বিশ্ববাজারে কমলেও যে কারণে শীঘ্রই দেশে তেলের দাম কমার সম্ভাবনা নেই
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের ইতিবাচক ইঙ্গিতের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে দেশের বাজারে তেলের দাম কমার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ এখনই সেই সুফল পাবেন—এমন সম্ভাবনা কম। কারণ, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বাজার অস্থিরতায় সৃষ্ট ভর্তুকির বড় চাপ কাটিয়ে ওঠাকেই বর্তমানে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরায়েল সংঘাত বাড়ার ঠিক আগে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বেঞ্চমার্ক 'ব্রেন্ট ক্রুড'-এর দাম ছিল প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭২.৪৮ ডলার। সংঘাতের চূড়ান্ত পর্যায়ে গত ১৮ মে এর দাম বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১১২ ডলারে পৌঁছায়, যা যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির তুলনায় ৫৪.৫ শতাংশ বেশি।
এরপর থেকে তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার অগ্রগতির খবরের মধ্যে গতকাল (১৫ জুন) এক অধিবেশনেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪.৭৪ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৮৩.১৯ ডলারে নেমে এসেছে।
মে মাসের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় এখন বাজার দর ২৫.৭ শতাংশ কমলেও তা এখনও যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির চেয়ে ১৪.৮ শতাংশ বেশি।
বিশ্ববাজারে তেলের দামে এমন সংশোধন এলেও দেশের জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, নিকট ভবিষ্যতে দেশের বাজারে দাম কমানোর সম্ভাবনা খুবই কম।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন উইং) মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, 'আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমছে ঠিকই, কিন্তু তা এখনও যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির তুলনায় অনেক বেশি। ডিজেল বিক্রিতে এখনও আমাদের প্রতি লিটারে প্রায় ৫০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'আমরা বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। তেলের দাম সমন্বয়ের ব্যাপারে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করবে, কারণ ইরান ইস্যু নিয়ে আলোচনা এখনও চলছে।'
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যার একটি বড় অংশ ব্যয় হবে ডিজেলের বিক্রয়মূল্য কেনা দামের চেয়ে কম রাখার পেছনে। তবে পেট্রোল, অকটেন এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকায় এসব ক্ষেত্রে ভর্তুকির প্রয়োজন হচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্যের তেলের দামে আরও বড় পতন
এশীয় দেশগুলোতে জ্বালানির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত মধ্যপ্রাচ্যের তেলের দরে আরও বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে উৎপাদিত 'মারবান ক্রুড'-এর দাম গত ১৮ মে ব্যারেল প্রতি ১১০.০৪ ডলার থাকলেও গতকাল তা ৭৯.৩১ ডলারে নেমে এসেছে, যা প্রায় ২৯.৭ শতাংশ হ্রাস।
একই সময়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) কর্তৃক ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের জন্য ব্যবহৃত 'আরব লাইট' ক্রুডের দামও ২৬.৩ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ১১৯.০৯ ডলার থেকে ৮৭.৭৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ববাজারে বাড়ার সময় দেশেও বাড়ানো হয়েছিল তেলের দাম
এর আগে গত ১৮ এপ্রিল বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার প্রেক্ষিতে দেশেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সেই সময় ইরান ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৯১.৮৭ ডলারে উঠে গিয়েছিল।
তখন ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ৩১ মে দ্বিতীয় দফায় সমন্বয়ের মাধ্যমে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা বাড়িয়ে যথাক্রমে ১৪৫, ১৪০ ও ১৩৫ টাকা করা হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম. তামিম বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেই দেশে পরিবহন খরচ বা নিত্যপণ্যের দাম কমে যাবে—এমনটা সবসময় ঘটে না।
তিনি বলেন, 'নিম্নমুখী চক্রের সময় দাম কমানোর সুফল সাধারণ ভোক্তার কাছে খুব কমই পৌঁছায়, কারণ বাস ভাড়া বা পণ্য পরিবহন খরচ সে অনুযায়ী কমে না। একারণেই তেলের দাম কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের ওপর চাপও তুলনামূলক কম থাকে।'
তিনি আরও মত দেন যে, ভবিষ্যতে তেলের দাম কমানোর সুফল সাধারণ মানুষ পাবে কি না তা নিশ্চিত করতে পরিবহন খাতে কঠোর তদারকির প্রয়োজন।
