সর্বশেষ প্রস্তাবেও আমেরিকার ‘পছন্দমতো’ চুক্তি নিয়ে আসেনি ইরান, ‘অসন্তুষ্ট’ ট্রাম্প
যুদ্ধ থামাতে ইরানের পাঠানো সর্বশেষ প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন নন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, আমেরিকা নিজেদের আচরণ ও অবস্থান বদলালে তবেই কূটনীতির রাস্তায় হাঁটবে তেহরান।
যুদ্ধ শেষ করার খসড়া প্রস্তাবে আমেরিকার আনা সাম্প্রতিক সংশোধনীগুলোর জবাব দিয়ে নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। তবে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, তেহরানের দেওয়া প্রস্তাবে তিনি 'সন্তুষ্ট' হতে পারছেন না।
'ওরা (ইরান) চুক্তি করতে চায় ঠিকই, কিন্তু আমি এই প্রস্তাবে খুশি হতে পারছি না,' হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন তিনি।
ট্রাম্প আরও বলেন, 'ওরা এমন কিছু দাবি করছে যা মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।' তবে ফোনে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, 'আমেরিকা ঠিক যেমনটা চাইছে, তেমন চুক্তি নিয়ে আসছে না ইরান। তবে আমরা গোটা বিষয়টি যথাযথভাবেই সম্পন্ন করব।'
শুক্রবার ফ্লোরিডায় এক বক্তৃতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, আমেরিকা তড়িঘড়ি এই সংঘাত মেটাতে চায় না। এখন দায়সারাভাবে চুক্তির চেষ্টা করলে আগামী তিন বছরের মধ্যে একই সমস্যা ফের মাথাচাড়া দিতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
'আমরা এখনই লড়াই ছেড়ে বেরিয়ে আসব না। কারণ, আমরা চাই না বছর তিনেক পরে ফের একই সংকটের মুখে পড়তে হোক,' বলেন তিনি।
এদিকে ইরানের এই পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির পথ এখনও পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যায়নি। যদিও পারস্য উপসাগরে ইরানের ওপর কড়া নৌ-অবরোধ জারি রেখেছে আমেরিকা। একই সঙ্গে তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বিকল্পও খতিয়ে দেখছে ট্রাম্প প্রশাসন।
একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে জানান, বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আমেরিকার কাছে নিজেদের বক্তব্য পাঠিয়েছে ইরান।
শুক্রবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, 'মাত্রই ইরানের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। দেখা যাক কী হয়। তবে আমি খুব একটা খুশি নই।'
গত উইকএন্ডেই হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেওয়া ও যুদ্ধ বন্ধের জন্য আমেরিকাকে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিল ইরান। সেই প্রস্তাবে পারমাণবিক আলোচনার বিষয়টি পরবর্তী সময়ের জন্য স্থগিত রাখার কথা বলা হয়েছিল।
সূত্রেমতে, গত সোমবার হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইরানের ওই প্রস্তাবে একগুচ্ছ সংশোধনী পাঠান। আমেরিকার মূল লক্ষ্য ছিল পরমাণু ইস্যুটিকে ফের আলোচনার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা।
সূত্রটি জানায়, একটি সংশোধনীতে শর্ত দেওয়া হয়েছে, আলোচনা চলাকালীন ইরান তাদের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনা থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরাতে পারবে না। এমনকি ওই স্থাপনাগুলোতে নতুন করে কাজও শুরু করা যাবে না।
ট্রাম্পের দাবি, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব অত্যন্ত 'অসংলগ্ন'। তার মতে, দেশটির সরকারের অন্দরেই নানা গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের মতাদর্শ ভিন্ন। ওভাল অফিসে বসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, 'ওরা কিছুটা এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।'
এর এক দিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, 'ওরা (ইরান) চুক্তি করার জন্য মরিয়া হয়ে আছে। কিন্তু ওদের আসল নেতা কে, সেটাই কেউ নিশ্চিত ভাবে জানে না।'
অন্যদিকে, ইরানের দাবি, চুক্তি করার জন্য আসলে ট্রাম্পই ছটফট করছেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি অ্যাক্সিওসকে বলেন, 'কূটনৈতিক পর্যায়ে কী কথা হচ্ছে, তা আমরা বিস্তারিত জানাব না। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না। আমেরিকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই আলোচনা চলছে।'
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তুরস্ক, মিশর ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তেহরান সূত্রের খবর, আরাগচি জানিয়েছেন যে ইরান কূটনৈতিক পথে হাঁটতে রাজি। তবে তার আগে আমেরিকাকে 'অতিরিক্ত দাবি', 'হুমকির সুর' ও 'উসকানিমূলক আচরণ' বন্ধ করতে হবে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে জাতীয় নিরাপত্তা টিমের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায় ৪৫ মিনিট বৈঠক করেন ট্রাম্প। সেখানে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও সিআইএ-প্রধান জন র্যাটক্লিফ উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র জানিয়েছে, ওই বৈঠকে সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ও জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের নতুন পরিকল্পনা ট্রাম্পকে ব্রিফ করেছেন।
ওই ব্রিফিং সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প শুক্রবার বলেন, 'আমাদের হাতে অনেক রাস্তা খোলা আছে। আমরা কি ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চিরতরে গুঁড়িয়ে দেব, নাকি আলোচনার মাধ্যমে চুক্তিতে পৌঁছনোর চেষ্টা করব—সেটাই এখন দেখার বিষয়।' তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন যে, তিনি ফের বোমাবর্ষণ শুরু করার পক্ষপাতী নন।
