‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’: যুদ্ধ অবসানের আলোচনায় ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত যে কারণে এত গুরুত্বপূর্ণ
ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আলোচনার অন্যতম প্রধান জটিল বিষয় হলো ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত। বিশেষ করে প্রায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মানের কাছাকাছি সমৃদ্ধ ৯৭০ পাউন্ড ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মজুতকে 'নিউক্লিয়ার ডাস্ট' (পারমাণবিক ধূলিকণা) হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানকে এটি অবশ্যই হস্তান্তর করতে হবে। অন্যদিকে ইরানি কর্মকর্তারা বারবার দাবি করে আসছেন, সামরিক উদ্দেশ্য ছাড়া কেবল শান্তিপূর্ণ বা বেসামরিক কাজের জন্য পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে।
কিন্তু ইরানের এই মজুতে আসলে কী রয়েছে? আর এটি দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয়?
পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি থাকলে ইরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক দিনের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধতায় উন্নীত করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের হিসাব অনুযায়ী, এই মজুত দিয়ে প্রায় ১০টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মতো উপাদান রয়েছে।
বিভিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। ট্রাম্প শনিবার জানিয়েছেন, চুক্তিটি রোববার সই হওয়ার কথা। তবে দক্ষিণ বৈরুতে হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে ইসরায়েলের হামলায় ক্ষুব্ধ ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
তবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নটি অমীমাংসিতই থেকে যাবে এবং পরবর্তী আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে বলে জানিয়েছে সিএনএন।
আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিশুদ্ধ করা ইরানের প্রায় ১,০০০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম।
অলাভজনক সংস্থা নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ-এর (এনটিআই) পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ এরিক ব্রুয়ার বলেন, 'এই উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণের শর্ত ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কোনো চুক্তিতে আসা উচিত হবে না।' ব্রুয়ার ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে কর্মরত ছিলেন এবং ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিতে ইরান বিষয়ক গোয়েন্দা বিশ্লেষণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে পারমাণবিক বিস্তাররোধ বিষয়ক দায়িত্ব পালন করা এবং পরে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থায় ইরান-সংক্রান্ত গোয়েন্দা বিশ্লেষণের নেতৃত্ব দেওয়া ব্রুয়ারের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেজস্ক্রিয় ভারী মৌল প্রয়োজন, যাকে বিশেষজ্ঞরা 'ফিসাইল ম্যাটেরিয়াল' বা বিভাজ্য উপাদান বলেন।
এ ধরনের একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ হলো ইউরেনিয়াম-২৩৫। এটি প্রকৃতিতে পাওয়া গেলেও খনি থেকে উত্তোলিত অপরিশোধিত ইউরেনিয়াম আকরিকের এক শতাংশেরও কম অংশজুড়ে থাকে।
সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর ঘনত্ব বাড়ানো হয়, যাতে তা অস্ত্রে ব্যবহারের উপযোগী বিভাজ্য উপাদানে রূপান্তরের জন্য প্রস্তুত হয়।
ইরান ইউরেনিয়ামকে প্রথমে ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড গ্যাসে রূপান্তর করে। এরপর দেশটির নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইসফাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সের ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্রের মাধ্যমে তা সমৃদ্ধ করা হয়।
ধারণা করা হয়, ইরানের প্রায় আধা টন ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং আনুমানিক ৪০৫ দশমিক ৯ পাউন্ড ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম-২৩৫ এখনো গ্যাস আকারেই রয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) সর্বশেষ যখন এটি যাচাই করেছিল, তখন এটি ওই অবস্থাতেই ছিল। তবে পরের মাসে তাদের স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর ইরান আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরিদর্শকদের পথ বন্ধ করে দেয়।
ব্রুয়ার জানান, ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতাকে পারমাণবিক অস্ত্রের মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। ইরান যদি তাদের সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো সচল রাখে, তবে বর্তমানের ৬০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় পৌঁছাতে তাদের মাত্র কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় পেন্টাগনের চালানো 'অপারেশন মিডনাইট হ্যামার'-এর পর মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করছেন, ইসফাহানে ইরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস হয়নি বরং ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।
তবে সে সময় ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছিল, তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি 'পুরোপুরি ধ্বংস' করে দিয়েছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে তিনি শক্তি প্রয়োগ করে এই ইউরেনিয়াম উদ্ধার করবেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের সামরিক অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি পরিচালনা করতে হাজার হাজার সৈন্যের প্রয়োজন হতে পারে এবং বড় ধরণের প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে এই তেজস্ক্রিয় উপাদান খুঁজে বের করা এবং পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া হবে একটি কঠিন কাজ।
বিশেষজ্ঞ এরিক ব্রুয়ার বলেন, 'হামলার আগে ইরান এই মজুত কোথায় সরিয়ে ফেলেছে বা ছড়িয়ে দিয়েছে, তা আমাদের জানা নেই।'
গত রোববার মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথও এ বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, ইরানকে অবশ্যই এই মজুত ধ্বংস বা সরিয়ে ফেলতে হবে এবং এই বিশুদ্ধতা কমানোর (ডাউনব্লেন্ডিং) প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুক্ত থাকবে।
ইরান এই ইউরেনিয়াম গ্যাসকে কত দ্রুত বোমার উপযোগী ধাতব আকারে রূপান্তর করতে পারবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইরানের বর্তমান দক্ষতা অত্যন্ত উন্নত।
পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কোনো বিশ্বাসযোগ্য বেসামরিক বা শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নেই। তাই মার্কিন আলোচনার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত এই মজুত পুরোপুরি নির্মূল করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত অপসারণ বা কার্যত নিষ্ক্রিয় করার জন্য প্রধানত দুটি উপায় রয়েছে।
রোকার ও ব্রুয়ারের মতে, উভয় পদ্ধতির ক্ষেত্রেই প্রথম ধাপ হিসেবে ইউরেনিয়াম গ্যাসকে তুলনামূলকভাবে 'অন্তর্নিহিতভাবে বেশি স্থিতিশীল' পাউডার আকারে রূপান্তর করা হতে পারে। রোকার বলেন, এতে পরিবহন অনেক বেশি নিরাপদ হয়ে যায়।
যদি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শান্তিপূর্ণভাবে মজুত অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে মার্কিন জ্বালানি বিভাগের অধীন ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের একটি ভ্রাম্যমাণ ইউরেনিয়াম সুবিধা ব্যবহার করা যেতে পারে।
সংস্থাটির নথিপত্র অনুযায়ী, টেনেসির ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে থাকা এই ইউনিট বিশ্বের যেকোনো স্থানে গিয়ে পারমাণবিক উপাদান স্থিতিশীল করা, প্যাকেজিং করা এবং অপসারণ করতে সক্ষম। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
রোকার আরও উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির অধীনে যেমনটি হয়েছিল, তেমনি রাশিয়াও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গ্রহণ করার সক্ষমতা রাখে।
দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো 'ডাউনব্লেন্ডিং', যা ইরানের ভেতরেই করা সম্ভব। এ প্রক্রিয়ায় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সঙ্গে কম বিশুদ্ধতার ইউরেনিয়াম মিশিয়ে ইউ-২৩৫-এর ঘনত্ব কমিয়ে আনা হয়।
তবে পদ্ধতি যাই হোক না কেন, সফলভাবে ইউরেনিয়াম অপসারণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষে পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করতে পারা।
ব্রুয়ার বলেন, ইরান পুরোপুরি সহযোগিতা করলেও যাচাই প্রক্রিয়া সহজ হবে না।
তিনি বলেন, 'এখানে ঝুঁকি হলো, ইরান বলতে পারে— ওই ১০০ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়ামের হিসাব আমরা দিতে পারছি না, কারণ সেটি হামলার সময় ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে সেটি সত্য কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নাও হতে পারে।'
