চুক্তি পছন্দ না হলে এবং ইরান ভালো ব্যবহার না করলে আবারও বোমা হামলা চালাব: ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার বলেছেন ইরানের সাথে চলতি সপ্তাহে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি চূড়ান্ত নয় এবং এটি তার পছন্দ না হলে তিনি আবারও বোমাবর্ষণ শুরু করতে পারেন।
ফ্রান্সে আয়োজিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, 'এটি একটি সমঝোতা স্মারক। আর যদি এটি আমার পছন্দ না হয়, তবে আমরা আবারও তাদের ওপর গুলি চালানো এবং তাদের মাথায় বোমা ফেলা শুরু করব।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'যদি এটি আমার পছন্দ না হয়, তারা যদি ঠিকমতো আচরণ না করে, তবে আমরা সরাসরি তাদের মাথার ঠিক মাঝখানে আবারও বোমা ফেলা শুরু করব, ঠিক আছে?'
এদিকে জি-৭ দেশগুলোর নেতারা বুধবার লেবাননে যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে তারা জ্বালানি সরবরাহের পথ বহুমুখীকরণ করবেন। একই সাথে যুদ্ধ বন্ধে হওয়া এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিকে তারা স্বাগত জানিয়েছেন।
জেনেভা লেকের তীরে ফ্রান্সের শহর এভিয়ান-লে-বেইনস-এ এই শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা সুইজারল্যান্ড সীমান্ত থেকে মাত্র এক ঘণ্টার পথ। সেখানে শুক্রবার একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই চুক্তিটি মূলত যুদ্ধ অবসানের একটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক।
চুক্তিকে জি-৭ নেতাদের সমর্থন
জি-৭ এর নেতারা এক বিবৃতিতে বলেন, 'অঞ্চল এবং এর বাইরে ইরানের সৃষ্ট হুমকি মোকাবিলা করতে এবং তারা যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে তা নিশ্চিত করার জন্য আমরা আলোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।'
এই সম্মেলন ট্রাম্পকে তার মিত্র দেশ ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং জাপানের কাছে ইরানের সাথে হওয়া চুক্তির বিষয়টি তুলে ধরার একটি সুযোগ করে দিয়েছে। এই দেশগুলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অন্যান্য বিষয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগের অংশীদার হলেও তারা ট্রাম্পের যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে কখনোই সমর্থন করেননি। তারা বরং চিন্তিত, একটি পরাশক্তির আক্রমণ প্রতিহত করে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে তেহরান এখন দরকষাকষিতে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে গেছে।
নেতারা জানিয়েছেন, তারা এই চুক্তি বাস্তবায়নে অবদান রাখতে প্রস্তুত। হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হলে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নেতৃত্বাধীন একটি জোট সেখানে নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারকটি—যা এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি—গত এপ্রিলে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়িয়েছে, যাতে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চালানো যায়।
তবে যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তার খুব সামান্যই তিনি অর্জন করতে পেরেছেন বলে মনে হচ্ছে। ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকার এখনো বহাল রয়েছে, উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ তারা হস্তান্তর করেনি, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা যায়নি এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর মতো ইসরায়েল-বিরোধী মিলিশিয়াদের প্রতি তারা সমর্থন বন্ধ করেনি।
ট্রাম্প বলছেন, চুক্তিতে উল্লেখ আছে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না—যা মূলত ১৯৭০-এর দশক থেকেই ইরানের আনুষ্ঠানিক অবস্থান। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, পরবর্তী আলোচনাগুলোর মাধ্যমে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সরিয়ে নেওয়া বা ধ্বংস করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।
তবে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন সব শর্তে যুদ্ধ শেষ করা ট্রাম্পকে তার নিজের রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থীদের সমালোচনার মুখে ফেলতে পারে।
লেবাননে কি যুদ্ধ থামবে?
যুদ্ধবিরতি নিয়ে সবচাইতে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো লেবাননের ভাগ্য। গত মার্চ মাসে ইসরায়েল দেশটিতে আক্রমণ চালিয়েছিল ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে নির্মূল করতে। কারণ ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে হিজবুল্লাহ সীমান্ত দিয়ে রকেট হামলা চালিয়েছিল।
ইসরায়েলি বাহিনী এখনো দক্ষিণ লেবাননের একটি বিশাল অংশ দখল করে রেখেছে, যেখান থেকে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ এখনো অপরাজিত রয়ে গেছে।
ইরান বলছে, যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী লেবাননেও শত্রুতা বন্ধ করতে হবে এবং একটি স্থায়ী চুক্তির জন্য অবশ্যই ইসরায়েলি বাহিনীকে প্রত্যাহার করতে হবে। তবে ইসরায়েল—যাদেরকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই শান্তি আলোচনা থেকে দূরে রাখা হয়েছে—জানিয়েছে তারা সেনা প্রত্যাহার করবে না এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার রাখে।
এই পরিস্থিতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ফাটল তৈরি করেছে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে তার যুদ্ধকালীন মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন।
জি-৭ নেতারা তাদের বিবৃতিতে লেবাননে একটি 'তৎক্ষণাৎ জোরালো যুদ্ধবিরতি' এবং হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে যাওয়ার সম্ভাবনায় বুধবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও কমেছে। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম প্রতি ব্যারেল ৮০ ডলারের নিচে নেমে গেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সংঘাত শুরুর পর সর্বনিম্ন পর্যায়।
