২০১১ সালের শক্তিশালী ভূমিকম্পে পূর্ব দিকে সরে গিয়েছিল গোটা জাপান
২০১১ সালে জাপানে আঘাত হানা ৯ মাত্রার প্রলয়ংকরী 'তোহোকু-ওকি' ভূমিকম্পের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, এর ফলে সমগ্র দেশটি একযোগে পূর্ব দিকে সরে গিয়েছিল। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু কিছু এলাকা প্রায় ৫ থেকে ৬ মিলিমিটার সরে গিয়েছিল।
সাধারণত এই ধরনের অতি-ভূমিকম্পের পর বড় ধরনের আফটারশক ঘটে থাকে, যা ভূত্বকের ওপর বাড়তি কম্পন সৃষ্টি করে। তবে এই আফটারশকগুলো ঠিক কীভাবে উৎপন্ন হয়, তা বিজ্ঞানীদের কাছে এতদিন পুরোপুরি পরিষ্কার ছিল না।
বিজ্ঞান সাময়িকী 'সায়েন্স'-এ প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ৯ মাত্রার 'তোহোকু-ওকি' ভূমিকম্প এবং এর ভূকম্পন পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহের তথ্য পুনর্মূল্যায়ন করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ওই বিধ্বংসী ভূমিকম্পের ফলে ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের ফাটল রেখা (ফল্ট লাইন) বরাবর পাথরের বিশাল বিশাল ব্লক একে অপরের ওপর দ্রুত পিছলে যায়।
একই সঙ্গে এই আলোড়ন পৃথিবীর অভ্যন্তরে কম্পন তরঙ্গের (সিসমিক ওয়েভ) সৃষ্টি করে। এই তরঙ্গটি পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল বা কোর-এ আঘাত করে প্রতিফলিত হয়ে পুনরায় ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে এবং ওই অঞ্চলের টেকটোনিক প্লেটের সীমানাগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করে তোলে।
এগুলো ছিল মূলত এক ধরনের 'শিয়ার ওয়েভ' বা অনুপ্রস্থ তরঙ্গ, যা পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তর দিয়ে যাতায়াত করার সময় শিলাকণাগুলোকে পাশাপাশি বা ডানে-বামে কাঁপিয়ে দেয়।
গবেষকেরা তাদের গবেষণাপত্রে লিখেছেন, 'আমরা ২০১১ সালের ৯ মাত্রার তোহোকু-ওকি ভূমিকম্পের পর জাপানের ভূকম্পন গতির এক অসাধারণ পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেছি। এটি মূলত একটি শিয়ার ওয়েভের কারণে ট্রিগার হওয়া বহুমুখী প্লেট-ইন্টারফেস স্লিপের ফল, যা পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল (কোর) পর্যন্ত ভ্রমণ করে আবার ফিরে এসেছিল।'
স্যাটেলাইট তথ্য পুনরায় খতিয়ে দেখে বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, পৃথিবীর কেন্দ্র ছুঁয়ে ফিরে আসা এই তরঙ্গের ধাক্কায় সমগ্র জাপান ৫ থেকে ৬ মিলিমিটার পর্যন্ত পূর্ব দিকে সরে গিয়েছিল।
ভূমিকম্পের পর ৫-৬ মিলিমিটারের এই সরণ খুব বেশি মনে না হলেও এবং বড় ভূমিকম্পের পর এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা হলেও, গবেষকদের অবাক করেছে যে বিশাল এলাকাজুড়ে এই সরণ ঘটেছিল।
গবেষকদের ভাষ্য, এই স্থানচ্যুতি এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত যেকোনো একক ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বড় এলাকাজুড়ে ঘটেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এই স্থানচ্যুতির বিস্তৃতি ছিল প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার, যা জাপানের মূল ভূখণ্ডের দৈর্ঘ্যের কাছাকাছি। এটি ২০১১ সালের মূল ভূমিকম্পে সৃষ্টি হওয়া ফাটল এলাকার দৈর্ঘ্যের তুলনায় ৬ থেকে ৭ গুণ বেশি এবং ২০০৪ সালের সুমাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পের তুলনায়ও দ্বিগুণের বেশি বিস্তৃত।
যেহেতু এই সামগ্রিক ভূকম্পন গতি কয়েক মিনিট ধরে ধীরে ধীরে ঘটেছিল, তাই সাধারণ মানুষ হয়তো তাদের পায়ের নিচে মাটির এই সরণ টের পাননি। তবে এই নতুন ধরনের ভূকম্পন ঝুঁকি নিয়ে আরও বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণার মূল লেখক সানইয়ং পার্ক 'সায়েন্টিফিক আমেরিকান'-কে বলেন, 'আমি মনে করি আমাদের এই বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত যে, কোনো [ভূমিকম্পের] মূল কম্পন শেষ হওয়ার বহু মিনিট পরেও এই ধরনের সম্ভাব্য বড় ঘটনা ট্রিগার হতে পারে।'
