চুক্তি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তেল ও জ্বালানি বিক্রি করতে পারবে ইরান, উঠে যাবে নিষেধাজ্ঞা
যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে হওয়া নতুন চুক্তির আওতায় ইরানকে অবিলম্বে তেল ও জ্বালানি বিক্রির অনুমতি দেবে আমেরিকা। সংঘাত থামাতে তেহরানের জন্য প্রাথমিক আর্থিক প্রণোদনা হিসেবে এ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। চুক্তির বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
ওই ব্যক্তিরা জানান, চলতি সপ্তাহে চুক্তিটি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এই ধারা কার্যকর হবে। বিক্রয় প্রক্রিয়া সহজ করতে ব্যাংকিং, পরিবহন ও বিমার মতো প্রয়োজনীয় সেবাগুলোও এই ছাড়ের আওতায় থাকবে।
অলাভজনক সংস্থা ইউনাইটেড এগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান জানিয়েছে, অপরিশোধিত তেলবাহী একটি ইরানি সুপারট্যাংকার চাবাহার বন্দর ছেড়েছে। মার্কিন অবরোধ পেরিয়ে মঙ্গলবার ওমান উপসাগর দিয়ে জাহাজটি এগিয়ে চলেছে। ট্যাংকারটির লোকেশন ট্র্যাকার সচল রয়েছে। এপ্রিলে অবরোধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম এমন কোনো ঘটনা ঘটল।
একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা মঙ্গলবার জানান, তেল বিক্রির ক্ষেত্রে ইরান শুরুতেই নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি পেলেও এ সুবিধা ধরে রাখা নির্ভর করবে মার্কিন শর্তগুলো তারা কতটা পূরণ করছে, তার ওপর। মার্কিন দাবিগুলোর মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও পারমাণবিক কর্মসূচির মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো রয়েছে। তবে তেহরান এখনই তাদের আটকে থাকা শত শত কোটি ডলার পাচ্ছে না।
মার্কিন প্রশাসন বলছে, রোববারই আমেরিকা ও ইরান ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে এই চুক্তিতে সই করেছে। আর চলতি সপ্তাহেই চুক্তিটি চূড়ান্ত হবে। এ চুক্তির ফলে যুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি বিরতি আসবে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি থেকে প্রত্যাহার করা হবে মার্কিন ও ইরানি অবরোধ। সেইসঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে বিস্তারিত আলোচনার পথ তৈরি হবে।
অবশ্য বড় কোনো ছাড় পাওয়ার আগেই ইরানকে এই আর্থিক সুবিধা দেওয়া এবং মার্কিন অবরোধের চাপ শিথিল করার তীব্র বিরোধিতা করছেন আমেরিকা ও ইসরায়েলের অনেক আইনপ্রণেতা এবং রাজনৈতিক কর্মকর্তা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ইরান-বিষয়ক সিনিয়র ফেলো ফারজিন নাদিমি বলেন, ইরানকে তেল রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার অর্থ হলো, আমেরিকা তার হাতের একটি বড় হাতিয়ার হাতছাড়া করল। তবে হরমুজ সচল করার জন্য হোয়াইট হাউসকে সম্ভবত এই ছাড় দিতেই হতো।
নাদিমি আরও বলেন, 'হোয়াইট হাউস মনে করছে, ইরানকে দিয়ে শর্ত মানাতে গেলে এই ধরনের কিছু বাড়তি সুবিধার প্রয়োজন। নইলে আলোচনা চালিয়ে যেতে ইরানকে রাজি করানো বেশ কঠিন হতো।'
এই সমঝোতা স্মারকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস ও পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে মার্কিন শর্ত মেনে নিলে সামনে আরও বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা পাবে।
সোমবার এক ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, আমেরিকা ও ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেহরানের আটক প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার আংশিক ছাড় করা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা পুনর্গঠন ও ক্ষয়ক্ষতি সামলানোর জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ তহবিল গঠন নিয়ে আলোচনা করছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, 'তাদের অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করতে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ক্ষেত্রে আমরা চরম উদারতা দেখাতে প্রস্তুত। সোজা কথায়, টেবিলে সব প্রস্তাবই আছে। আবার কাজের কাজ কিছু না হলে কোনো প্রস্তাবই আর টিকবে না।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, ৩০০ বিলিয়ন ডলারের ওই পুনর্গঠন তহবিলে আমেরিকা কোনো টাকা দেবে না।
ট্রাম্পের যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টায় ইরানকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যেভাবে বিমানে করে ইরানে নগদ অর্থ পাঠিয়েছিলেন, তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন ট্রাম্প। নিজের প্রথম মেয়াদে সেই চুক্তি থেকে আমেরিকাকে বের করেও এনেছিলেন তিনি।
ইরানকে আর্থিক স্বস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন বেশি গ্রহণযোগ্য পথ হতে পারে তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়া।
তেল আবিবের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা সিমা শাইন বলেন, এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন ইরানকে এমন এক বাস্তব অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিতে পারছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমাতেও সাহায্য করবে।
শাইন বলেন, চুক্তি অনুসারে আমেরিকা ইতিমধ্যেই ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে শুরু করেছে। আর অবরোধ সরলে ইরান এমনিতেও তাদের চেনা ছকে গোপনে ব্যাপকভাবে তেল বিক্রি আবার শুরু করে দিত।
'বিষয়টিকে আইনি রূপ দিয়ে সেখান থেকে সুফল নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ,' বলেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত কিছু পেমেন্টের জন্য তেহরানকে তাদের আটকে থাকা অর্থের একাংশ ব্যবহারের অনুমতি দিতেও রাজি হয়েছে আমেরিকা।
একটি সূত্র জানিয়েছে, সম্পদ ছাড়ের ব্যাপারে ওয়াশিংটন কিছুটা নমনীয়তা দেখাচ্ছে। পারমাণবিক বা অন্যান্য বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার আগেই ইরানকে এই অর্থ ছাড় করা হতে পারে।
ইরান বলেছে, প্রাথমিক চুক্তি সইয়ের পর যে ৬০ দিনের আলোচনা শুরু হবে, তার শুরুতেই তাদের ১২ বিলিয়ন ডলার চায় তারা। আর আলোচনা চলাকালীন চায় আরও ২৪ বিলিয়ন ডলার।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় আটকে রয়েছে। এর বড় অংশই অতীতের তেল বিক্রির আয় ও রিজার্ভ। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের তুলনায় এই অর্থ ফেরত পাওয়া কম লাভজনক মনে হলেও এর একটা দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা আছে। একবার এই সম্পদ ইরানের কাছে হস্তান্তর হয়ে গেলে তা আর কেড়ে নেওয়া যাবে না। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা আবার যেকোনো সময় চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব। ফলে এই এ অর্থ ফেরত পাওয়ার সুবিধাটি অনেক বেশি টেকসই।
এই বিপুল অর্থ বিদেশে আটকে রয়েছে; সিংহভাগই আছে চীনে। বছরের পর বছর ধরে তেল বিক্রির আয় থেকে আসা বিপুল মুনাফা নিষেধাজ্ঞার কারণে তেহরানের ব্যাংকিং সিস্টেমে পাঠানো যাচ্ছে না।
এর বাইরে ২০২৩ সালে বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় বাইডেন প্রশাসন ইরানের যে ৬ বিলিয়ন ডলার কাতারে স্থানান্তরের অনুমতি দিয়েছিল, তা-ও ঝুলে আছে। ওমানে আটকে আছে আরও ১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইরান-সমর্থিত হামাসের ইসরায়েল হামলার পর অনানুষ্ঠানিকভাবে এই দুটি তহবিলই অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
এছাড়া বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রির লভ্যাংশ হিসেবে ইরাকের বিভিন্ন ব্যাংকেও ইরানের আরও প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে।
