুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি মধ্যস্থতা করে। ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা হিসেবে চীন বারবার বলেছে, যুদ্ধের অবসান হওয়া উচিত।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এনবিসিকে বলেন, বৈশ্বিক তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব থেকে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি মুক্ত নয়, তবে অন্যান্য দেশ বেশি চাপের মুখে রয়েছে। তার মতে, এ সংকট সমাধানে চীনেরও ভূমিকা রাখা উচিত।
তবে রুবিও দাবি করেছেন যে ট্রাম্প বেইজিংয়ের ওপর নির্ভর করছেন না। তিনি বলেন, 'আমরা চীনের সাহায্য চাচ্ছি না। আমাদের তাদের সাহায্যের প্রয়োজন নেই।'
ভূপাতিত হওয়া বিমানটি থেকে দুই বৈমানিক নিরাপদে বের হতে পেরেছিলেন। পেন্টাগন জানিয়েছে, পাইলটকে ৭ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ওয়েপন সিস্টেমস অফিসারকে খুঁজে পেতে দুই দিন সময় লেগেছিল, যিনি জাগ্রোস পর্বতমালার পাদদেশে লুকিয়ে ছিলেন।
যে ক্ষেপণাস্ত্রটি দিয়ে বিমানটি ধ্বংস করা হয়েছে, সেটি প্রায় ৭ ফুট দীর্ঘ এবং ওজন প্রায় ৪০ পাউন্ড। 'ম্যানপ্যাড' নামের এই সস্তা অস্ত্রটি নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া বিমান ধ্বংস করতে অত্যন্ত কার্যকর।
এফ-১৫ ভূপাতিতকারী সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্রটি সম্প্রতি ইরানে পৌঁছেছিল নাকি বহু বছর আগে পাঠানো অস্ত্রভাণ্ডারের অংশ ছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়। একইভাবে ওয়াইএলসি-৮বি নামে পরিচিত রাডারটি যুদ্ধ চলাকালে মোতায়েন করা হয়েছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস ফক্স নিউজকে দেওয়া ট্রাম্পের একটি সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করেছে, যেখানে ট্রাম্প বলেছিলেন যে শি জিনপিং তাকে কোনো সামরিক সরঞ্জাম না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, 'প্রেসিডেন্ট শি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি ইরানে কোনো অস্ত্র পাঠাচ্ছেন না। এটি একটি সুন্দর প্রতিশ্রুতি। আমি তাঁর কথা বিশ্বাস করি। আমি এর প্রশংসা করি।'
এফ-১৫ ভূপাতিত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, সামরিক পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে চীন সবসময় সতর্ক ও দায়িত্বশীল আচরণ করে এবং নিজস্ব আইন ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে মেনে চলে। তিনি অভিযোগগুলোকে 'ভিত্তিহীন অপপ্রচার' বলে অভিহিত করেন।
এনবিসির আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী চীন আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানকে নতুন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, চীনের পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আনতেই হয়তো এসব গোয়েন্দা তথ্য ফাঁস করা হয়েছে।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন অভিযোগ করেছিল, চীন ইরানকে চীনা স্যাটেলাইট ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে, যাতে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এ অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি চীনা স্যাটেলাইট কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যদিও চীন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, চীন ইরানকে কী ধরনের সহায়তা দিচ্ছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র অবগত। তবে চলমান সংঘাতে ওই সহায়তা যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো নির্ণায়ক প্রভাব ফেলেনি।
তার ভাষায়, 'এটি উল্লেখযোগ্য সহায়তা ছিল না। এর কোনো সিদ্ধান্তমূলক সামরিক প্রভাবও পড়েনি।'
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে চীন ইরানের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করেছিল। এর মধ্যে ছিল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংক, কামান এবং যুদ্ধবিমান।
তবে ২০০৬ সালে জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর চীন বড় ধরনের অস্ত্র বিক্রি থেকে সরে আসে। পরিবর্তে বেসামরিক ও সামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করতে থাকে।
এদিকে ইরান নিজস্ব সামরিক শিল্প গড়ে তুলে দেশীয়ভাবে অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বহু বছর ধরে চীন ইরানের জন্য অর্থনৈতিক জীবনরেখা হিসেবে কাজ করেছে।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ক্রেগ সিংগেলটন বলেন, এই প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমেই বেইজিং ইরানকে নিজেদের সামরিক ও নজরদারি ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে সাহায্য করেছে।
