হামলা থেকে নিজেদের গ্যাসক্ষেত্র বাঁচাতে ইরানের সঙ্গে গোপন আলোচনা চালিয়েছিল কাতার
মার্চের মাঝামাঝি সময়ে কাতারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। এই হামলায় গ্যাসক্ষেত্রটির বেশ কিছু অংশ ধ্বংস হয়ে যায়।
এই হামলার ফলে চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে করা কয়েক শ কোটি ডলারের চুক্তি ঝুঁকিতে পড়ে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী কাতার সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কাতারের গ্যাস কমপ্লেক্স 'রাস লাফান'-কে ইরানের সম্ভাব্য হামলার তালিকা থেকে বাদ রাখতে গোপনে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছিল দোহা। কিন্তু এই হামলার পর সেই প্রচেষ্টা কার্যত ভেস্তে যায়।
উল্লেখ্য, রাস লাফান গ্যাসক্ষেত্র থেকে বিশ্বের মোট গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা হয়।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতে কাতার তেহরানকে একটি প্রস্তাব দেয়। এর আওতায় ইরান রাস লাফানে হামলা চালাবে না এবং বিনিময়ে কাতার একতরফাভাবে গ্যাস উৎপাদন বন্ধ রাখবে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যেত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার চাপ সৃষ্টি হতো।
একজন ঊর্ধ্বতন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, কাতার মূলত একটি 'গোপন চুক্তি' প্রস্তাব করেছিল। এর একমাত্র শর্ত ছিল— 'আপনারা আমাদের ওপর হামলা চালাবেন না।'
আরেক কর্মকর্তা বলেন, কাতারের বার্তা ছিল, 'আমাদের লক্ষ্যবস্তু না করেও আপনারা নিজেদের উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারবেন।'
তবে কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের কাছ থেকে কাতার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি পায়নি।
যুদ্ধের তৃতীয় দিনে কাতার রাস লাফান স্থাপনায় কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তখন ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছিল।
সে সময় কাতার জানায়, সামরিক হামলার কারণে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে পরে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট ছবিতে রাস লাফানে দৃশ্যমান কোনো ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি সে সময় সতর্ক করে বলেছিলেন, এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দিতে পারে। তার বক্তব্যের ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
তবে কাতার গোপন কোনো সমঝোতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, রাস লাফানে উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত শুধু নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং কর্মী ও অবকাঠামো রক্ষার স্বার্থে নেওয়া হয়েছিল।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে বা ইরানের স্বার্থে জ্বালানি উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে— এমন দাবি 'সম্পূর্ণ মিথ্যা'।
কাতারের মতে, এ ধরনের অভিযোগ চলমান শান্তি প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা, দেশের সুনাম নষ্ট করা এবং কাতার-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সম্পর্ক দুর্বল করার চেষ্টা।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের যুদ্ধের ক্ষতি থেকে বাঁচাতে নানাভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে। তবে কাতারের উদ্যোগটি তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্ট ছিল।
কাতার একদিকে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। দেশটিতে অবস্থিত আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি।
রাস লাফান বিশ্বের অন্যতম বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ক্ষেত্র। কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি এটি পরিচালনা করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রান্না, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ নানা কাজে এখানকার গ্যাস ব্যবহৃত হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানি নেতাদের যোগাযোগ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কাতারের এই তৎপরতার তথ্য পেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) এবং ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে অবগত ছিলেন।
তবে এতে ওয়াশিংটন ও দোহার সম্পর্কের কোনো অবনতি ঘটেছে বলে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
কাতারের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, দোহা ইরানকে সাধারণভাবে হামলা না চালানোর আহ্বান জানিয়েছিল। তবে রাস লাফানের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাওয়া বা জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করার প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ তিনি নাকচ করেন।
তার ভাষ্যমতে, এমন পদক্ষেপ ভবিষ্যতে বিপজ্জনক নজির তৈরি করত এবং এতে ধারণা জন্মাত, 'ইরান যখনই ক্ষুব্ধ হবে, তখনই আমাদের উৎপাদন বন্ধ করতে হবে।'
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার ও ইরান যৌথভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্স-নর্থ ডোম ব্যবহার করে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান দীর্ঘদিন নিজেদের অংশ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। এতে কাতার তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেয়েছে বলে কিছু পশ্চিমা ও আঞ্চলিক কর্মকর্তা মনে করেন।
তবে কাতারি কর্মকর্তা দাবি করেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার টিকে থাকায় কাতার কোনো বিশেষ সুবিধা দেখে না। তিনি বলেন, 'আমাদের জন্য ইরান সব সময়ই একটি হুমকি ছিল। এই যুদ্ধ একটি দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতি।'
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুদ্ধের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নিহত হওয়ার পর ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
সে সময় কাতারের কর্মকর্তারা রাস লাফান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেন। জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তখনও স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি বলেন, স্থাপনাটি বড় ধরনের হামলার মুখে পড়লেও অলৌকিকভাবে ক্ষতি খুবই সীমিত ছিল।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট ছবিতে ওই সময় রাস লাফান বা কাতারের অন্য ঘোষিত লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কোনো স্পষ্ট প্রমাণ দেখা যায়নি।
এক কাতারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাস লাফান এলাকায় একটি কংক্রিটের স্ল্যাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এটি একটি ড্রোন হামলায় হয়েছিল, তবে ব্যবহৃত বিস্ফোরক এতটাই ছোট ছিল যে স্যাটেলাইট ছবিতে আঘাত বা ক্ষতি স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।
দ্য পোস্টকে দেওয়া এক বিবৃতিতে কাতারের মিডিয়া অফিস বলেছে, রাস লাফান এলএনজি স্থাপনায় ক্ষতি 'বাড়িয়ে দেখানো বা বানানো হয়েছে'—এমন দাবি 'ভিত্তিহীন'। তারা জানায়, কাতার সেনাবাহিনীর হুমকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্থাপনাটি বন্ধ করা হয়েছিল। সেখানে মানবজীবনের জন্য বিশ্বাসযোগ্য ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছিল।
এর প্রায় দুই সপ্তাহ পর, ১৮ মার্চ ইরান পাল্টা হামলা চালায়। এর আগে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের গ্যাস অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সমালোচনা করেন।
কাতারি কর্মকর্তারা পরে আরও বিস্তারিত তথ্য দেন। জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি জানান, হামলায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এটি কাতারের এলএনজি রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
তিনি বলেন, 'ক্ষতি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। এতে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও বেলজিয়ামে সরবরাহ দীর্ঘদিন ব্যাহত হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'এই হামলা শুধু কাতারের ওপর নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপরও আঘাত।'
