জ্বালানি বেচতে হঠাৎ করেই ভারত সফরে রুবিও
ইরান যুদ্ধকে ঘিরে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে চার দিনের সফরে শনিবার (২৩ মে) ভারতে পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
স্থানীয় সময় সকালে তিনি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় শহর কলকাতায় পৌঁছান। এরপর তার দিল্লি, জয়পুর ও আগ্রা সফরের কথা রয়েছে।
সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে রুবিওর। বৈঠকে জ্বালানি ইস্যু গুরুত্ব পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই নৌপথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনায় চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে প্রণালিটি বন্ধ রেখেছে ইরান।
ভারত তাদের মোট জ্বালানি চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। ১৪০ কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশ ভারত রান্নার গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম পণ্যসহ দৈনন্দিন জ্বালানির জন্য বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। তাই বর্তমান সংকটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি ভারত।
এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ভারতের এই সংকটের বিষয়টি আগেই স্বীকার করেছেন রুবিও।
তিনি বলেন, 'ভারত যত জ্বালানি কিনতে চায়, আমরা ততই বিক্রি করতে চাই। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক উচ্চতায় রয়েছে।'
দিল্লিও যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়াতে আগ্রহী। এতে ভারতের পক্ষে থাকা বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমবে, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নয়াদিল্লির ওপর বিরক্ত।
২০২৫ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৫৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।
তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে জ্বালানি আনার পথ দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ঘাটতি পূরণে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা ভারতের জন্য যৌক্তিক হবে না।
দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক বিনীত প্রকাশ বলেন, 'এই সফরের মূল বিষয় হবে জ্বালানি নিরাপত্তা। কারণ ইরান সংকট দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ভারতকে ছাড় দিয়েছে। তবে দিল্লি আরও সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবে।'
বাণিজ্য আলোচনা এবং গত বছরের স্বল্পস্থায়ী ভারত-পাকিস্তান সংঘাত মীমাংসা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবির কারণে দিল্লি-ওয়াশিংটন সম্পর্কে যে টানাপোড়েন চলছে, সেই প্রেক্ষাপটেও রুবিওর এই সফর গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, তিনিই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতা করেছিলেন।
তবে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের বিরোধে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা গ্রহণ না করার নীতির কথা জানিয়ে দিল্লি ধারাবাহিকভাবে সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
এছাড়া পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের প্রতি ট্রাম্পের প্রকাশ্য অনুরাগও দিল্লিকে অসন্তুষ্ট করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প আসিম মুনিরকে নিজের 'প্রিয় ফিল্ড মার্শাল' বলে উল্লেখ করেছিলেন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগ ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে বলেও মনে করা হচ্ছে।
বিনীত প্রকাশ বলেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং কৌশলগত কারণে দেশটিকে কাছে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই সফরে রুবিওর পাকিস্তান নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করার সম্ভাবনা কম।
বিনীত প্রকাশ বলেন, 'দিল্লিতে নেতাদের সঙ্গে রুবিওর বৈঠকে পাকিস্তান নিয়ে আলোচনা হলেও তা হবে বন্ধ দরজার আড়ালে।'
এদিকে গত কয়েক মাসে ওয়াশিংটন ও দিল্লিও পরস্পরের প্রতি নমনীয় অবস্থান দেখিয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে ১০ মাসের অচলাবস্থার পর ভারতীয় পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামানো হয়। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত দিল্লিতে স্বস্তি এনে দেয়।
এরপর মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে রায় দিলে সেই শুল্ক আরও কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। এতে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ আরও কমে।
ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ভারত ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত আসে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি, বিমান, প্রযুক্তি ও কৃষিপণ্য।
বর্তমানে দুই দেশ একটি বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া নিয়ে আলোচনা করছে। তবে আলোচনার বিস্তারিত এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মতো বড় অঙ্কের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দিহান। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণ এর তুলনায় অনেক কম এবং ট্রাম্পের ঘোষণার পরও ভারত এখনও দৃশ্যমান বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতের অন্যতম ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানি ট্রাম্পের সেই ঘোষণার বিষয়ে এখনও প্রকাশ্যে কিছু বলেননি, যেখানে বলা হয়েছিল তার কোম্পানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ টেক্সাসের ব্রাউনসভিলে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তেল শোধনাগার নির্মাণে সহায়তা করবে। যুক্তরাষ্ট্রে গত ৫০ বছরে এটিই হবে প্রথম নতুন তেল শোধনাগার।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত বাণিজ্য চুক্তিতে কী থাকবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি স্থিতিশীল ছিল এবং এর পরিমাণ ছিল ৮৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ থিংক ট্যাংকের অজয় শ্রীবাস্তব বিবিসিকে বলেন, '২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উচ্চ পারস্পরিক শুল্ক থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।'
শুল্ক কমানোর পর রপ্তানি আরও বেড়েছে। এপ্রিল মাসে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
ক্রিসিল রিসার্চ বলেছে, এটি 'শুল্ক কমানোর ইতিবাচক প্রভাবের ধারাবাহিকতা' নির্দেশ করে।
তবে তারা সতর্ক করে বলেছে, 'শুল্কহার নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানির ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখতে হবে।'
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ভারতকে তাদের দীর্ঘদিনের সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতি শিথিল করতে হয়েছে। দিল্লি দ্রুততার সঙ্গে যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), অস্ট্রেলিয়া ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশ ও জোটের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
ট্রাম্প বলেছেন, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর সব ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা শূন্যে নামিয়ে আনবে।
তবে এইচএসবিসির প্রাঞ্জুল ভান্ডারি বলেছেন, এসব চুক্তি 'উভয় পক্ষকে কিছু খাত সুরক্ষার সুযোগ দেবে'।
এতে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর জন্য ভারতীয় অর্থনীতি আরও উন্মুক্ত হলেও কৃষি ও দুগ্ধ খাতের মতো সংবেদনশীল খাতগুলো সুরক্ষিত থাকতে পারে।
বাণিজ্যের বাইরে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভারতের ভূমিকা সম্পর্কে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কী ধরনের প্রকাশ্য মন্তব্য করেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তবে রুবিও জানেন, হরমুজ প্রণালিতে অবাধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে সামরিক সম্পদ মোতায়েনের ট্রাম্পের আহ্বানের বিষয়ে ভারত অনাগ্রহী। দিল্লি কূটনৈতিক ভূমিকার বাইরে যেতে চায় না।
সবশেষে রয়েছে কোয়াড জোটের বিষয়টি। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও এই জোটে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও জাপান।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প কোয়াড নিয়ে বেশ আশাবাদী ছিলেন। তখন তার প্রশাসন এই জোটকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাবের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেছিল।
দিল্লিতে আগামী ২৬ মে কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নেবেন রুবিও। বছরের শেষ দিকে নয়াদিল্লিতে জোটের শীর্ষ নেতাদের সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। এখন পর্যন্ত ট্রাম্প ওই সম্মেলনে অংশ নেবেন কি না, কিংবা সম্মেলন আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
বিনীত প্রকাশ বলেন, এতে বোঝা যায় ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন যে 'চীনকে সহজে দমন করা যাবে না'। এ কারণেই কোয়াডকে ঘিরে তিনি ভিন্ন ধরনের সম্পৃক্ততা চাইছেন।
গত বছরই কোয়াড সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। তবে ট্রাম্পের অনাগ্রহের কারণে অনেকে বলেছিলেন, কোয়াড 'লাইফ সাপোর্টে' রয়েছে।
কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এই বৈঠক জোটটিকে নতুন করে সক্রিয় করতে পারে কি না, তা ভবিষ্যতে দেখা যাবে।
দিল্লির জন্য এই শীর্ষ সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে উদীয়মান ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরতে চায় ভারত। তাই তারা চায় সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হোক।
তবে কোয়াড নিয়ে কী ধরনের অবস্থান নেওয়া হবে, সে বিষয়ে প্রকাশ্য মন্তব্য করার আগে দিল্লি সম্ভবত রুবিওর বক্তব্য মূল্যায়ন করবে।
চীন ইস্যু দিল্লির জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ওয়াশিংটনের জন্যও। বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে ব্রিকস জোটের সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ব্রিকস জোটে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান ও সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ রয়েছে।
