ইরানের সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতি যেভাবে শান্তি আলোচনায় বিলম্ব ঘটাচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা একটি চুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া মন্তব্যে এমনই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে আলোচনাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের পক্ষে অনুকূল শর্ত আদায়ের চেষ্টা করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যোগাযোগ ধীরগতির হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এবং তার গোপন অবস্থান।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্বাস, তিনি বর্তমানে এমন একটি অজ্ঞাত স্থানে অবস্থান করছেন, যেখানে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ খুবই সীমিত। ফলে আলোচনার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে ইরানি নেতাদের তার কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সিবিএস নিউজ মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র উপায় হলো বার্তাবাহকদের একটি জটিল নেটওয়ার্ক, যা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে তার অবস্থান শনাক্ত করা না যায়। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করার অনুমতি পাওয়া ইরানি কর্মকর্তারা নিজেদের সরকারি ব্যবস্থার মধ্যেও যোগাযোগ করতে সমস্যার মুখে পড়ছেন বলে জানা গেছে।
মার্কিন পক্ষ কোনো প্রস্তাব পাঠালে, সেটি খামেনির কাছে পৌঁছাতে এবং সেখান থেকে জবাব ফিরে আসতে প্রায়ই দীর্ঘ সময় লেগে যায় বলে দুইজন কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন।
একজন জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, বর্তমান খসড়া চুক্তির কাঠামোর সঙ্গে সর্বোচ্চ নেতা সম্মতি দিয়েছেন। এর পরই ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন যে খুব শিগগিরই একটি চূড়ান্ত চুক্তি ঘোষণা করা হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান বা ইরানের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
অনেক ইরানি নেতা আত্মগোপনে
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। সিবিএস নিউজের উদ্ধৃত সূত্র অনুযায়ী, তাদের অনেকে শক্তিশালী নিরাপত্তাবেষ্টিত বাঙ্কারে অবস্থান করছেন এবং একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একে অপরের সঙ্গে কথাও বলছেন না।
সর্বোচ্চ নেতাও ২৮ ফেব্রুয়ারি তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করেছে বলে যে হামলার দাবি করা হয়েছে, সেই ধরনের হামলা এড়াতে বিশেষ সতর্কতা নিচ্ছেন বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এক কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে বলেছেন, 'তাদের নিজেদের মধ্যে কীভাবে কথা বলবে তা বোঝার চেষ্টা দেখতে অনেকটা হাস্যরসাত্মক নাটক দেখার মতো। তারা পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়েছে।'
প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, ইরানের অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও সর্বোচ্চ নেতার সঠিক অবস্থান সম্পর্কে জানেন না। তার সঙ্গে কেবল কয়েক ধাপের বার্তাবাহকের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়। ফলে তার কাছে যে তথ্য পৌঁছায়, তা প্রায়ই পুরোনো হয়ে যায়।
'এ কারণেই আপনি শুনতে পান, "সর্বোচ্চ নেতা কাঠামোগত চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন," অথবা "চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে তার জবাবের অপেক্ষা চলছে।" তার কাছে পৌঁছানো প্রতিটি তথ্যই পুরোনো এবং তার প্রতিক্রিয়া আসতেও অনেক দেরি হয়,' এক কর্মকর্তা বলেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, খামেনি তার অধীনদের সঙ্গে কেবল সামগ্রিক দিকনির্দেশনা নিয়ে কথা বলেছেন। কোন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা যাবে এবং কোন বিষয়গুলো আলোচনার বাইরে থাকবে, তা তিনি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে চালানো হামলায় মোজতবা খামেনি আহত হন। হামলায় আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও ছিলেন।
পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি এখনো উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে। উভয় পক্ষের কর্মকর্তারা এমন একটি চুক্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে পারে।
ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া যাবে না। তিনি আরও দাবি করেন, তেহরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
শান্তি চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই বন্ধ রয়েছে।
