‘মাস্কিটো ফ্লিট’: মার্কিন হামলা সামলে ‘বহাল তবিয়তে’ টিকে আছে ইরানের ‘অন্য’ নৌবাহিনী, ছড়াচ্ছে আতঙ্ক
ইরানের প্রথাগত নৌবাহিনীর অনেক রণতরি ধ্বংস হয়ে গেলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটির আসল সামুদ্রিক শক্তি ওইসব রণতরি ছিল না।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বিপদে ফেলার সক্ষমতা আসলে নির্ভর করে ইরানের সস্তা ও অপ্রথাগত যুদ্ধকৌশল ব্যবস্থার ওপর। এ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে ড্রোনের ব্যবহার, মাইন পাতা ও একঝাঁক ছোট ছোট অ্যাটাক বোট। প্রথাগত রণতরির তুলনায় এসব বোট চিহ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন।
সামরিক বিশ্লেষকরা এই নৌবহরকে 'মাস্কিটো ফ্লিট' বা 'মশা বাহিনী' নামে ডাকেন। ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর-এর (আইআরজিসি) অধীনে থাকা এই ছোট বোট এবং তাতে থাকা মিসাইল ও আধুনিক সমরাস্ত্র মার্কিন বাহিনীর জন্য বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। বিস্তীর্ণ সমুদ্র এলাকাজুড়ে এই ঝুঁকি সামাল দেওয়া ওয়াশিংটনের জন্য বেশ কঠিন কাজ।
একে কার্যত পানিতে 'গেরিলা যুদ্ধ' বলা যায়। ভৌগোলিক অবস্থানও ইরানের অনুকূলে। কারণ সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালি ছাড়া জাহাজ চলাচলের দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।
রয়্যল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স-এর (রুসি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো সিদ্ধার্থ কৌশল বলেন, জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিতে যে বিপুলসংখ্যক নৌবহরের প্রয়োজন, তা জোগাড় করা 'অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ'।
ছোট বোটের ব্যবহার ইরান বহু দশক ধরে করে আসছে। বিশেষত ১৯৮৮ সালে পারস্য উপসাগরে মার্কিন বাহিনীর হাতে ইরানের প্রথাগত নৌবাহিনী পর্যুদস্ত হওয়ার পর থেকেই এই কৌশল ব্যবহার করছে তেহরান। সিদ্ধার্থ কৌশল বলেন, 'এরপর থেকেই ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনী কার্যত একটি প্যারেড গ্রাউন্ডের বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে আইআরজিসির নৌবাহিনী অপ্রথাগত যুদ্ধাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়েছে। যুদ্ধে এটিই বেশি কার্যকর এবং রণকৌশলের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।'
খুব কম সংখ্যক ক্রু নিয়ে চলা এই নৌযান ও ড্রোনচালিত বোটগুলো পানির খুব কাছ দিয়ে চলে। ফলে রাডারে এদের চট করে ধরা যায় না। মার্কিন নজরদারিতে ধরা পড়ার আগেই এরা অনেক সময় লক্ষ্যস্থলের কাছে পৌঁছে যায়। এদের রুখতে আমেরিকাকে হেলিকপ্টার ও ড্রোনের সাহায্য নিতে হয়।
ওয়াশিংটন ডিসি-র হাডসন ইনস্টিটিউট-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আইআরজিসি মাঝেমধ্যেই মাইন পাতার মতো গোপন কাজে মাছ ধরার সাধারণ বোট ব্যবহার করে। এতে মার্কিন নজরদারি ব্যবস্থার কাজ আরও জটিল হয়ে পড়ে।
হাডসন ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণ, এই রণকৌশলের মূল লক্ষ্য সরাসরি যুদ্ধ জয় নয়, বরং শত্রুপক্ষকে ব্যতিব্যস্ত রাখা এবং তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ইরানের তৈরি এই নৌযানগুলো বেশ সস্তা এবং যুদ্ধের সময় সহজেই বদলে ফেলা যায়। এর ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়েও উৎপাদন বজায় রাখা সম্ভব। খুব অল্প খরচে অন্যের দামি রণতরি ও বিশ্ব বাণিজ্যকে বিপদে ফেলাই তেহরানের মূল লক্ষ্য।
ইরানের কিছু অপ্রথাগত রণকৌশল, যেমন মাইন বা তথাকথিত 'মিজেট সাবমেরিন' মোকাবিলা করা মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষে তুলনামূলক সহজ। সিদ্ধার্থ কৌশল বলেন, এই ছোট সাবমেরিনগুলো সাধারণত ইরানের সুপরিচিত বন্দরগুলো থেকেই কাজ চালায়। ফলে আমেরিকা চাইলে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা সহজ।
সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ব্রায়ান ক্লার্ক বলেন, সমুদ্রের তলদেশে তল্লাশি চালিয়ে মাইন চিহ্নিত করার জন্য আমেরিকার কাছে আধুনিক চালকবিহীন যান রয়েছে। তবে জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ রুট খুঁজে বের করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া।
এর পাশাপাশি ইরানের বহুমুখী রণকৌশল সামলানো আমেরিকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দেশটির দক্ষিণ উপকূলের কয়েকশো মাইল দীর্ঘ পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে জাহাজ-বিধ্বংসী মিসাইল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মোবাইল মিসাইল ব্যবস্থাগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া যায়। ফলে এগুলোকে চিহ্নিত করে ধ্বংস করা কঠিন। উপকূলরেখা দীর্ঘ হওয়ায় ইরান শুধু হরমুজ প্রণালি নয়, তার বাইরেও হামলা চালাতে সক্ষম।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নিক চাইল্ডস মনে করেন, এই বহুমুখী কৌশলের সংমিশ্রণই আমেরিকার মূল মাথাব্যথার কারণ। তার মতে, 'মাস্কিটো ফ্লিটের' মোকাবিলায় সবসময় একটি আশঙ্কার চোরাস্রোত থেকে যায়। কোনো একটি হামলা যদি নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে বেরিয়ে যায়, তবেই বড় বিপদ।
চাইল্ডস বলেন, 'সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে মিসাইল বা "সুইসাইড ড্রোন" বেশি ক্ষয়ক্ষতি করলেও সামুদ্রিক মাইন ও দ্রুতগতির ছোট বোটগুলোই নাবিকদের মনে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি করে।'
ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার-এর (ইউকেএমটিও) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরে অন্তত ২৬টি জাহাজ ইরানের হামলার মুখে পড়েছে।
সিদ্ধার্থ বলেন, কৌশলগত দিক থেকে ইরানকে খুব বেশি জাহাজ ডোবাতে হবে না। গুটিকয়েক সফল হামলাই বিমা কোম্পানি ও জাহাজ মালিকদের পিছু হটতে বাধ্য করার জন্য যথেষ্ট। নাবিকদের জীবন ও পণ্য ঝুঁকির মুখে পড়লে তারা আর ওই পথে জাহাজ পাঠাতে চাইবে না। ফলে আমেরিকার সামনে চ্যালেঞ্জটা বহুগুণ বেশি।
মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাহারা দিয়ে জাহাজ পারাপারের কাজ স্থগিত রাখবে আমেরিকা। তবে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ জারি থাকবে।
অন্যদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, সোমবার মার্কিন বাহিনীর পাহারায় আমেরিকার পতাকাবাহী দুটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ পার হয়েছে। তবে তাতে প্রণালিতে সামগ্রিক জাহাজ চলাচলের চিত্রে বিশেষ কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
