গভর্নর বিমানে ওঠার আগমুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রী হতে প্রয়োজনীয় সমর্থন পেলেন বিজয়: যেভাবে শেষ হলো চার দিনের নাটকীয়তা
সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে চেন্নাই থেকে তিরুবনন্তপুরমের উদ্দেশে বিমানে ওঠার কথা ছিল তামিলনাড়ুর অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত গভর্নর রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকারের।
তার ওই সফর হলে সরকার গঠনের দৌড়ে থাকা অভিনেতা-রাজনীতিক বিজয় আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ে যেতে পারতেন।
এমন পরিস্থিতিতে শুরু হয় নতুন জল্পনা ও নাটকীয়তা। প্রথমে খবর আসে, গভর্নর চতুর্থ এবং সম্ভবত চূড়ান্ত বৈঠকটি বাতিল করেছেন। পরে আবার সেই বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হয়।
হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, শেষ পর্যন্ত গভর্নর তার সফর বাতিল করেছেন।
তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন যেন রহস্য-রোমাঞ্চে ভরা নাটকে পরিণত হয়েছে।
চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি এগিয়ে গেছেন বিজয়।
অবশেষে ভিসিকে ও আইইউএমএল জোটে যোগ দেওয়ায় টিভিকের হাতে এখন সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এসেছে। তবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ছিল গভর্নরের, যার চেন্নাই থেকে তিরুবনন্তপুরম যাওয়ার জন্য ইন্ডিগোর বিমানের টিকিটও বুক করা ছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সংখ্যার হিসাব অনুযায়ী, পরাজিত ডিএমকের সাবেক দুই মিত্র দল 'ভিডুথালাই চিরুথাইগাল কাচি' এবং 'ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ' শনিবার সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে টিভিকেকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছে।
এর ফলে ২৩৪ সদস্যের তামিলনাড়ু বিধানসভায় বিজয়ের জোটের আসন সংখ্যা ১১৮-এর ম্যাজিক ফিগার পেরিয়ে ১২০-এ পৌঁছেছে।
বহু প্রতীক্ষিত ও আলোচিত সেই সমর্থনপত্রও এখন বিজয়ের হাতে এসেছে বলে জানা গেছে।
তবে পুরো পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তামিলনাড়ুর অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত গভর্নর রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকার। সমর্থনপত্র গ্রহণ, যাচাই এবং বিজয়কে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানোর সাংবিধানিক দায়িত্ব তারই। কিন্তু তিনি চেন্নাইয়ে থাকবেন কি না, তা নিয়েই তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা।
গোয়ার এই প্রবীণ বিজেপি নেতা ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে কেরালার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত মার্চে তিনি তামিলনাড়ুর অতিরিক্ত দায়িত্বও পান।
সাংবিধানিকভাবে তিনি এখন দুই রাজ্যের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে কেরালাতেও শিগগিরই নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেখানে কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছে।
গভর্নর আরলেকার যদি চেন্নাই ছেড়ে চলে যেতেন, তাহলে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্ভবত সোমবার পর্যন্ত গড়াত।
এদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ কেরালার বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করছিল।
পুরো সপ্তাহজুড়ে বিজয়ের রাজনৈতিক তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আরলেকার। তিনি একাধিকবার টিভিকে প্রধান বিজয়ের সঙ্গে বৈঠক করলেও সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ একবারও জানাননি।
টিভিকে সূত্র জানিয়েছিল, গভর্নর চেন্নাই ছাড়ার আগেই দলগুলোর সমর্থনের চিঠিগুলো রাজভবনে জমা দেওয়া হবে।
পরে কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, আরলেকার চতুর্থ বৈঠকটি বাতিল করেছেন। তবে পরে জানা যায়, বিজয়ের সঙ্গে বৈঠকের সুযোগ রাখতে তিনি নিজের পরিকল্পনা পরিবর্তন করেছিলেন।
এখন পর্যন্ত সংখ্যার হিসাব বাস্তবেই বিজয়ের পক্ষেই আছে। ফলে তামিলনাড়ুকে আর গভর্নরের আগমন-প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে না।
সিনেমার সঙ্গে বাস্তবের মিল
সপ্তাহজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে বিজয়ের নিজের সিনেমার গল্পেরও এক ধরনের মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
২০১৯ সালের তামিল ব্লকবাস্টার সিনেমা 'বিগিল'-এ পরিচালক অ্যাটলি বিজয়কে ট্র্যাকস্যুট পরিয়ে একটি ভেঙে পড়া ফুটবল দল গঠনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তখন খুব কম মানুষই ভেবেছিলেন, সাত বছর পর সেটিই বাস্তব রাজনৈতিক জীবনের এক ধরনের নির্দেশিকায় পরিণত হবে।
এই সপ্তাহে বিজয় যেন অন্য এক রাজনৈতিক মাঠে একই কৌশল অনুসরণ করেছেন।
তামিলনাড়ুর ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১১৮ আসন। ঝুলন্ত পরিষদে টিভিকে ১০৮টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসে। তবে দুটি আসন থেকে বিজয় জয়ী হওয়ায় একটি আসন ছাড়তে হবে তাকে। ফলে কার্যকর আসনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৭।
অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে তার ঘাটতি ছিল ১১ আসনের, যা একটি ফুটবল দল মাঠে নামাতে প্রয়োজনীয় খেলোয়াড় সংখ্যার সমান। যদিও আইনগতভাবে তিনি ১০ আসন নিয়েও সরকার গঠন করতে পারতেন। কারণ আস্থা ভোটে মোট ভোটদাতা সদস্যসংখ্যা ২৩৩-এ নেমে আসবে, যেহেতু দুটি আসনে জিতলেও বিজয় দুইবার ভোট দিতে পারবেন না।
কংগ্রেস ও বাম দলগুলোর কাছ থেকে তিনি নয়জনের সমর্থন পেয়েছিলেন। তবে বাকি দুই সমর্থন শনিবার পর্যন্ত অধরাই ছিল।
শেষ পর্যন্ত তার প্রয়োজন ছিল শুধু এমন একজন রেফারির, যিনি বাঁশি বাজাতে প্রস্তুত।
