আর্সেনাল কীভাবে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় ও সমর্থকদের ‘ঘর’ হয়ে উঠল?
দীর্ঘ দুই দশক অপেক্ষার পর অবশেষে প্রিমিয়ার লিগ ট্রফির দেখা পেয়েছে আর্সেনাল। এই জয়ের পর শুধু ইংল্যান্ডেই নয়, পুরো বিশ্বজুড়েই যে বাঁধভাঙা উদযাপনের বন্যা বয়ে গেছে, তা সত্যি অভাবনীয়!
কৃষ্ণাঙ্গ বা 'ব্ল্যাক' খেলোয়াড়দের সাথে আর্সেনালের রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস, যার পরিষ্কার প্রতিচ্ছবি দেখা যায় ক্লাবটির বিশাল ফ্যানবেসের মাঝে। ট্রফি জেতার পর সেলহার্স্ট পার্কে বুকায়ো সাকা এবং এবেরেচি এজে-র মুখের উচ্ছ্বাস কিংবা লন্ডনের রাস্তা থেকে সুদূর উগান্ডার কাম্পালা পর্যন্ত আর্সেনাল সমর্থকদের এই উন্মাদনা—সব যেন একই সুতায় গাঁথা।
উত্তর লন্ডনের একটি সাধারণ ফুটবল ক্লাব কীভাবে পুরো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কৃষ্ণাঙ্গদের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর গভীর সমর্থন অর্জন করল, তার পেছনের গল্পটি বেশ চমৎকার।
উদযাপনের এক জুতসই মঞ্চ
আর্সেনালের এবারের শিরোপা উল্লাসের মঞ্চ হিসেবে ক্রিস্টাল প্যালেসের ঘরের মাঠ 'সেলহার্স্ট পার্ক' অদ্ভুতভাবে জুতসই জায়গা হয়ে উঠেছিল। কারণ, এই মাঠেই তারা এবেরেচি এজে-র মতো প্রতিভাকে দলে ভিড়িয়েছে। আর সেখানে উৎসবের মধ্যমণি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আর্সেনালের সাবেক কিংবদন্তি খেলোয়াড় ও ব্ল্যাক আইকন ইয়ান রাইট!
মজার বিষয় হলো, সেলহার্স্ট পার্ক থেকে মাত্র এক স্টেশন দূরে ব্রকলিতেই ইয়ান রাইট আরেক কিংবদন্তি ডেভিড রোক্যাসলের সঙ্গে বড় হয়েছেন। রোক্যাসল একসময় আর্সেনালের বিখ্যাত ৭ নম্বর জার্সি পরে মাঠ কাঁপিয়েছেন, যা এখন পরছেন আরেক তরুণ কৃষ্ণাঙ্গ তারকা সাকা।
সাকা, মাইলেস লুইস-স্কেলি, নোনি মাদুয়েকে এবং জুরিয়েন টিম্বার—এই তরুণ তুর্কিরা মূলত পশ্চিম আফ্রিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বংশোদ্ভূত। তাদের হাসিমুখের ছবিগুলো যখন আর্সেনাল সমর্থকদের সামনে আসে, তখন তা কেবল এক জয় উদযাপনের ছবি থাকে না, বরং এটি আর্সেনালের বৈচিত্র্যময় আর গৌরবময় ঐতিহ্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
তবে এই উদযাপনের দৃশ্যগুলো মূল গল্পের একটি ছোট অংশমাত্র। আর্সেনালের লিগ জয় নিশ্চিত হওয়ার পর হাজার হাজার মানুষ এমিরেটস স্টেডিয়ামের বাইরে উল্লাসে ফেটে পড়ে। এই উদযাপনের ঢেউ শুধু উত্তর লন্ডনেই আটকে থাকেনি, বরং পুরো বিশ্বেই তা ছড়িয়ে পড়েছে!
আফ্রিকা জুড়ে ঘটে যাওয়া দৃশ্যগুলো যেন রীতিমতো অন্য এক আবেগমাখা গল্প বলছে। কেনিয়ার নাইরোবিতে লাল শার্ট পরা আর্সেনাল ভক্তদের ঢল, ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় আনন্দে নেচে ওঠা মানুষ; এমনকি নাইজেরিয়ায় আর্সেনাল-থিমে বানানো ঐতিহ্যবাহী 'আগবাদা' পোশাক পরে উল্লাস—সবকিছুই প্রমাণ করে আর্সেনাল ওই অঞ্চলের মানুষের জীবনের সাথে কতটা গভীরভাবে মিশে আছে।
এত আবেগ আর ভালোবাসা কি শুধুই শিরোপা জেতার জন্য? মোটেই না। গত ২০ বছরে আর্সেনাল কোনো লিগ শিরোপা না জিতলেও তারা তাদের ব্ল্যাক ফ্যানদের গভীর ও অবিচল সমর্থন হারায়নি। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা স্পাইক লি, অভিনেতা ড্যানিয়েল কালুয়া, ইদ্রিস এলবার মতো তারকারা এর বড় প্রমাণ। আর্সেনাল তার এই বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা শুধু মাঠের খেলায় নয়, নিজেদের নানা কর্মকাণ্ড দিয়েই অর্জন করেছে।
মাঠের বাইরে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রভাব
'ব্ল্যাক আর্সেনাল' বইয়ের লেখক ক্লাইভ চিজিয়োকে নুয়োন্কার মতে, 'ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অন্য সব ক্লাবে ব্ল্যাক খেলোয়াড় হয়তো আছে, কিন্তু সাংস্কৃতিক প্রভাব ও সমর্থকদের উপর গভীর দাগ কাটার দিক থেকে আর্সেনালের ধারেকাছে কেউ আসতে পারবে না।'
১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাজ্যে যখন রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তীব্র বর্ণবাদ চলছিল, তখন পল ডেভিস আর্সেনাল একাডেমির মাধ্যমে যে ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন, তা রোক্যাসল ও মাইকেল থমাসের মতো তারকাদের উত্থানের পথ সুগম করে দেয়। ১৯৮৯ সালে অ্যানফিল্ডে শেষ মুহূর্তে গোল করে আর্সেনাল যখন লিগ জেতে, তখন ব্ল্যাক কমিউনিটির প্রতিটি সেলুনে কেবল তাদের নিয়েই গল্পের ঝড় উঠতো।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আর্সেনালে ইয়ান রাইট যখন যুক্ত হন, তখন টিভিতে তাঁর বিখ্যাত 'জ্যামাইকান বোগল ড্যান্স' উদযাপনে দারুণ জনপ্রিয় হয়। এই নাচ শুধু ফুটবলের গণ্ডিতে আটকে না থেকে হয়ে উঠেছিল ব্ল্যাক কালচারের একটি শক্তিশালী প্রকাশ।
সেই সময়টায় ব্রিটিশ সমাজে 'ইংলিশ' এবং 'ব্ল্যাক' পরিচয় নিয়ে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছিল। বেশ কিছু ফুটবল ক্লাব উগ্র ডানপন্থী বা বর্ণবাদী গোষ্ঠীর প্রভাবের শিকার হচ্ছিল। এমন এক অস্বস্তিকর পরিবেশে, ব্ল্যাক সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য আর্সেনালের খেলা দেখাটা এক নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে।
প্রায় সম্পূর্ণ কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের দল
১৯৯৬ সালে যখন কিংবদন্তি ফরাসি ম্যানেজার আর্সেন ওয়েঙ্গার আর্সেনালের দায়িত্ব নেন, তখন এই ভালোবাসার সম্পর্কটি নতুন এক মাত্রা পায়। দীর্ঘ ২২ বছরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি সুন্দর ফুটবলের পাশাপাশি ব্ল্যাক খেলোয়াড়দের এক দারুণ ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভাবনীয় সাড়া ফেলে।
আফ্রিকান খেলোয়াড়দের ওপর ওয়েঙ্গারের বিশেষ আস্থা ছিল। ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে লিডস ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচে আর্সেনালের শুরুর ১১ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ৯ জনই ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ! ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে এটি ছিল একেবারে নজিরবিহীন এক ঘটনা।
মূলত নাইজেরিয়ান সুপারস্টার নুয়ানক্বো কানুর জাদুকরী খেলাই পশ্চিম আফ্রিকায় আর্সেনালকে এতটা জনপ্রিয় করে তুলেছিল। আর সেই সাথে গত ২৫ বছরে ব্ল্যাক ফ্যানদের সবচেয়ে বড় আইকন হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন ফরাসি স্ট্রাইকার থিয়েরি অঁরি।
ওয়েঙ্গার যা তৈরি করে গিয়েছিলেন, আজকের আর্সেনাল দল যেন সেটিরই এক উপযুক্ত উত্তরাধিকার বহন করছে। আধুনিক ডিজিটাল যুগে আর্সেনালের এই প্রথম শিরোপা জয় বিশ্বজুড়ে তাদের পরিচিতি বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে দলে হয়তো কানু বা কোলো তোরের মতো কোনো আফ্রিকান সুপারস্টার নেই, তবে আর্সেনালের প্রতি মহাদেশটির ভালোবাসা এখনও আগের মতোই জ্বলজ্বল করছে।
সফল বাণিজ্যের সঙ্গে শেকড়ের টান
আর্সেনাল শুধু ফুটবলই খেলে না, একটি ব্র্যান্ড হিসেবেও তারা অত্যন্ত আধুনিক। তাদের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনে আয় দ্বিগুণ হয়ে ৭৭০ মিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়ে গেছে। এই অর্থ তারা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে চমৎকারভাবে মিশিয়ে কাজে লাগাচ্ছে।
২০২৪ সালে 'ল্যাব্রাম লন্ডন'-এর সাথে মিলে তারা একটি প্যান-আফ্রিকান অ্যাওয়ে জার্সি তৈরি করেছে, যেখানে আফ্রিকান ঐতিহ্যের প্রতীক 'কাউরি শেল' বা কড়ির চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। আবার ২০২২ সালেও তাদের বের করা একটি 'জ্যামাইকা থিম' জার্সি নটিং হিল কার্নিভালে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
সঙ্গীত বা মিউজিকের দিক দিয়েও ক্লাবটি অসাধারণ কাজ করছে। রেকর্ড চুক্তিতে ডেক্লান রাইস দলে আসার সময় নাইজেরিয়ান র্যাপার অডুমোডুভ্যাক-এর গান ব্যবহার করা হয়। একইভাবে জ্যাজ ব্যান্ড 'এজরা কালেকটিভ'-এর মিউজিক ট্র্যাকের সাথে দলের আরেক চুক্তির ঘোষণা করা হয়েছিল। আর্সেনাল তাদের ভক্তদের স্পন্দনটা খুব ভালোভাবেই বোঝে।
এক অকৃত্রিম সম্পর্ক
এতসব আধুনিকতার পরও আর্সেনাল যে তাদের ব্ল্যাক ফ্যানদের প্রতি দায়িত্ব পালন করছে, তা কেবল কর্পোরেট সুবিধার জন্য নয়। ভক্তরা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করেও যে আর্সেনালকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, তার মূলে রয়েছে এমন এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক স্মৃতি, যা তাদের জীবনেরই এক অমূল্য অংশ।
সোল ক্যাম্পবেল এখনো একমাত্র আর্সেনাল খেলোয়াড়, যিনি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে গোল করতে পেরেছেন। কিন্তু এজে, সাকা এবং দলের বাকি তরুণদের সামনে এবার ইউরোপ সেরার মঞ্চে নতুন ইতিহাস লেখার সুযোগ রয়েছে। ডেভিস, রোক্যাসল ও রাইটদের মতো কিংবদন্তিরা কয়েক দশক ধরে যে শক্ত ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করেছিলেন, এই তরুণরা হয়তো নতুন জয়ে সেটিকে আরও এক ধাপ উঁচুতে নিয়ে যাবেন।
