ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে নিরপেক্ষ ওমানকে চাপ দিচ্ছে ক্ষুব্ধ আমেরিকা
আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেহরানের সঙ্গে পর্দার আড়ালে দৌত্য (ব্যাকচ্যানেল) শুরু করতে তৎপর হয়েছিলেন ওমানের কর্মকর্তারা। এর ফলেই উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ফের আকাশপথ খুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল বলে জানান আরব কর্মকর্তারা। এ যুদ্ধে মাসকটের কঠোর নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণেই এমন কূটনৈতিক সাফল্য এসেছিল।
কিন্তু তিন মাস পেরোতে না পেরোতেই সেই নিরপেক্ষ অবস্থান বুমেরাং হতে শুরু করেছে। তেহরানের প্রতি ওমানের এই মনোভাবকে আমেরিকার বিরুদ্ধে শত্রুতাপূর্ণ আচরণ বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। আমেরিকা ও আরব কর্মকর্তারা মনে করছেন, ওমানকে একটি পক্ষ বেছে নিতে এবং ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাপ দিচ্ছে তারা।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি ওমানের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপানোর, এমনকি বোমা হামলারও হুমকি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। আমেরিকার এক গোয়েন্দা রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ থেকে টোল আদায়ে ইরানের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল মাসকট। এ রিপোর্টের পরই কড়া অবস্থান নেয় আমেরিকা। যদিও এমন পরিকল্পনার কথা বারবার অস্বীকার করেছে ওমান।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে আমেরিকার এই চাপ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি ওমানের তথ্য মন্ত্রণালয়। তবে দেশটির তথ্যমন্ত্রী আবদুল্লা আল-হারাসি বলেছেন, 'স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, বিশৃঙ্খলা রোধ করতে এবং আমাদের যৌথ কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দায়িত্বশীল অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে ওমান প্রস্তুত।'
দুজন আরব কর্মকর্তার তথ্যানুসারে, যুদ্ধের শুরু থেকেই দীর্ঘদিনের মিত্র আমেরিকা ও হরমুজ প্রণালির ওপারের শক্তিশালী প্রতিবেশী ইরানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে ওমান। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল করতেই এই কৌশল নিয়েছিল দেশটি।
কিন্তু যে আরব দেশটির সঙ্গে উভয় পক্ষই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত, এখন তারা সেই গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। তারা আমেরিকার পক্ষ নিলে, উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের উপর ইরান যে ধরনের হামলা চালিয়েছিল, ওমানকেও সেই একই আক্রমণের মুখে পড়তে হতে পারে।
ব্রিটেনের থিঙ্কট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, 'যে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির জন্য গর্ববোধ করে এসেছে, তেহরানের প্রতি তাদের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি তাদের উপরই সমালোচনা ও অবাঞ্ছিত নজরদারির দরজা খুলে দিয়েছে।' তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই হুমকি বুঝিয়ে দিয়েছে যে আমেরিকার একাংশের ধারণা, ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল ওমান।
এর আগে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরমাণু-সংক্রান্ত আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল ওমান। কিন্তু হরমুজে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া এবং এ অঞ্চলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরেও ইরানের নাম নিয়ে নিন্দা জানায়নি। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন বলেছেন, নিজস্ব কূটনৈতিক ঐতিহ্যের কারণেই ওমান এই অবস্থান নিয়েছিল।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, এ সংঘাত গোটা অঞ্চলটিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। পাশাপাশি আমেরিকার সঙ্গে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করারও পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।
যুদ্ধের সময়ে অন্য প্রতিবেশীদের তুলনায় ওমানের উপর অনেকটাই কম আক্রমণাত্মক ছিল ইরান।
আরব ও মার্কিন কর্মকর্তাদের একাংশ বলছেন, যুদ্ধের শুরুর দিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে রসদ জোগাতে ওমানের ভূখণ্ড ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, সেই সামরিক সহায়তার পরিমাণ ছিল অতি সামান্য।
ওমান প্রসঙ্গে মার্কিন অবস্থান জানতে চাওয়া হলে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে গত সপ্তাহের মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়। গত বুধবার ট্রাম্প তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই হুমকি দেন, ওমান যদি জাহাজ চলাচলে ইরানের টোল আদায়ের পরিকল্পনাকে সমর্থন করে, তবে দেশটিতে বিমান হামলা চালানোর নির্দেশ দিতে পারেন তিনি। যদিও মাসকট বারবার এ ধরনের কোনো ইচ্ছার কথা অস্বীকার করেছে।
হরমুজ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে টোল নেওয়া হলে ওমানের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপানোর হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও। এর পরদিনই অবশ্য তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ওমানের রাষ্ট্রদূত তালাল আলরাহবি তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে উপসাগরীয় দেশটির 'শুল্ক আদায়ের কোনো পরিকল্পনা নেই'।
আরব কর্মকর্তারা বলেন, আমেরিকার এই আকস্মিক বৈরী আচরণে ওমানের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্তম্ভিত। এর জবাব কীভাবে দেওয়া যায়, তা নিয়ে এখন ভাবনাচিন্তা করছেন তারা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ওমান একটি জনসংযোগ অভিযান শুরু করতে পারে। এর লক্ষ্য হবে এটা দেখানো যে, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল বাড়ানোর পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এক কর্মকর্তা জানান, এর অংশ হিসেবে তারা জাতিসংঘের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবেন, যাতে খাদ্যসংকটে ভোগা আফ্রিকার দেশগুলোর মানবিকতার খাতিরে সারের উপাদানবাহী জাহাজগুলোকে নিরাপদে যেতে দিতে ইরানকে রাজি করানো যায়।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের জাহাজকে দিকনির্দেশ করা, নিখোঁজদের সন্ধান ও উদ্ধারকাজ এবং জাহাজের কর্মীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে সাহায্য করে আসছে ওমান।
ওমানের তথ্যমন্ত্রী আল-হারাসি বলেছেন, হরমুজ দিয়ে বাণিজ্য ও জ্বালানির অবাধ প্রবাহ বজায় রাখতে তার দেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, 'এই জলসীমায় অবাধ জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে যেকোনো হুমকি আমেরিকাসহ গোটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বার্থেরই ক্ষতি করবে।'
মে মাসে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের শুল্ক আদায়ের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বে জাতিসংঘে একটি বিবৃতি পেশ করা হয়। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ওমানই ওই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হয়নি।
আমেরিকার সঙ্গে ওমানের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। কোনো আরব দেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের এটাই অন্যতম পুরনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। অন্যদিকে শিয়া-প্রধান ইরানের সঙ্গেও এই ওমানের শতাব্দীপ্রাচীন সম্পর্ক রয়েছে। আরব বিশ্বের সুন্নি প্রতিবেশীদের থেকে ওমানিরা কিছুটা আলাদা। তারা ইসলামের 'ইবাদি' মতাদর্শের অনুসারী। ইসলামের মূল ধারা থেকে বহু আগে তৈরি হওয়া এই গোষ্ঠীটি মূলত তাদের উদারপন্থি ও সমতাবাদী মানসিকতার জন্য পরিচিত।
ওয়াশিংটনের বিশ্বস্ত আলোচক হিসেবে পরিচিত ওমান ১৯৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ থামানোর আলোচনার আয়োজন করেছিল। পরে ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে তেহরানের ব্যাকচ্যানেল যোগাযোগে মধ্যস্থতাও করেছিল তারা। ওই যোগাযোগের ফলে ২০১৫ সালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির রাশ টানতে চুক্তি সই হয়।
নিজের প্রথম মেয়াদে সেই চুক্তি থেকে আমেরিকাকে বের করে এনেছিলেন ট্রাম্প।
অতি সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দুই দফায় পরমাণু-সংক্রান্ত আলোচনার মধ্যস্থতা করেছিল ওমান। কিন্তু গত বছরের জুনে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার কারণে প্রথমবার এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় দ্বিতীয়বার সেই আলোচনা ভেস্তে যায়।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, মাসকটের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবিশ্বাসের সূত্রপাত আমেরিকা ও ইসরায়েলের প্রথম বিমান হামলার এক দিন আগে, যখন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি মার্কিন টিভি চ্যানেলে দাবি করেছিলেন যে পরমাণু চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত। সংঘাত এড়াতে কূটনীতিকে একটু সময় দিলেই সমঝোতা সম্ভব বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, চুক্তি হওয়ার মতো পরিস্থিতি তখন তৈরিই হয়নি। কারণ নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে ইরান কোনো আন্তরিক প্রস্তাব দেয়নি।
এরপর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন ওমানকে যেকোনো কূটনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে বলে জানান মার্কিন কর্মকর্তারা। তবে গত সপ্তাহের মন্ত্রিসভা বৈঠকে ট্রাম্প ওমানের উপর হামলার হুঁশিয়ারি দিলেও ইরানকে সমর্থনের জন্য দেশটিতে সামরিক অভিযান চালানোর মতো কোনো বাস্তব পরিকল্পনা আমেরিকার নেই।
আমেরিকার এই সমালোচনা ওয়াশিংটনের ক্ষমতার বলয়ে ওমানের দুর্বল অবস্থানকে প্রকাশ্যে এনেছে। উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের তুলনায় ওমান ছোট তেল উৎপাদনকারী দেশ, আর্থিকভাবেও ততটা সমৃদ্ধ নয়। ফলে বিপুল ব্যবসা বা প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে যে ধরনের প্রভাব খাটানো সম্ভব, তা মাসকটের নেই। আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব বা কুয়েতের মতো ওমানে আমেরিকার কোনো স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি নেই। তবে ওমানের বন্দরগুলোকে পেন্টাগন রসদ সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।
ইরানের সঙ্গে ওমানের এই ঘনিষ্ঠতা কেবল আমেরিকাকেই চটায়নি, ক্ষুব্ধ করেছে এ অঞ্চলে ওয়াশিংটনের সহযোগী দেশগুলোকেও। বিশেষত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মতে, ওমান বড্ড বেশি তেহরান-ঘেঁষা।
আরব কর্মকর্তারা বলেন, ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে আমেরিকা ও মিত্র দেশগুলোর যৌথ বিবৃতিতে বারবার স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেছে ওমান। এতেই চটেছে আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। এমনকি ওমানের বন্দরে ইরানের ড্রোন আছড়ে পড়ার পর তারা ঘটনার কথা স্বীকার করলেও এর জন্য তেহরানকে সরাসরি দায়ী করেনি মাসকট।
মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিলে উপসাগরীয় দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে একমাত্র ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক আল-সইদই তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।
আরব কর্মকর্তারা বলেন, ওমানের যুক্তি—হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করাসহ ইরানের কোনো পদক্ষেপেরই সরাসরি নিন্দা না করার মূল উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটানো।
ওমানের তথ্যমন্ত্রী আল-হারাসির বলেন, 'একটি অশান্ত অঞ্চলে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় হলো আলোচনার পথ খোলা রাখা এবং উত্তেজনাকে সংঘাতে রূপ নিতে না দেওয়া।'
একজন কর্মকর্তা বলেন, হরমুজে ইরানের টোল আদায়ের দাবিরও সরাসরি বিরোধিতা করছে না ওমান। কারণ মাসকটের ধারণা, ইরান মূলত মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আটকে থাকা তাদের শত শত কোটি ডলারের তহবিল উদ্ধার করতেই একে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
