একটি প্যাট্রিয়ট মিসাইল তৈরি করতেই কেন দুই বছরের বেশি সময় লেগে যায়?
অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ছুড়তে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু এটি তৈরি করতে পেরিয়ে যায় দুই বছরেরও বেশি সময়। আর একেকটি মিসাইলের পেছনে খরচ হয় প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার।
এই বিপুল খরচের অবহর সত্ত্বেও আমেরিকা ও তাদের মিত্ররা আরও প্যাট্রিয়ট মিসাইল চাইছে।
পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এ বছর অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের সঙ্গে চুক্তি করেছেন, প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের সর্বাধুনিক মডেল পিএসি-৩ এমএসই -র উৎপাদন তিনগুণেরও বেশি বাড়ানোর জন্য। বছরে প্রায় ২ হাজার মিসাইল উৎপাদন করতে চান তারা। তবে লকহিড বলছে, ২০৩০ সাল শেষ হওয়ার আগে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।
এই দীর্ঘ অপেক্ষার ফল হতে পারে মারাত্মক। বিকল্প কোনো উপায় না থাকলে হুমকির মুখে থাকা অনেক অঞ্চলকে রক্ষা করার আগেই হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে। গত দু-বছর ধরে বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নানা তৎপরতা এবং ইউক্রেনে টানা চার বছরের লড়াইয়ের কারণে প্যাট্রিয়টের মজুতে এমনিতেই কমেছে। এর ওপর ইরান যুদ্ধ সেই মজুতের ওপর আরও চাপ ফেলছে। আমেরিকার মিত্র দেশগুলোর পক্ষ থেকেও ইন্টারসেপ্টর কেনার অর্ডার এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষণ বলছে, প্যাট্রিয়ট মিসাইলের মজুতকে ইরান-যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে অন্তত তিন বছর সময় লাগবে। শুধু সময় নয়, এর জন্য প্রয়োজন হবে বিপুল অর্থ—যার পরিমাণ মার্কিন কংগ্রেসের বরাদ্দকৃত যুদ্ধাস্ত্র বাজেটের চেয়েও অনেক বেশি।
লক্ষ্য অর্জনের জন্য লকহিডকে এখন পদে পদে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। একদিকে যন্ত্রাংশের তীব্র সংকট, অন্যদিকে স্থানীয় শ্রমবাজারে কর্মীর অভাব। কোম্পানিটির এক মুখপাত্র বলেন, 'প্রয়োজনীয় পারফরম্যান্স ও নিরাপত্তা কঠোর মানদণ্ড ধরে রেখে যেখানে যেখানে সম্ভব, উৎপাদন প্রক্রিয়ার বাধা দূর করতে ও সময় কমিয়ে আনতে আমরা সরকার ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে মিলে কাজ করছি।'
পিএসি-৩-এর মতো অত্যাধুনিক মিসাইল সিস্টেম তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লাগে। উৎপাদনের হার হুট করে বাড়ানোর চেষ্টা করলে পুরো প্রক্রিয়ায় উল্টো আরও বেশি সময় লেগে যায়।
বিনিয়োগ
সরবরাহকারীদের কারখানা সম্প্রসারণের জন্য সময় দরকার। যেমন, বোয়িংয়ের একটি মিসাইল-যন্ত্রাংশ কারখানা সম্প্রসারণ ও সরঞ্জাম বসাতেই সময় লেগেছে দুই বছরেরও বেশি। লকহিডের সংযোজন কারখানার কাছে এলথ্রিহ্যারিস-এর একটি রকেট-মোটর কারখানার সম্প্রসারণের কাজ চলছে, যা আগামী এক বছরের আগে চালুই হবে না।
কর্মী নিয়োগ
অর্ডারের পাহাড় জমার অর্থ হলো—আরও বেশি কর্মী নিয়োগ। লকহিডের তথ্যমতে, কারখানার অত্যন্ত স্পর্শকাতর কাজের জন্য কর্মী বাছাই ও তাদের প্রশিক্ষণ দিতেই প্রায় ছয় মাস সময় লেগে যায়। তাছাড়া কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র লাগে, এমন পদের জন্য প্রার্থীদের নিখুঁতভাবে যাচাইবাছাই করার বিষয়টি তো আছেই।
কাগজপত্রের কাজ
পেন্টাগনের চুক্তি হাতে পাওয়া মানেই লকহিডের কাছে রেস শুরুর বাঁশি। সাথে সাথেই বোয়িং, এলথ্রিহ্যারিসের মতো যন্ত্রাংশ নির্মাতাদের কাছ থেকে প্রস্তাব জোগাড়ের কাজ শুরু হয়ে যায়। এরপর ওই কোম্পানিগুলোকে ছুটতে হয় নিজেদের সরবরাহকারীদের কাছে—দাম আর উৎপাদনের সম্ভাব্য হিসাব মেলাতে।
উৎপাদন ও কাঁচামাল
প্রতিটি সরবরাহকারী তাদের নির্দিষ্ট যন্ত্রাংশ তৈরির কাজে হাত দেয়। তবে যাদের গুদামে পর্যাপ্ত কাঁচামাল মজুত নেই, উৎপাদন শুরুর আগে তাদের দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হয় মালপত্র এসে পৌঁছানোর জন্য।
যন্ত্রাংশ
চূড়ান্ত সংযোজনের আগে, বড় সাব-কন্ট্রাক্টররা প্যাট্রিয়ট মিসাইলের বিভিন্ন অংশ তৈরি করে। মিসাইলের একেবারে সামনের অংশে থাকা সিকার-এর জন্য গিম্বাল, সার্কিট বোর্ড ও তারের সংযুক্তিগুলো জোড়া লাগায় বোয়িং। মিসাইল উৎক্ষেপণের জন্য যে রকেট মোটর প্রয়োজন, তার বিস্ফোরক প্রপেলান্ট, নজল ও কেসিং জোগাড় করে এলথ্রিহ্যারিস।
সংযোজন
মূল উপকরণগুলো আরকানসাসের ক্যামডেনে লকহিড মার্টিনের কারখানায় পৌঁছালেই কর্মীরা পুরো মিসাইল সংযোজনের লাগানোর কাজে নেমে পড়েন। সব যন্ত্রাংশ ঠিকঠাক হাতে থাকলে এই সংযোজন প্রক্রিয়ায় সময় লাগে সর্বনিম্ন ছয় সপ্তাহ। কাজ চলাকালীনই পরিদর্শকরা মিসাইলগুলোর মান ও ত্রুটি যাচাই করতে পারেন।
সরবরাহ
চূড়ান্ত পরীক্ষার পর বিশ্বের নানা প্রান্তে এয়ার-ডিফেন্স ব্যাটারিগুলোতে এসব মিসাইল পাঠাতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। উৎপাদিত মিসাইলের প্রায় অর্ধেক যায় বিদেশি ক্রেতাদের হাতে। আর বাকিটা নেয় মার্কিন সেনাবাহিনী।
লকহিডের হিসাব অনুযায়ী, তাদের এই মিসাইলের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করার পেছনে কাজ করে ৪০০-রও বেশি প্রতিষ্ঠান। প্রতিরক্ষা সফটওয়্যার কোম্পানি গভিনি-র তথ্যানুসারে, এর মধ্যে দ্বিতীয় স্তরের—অর্থাৎ প্যাক-৩-এর সরবরাহকারীদের সরবরাহকারী—৮০ শতাংশেরও বেশি প্রতিষ্ঠান একাধিক মিসাইল প্রোগ্রামের জন্য যন্ত্রাংশ বানায়। এ কারণে চাহিদা থাকা অন্য কোনো অস্ত্রের সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত না ঘটিয়ে নির্দিষ্ট এক ধরনের মিসাইলের উৎপাদন বাড়ানো ভীষণ কঠিন।
ইন্টারসেপ্টরের ভেতরের কিছু সার্কিট্রি বা বৈদ্যুতিক বর্তনী বাণিজ্যিকভাবে এখন সেকেলে বলে ধরা হয়। ফলে আমেরিকাকে বাধ্য হয়ে বিদেশি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে চড়া দামে সরঞ্জাম কিনতে হচ্ছে। মিসাইলের নাকের ডগায় থাকা 'সিকার'—যা ধেয়ে আসা মিসাইল বা বিমানকে নির্ভুল নিশানায় লক করতে সাহায্য করে—আসে বোয়িংয়ের একটিমাত্র কারখানা থেকে।
বোয়িংয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, সার্কিট কার্ডের মতো যন্ত্রাংশের জন্য নতুন সরবরাহকারী খুঁজে বের করে ও রোবোটিক যন্ত্রপাতি যোগ করে তারা ইতিমধ্যেই সিকারের উৎপাদন বাড়িয়েছেন।
অন্যদিকে এলথ্রিহ্যারিসের একজন মুখপাত্র বলেন, সরবরাহ চেইনে আরও বেশি প্রস্তুতকারকে যুক্ত করে রকেট-মোটর উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে তাদের প্রতিষ্ঠান।
সম্প্রতি এলথ্রিহ্যারিসের প্রধান নির্বাহী ক্রিস কুবাসিক এক বিনিয়োগকারী সম্মেলনে বলেন, 'পুরো ইকোসিস্টেমকেই এক সুতোয় গাঁথতে হবে। আমরা যদি মিসাইলের উৎপাদন চারগুণ বাড়াই, তবে এর কেসিংয়ের উৎপাদনও চারগুণ বাড়াতে হবে। ইগনিটার, ভালভ, থ্রটল—সবকিছুর উৎপাদনই চারগুণ করতে হবে। এটা আমাদের জন্য বিশাল সুযোগ।'
