বিশ্বে তেলের মজুত থাকলেও বাড়ছে অন্য এক সংকট: গোল্ডম্যান স্যাকস
ইরান যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের জন্য কাড়াকাড়ি শুরু হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হলেও— বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের মজুত একেবারে ফুরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়নি।
বরং সংকট দেখা দিয়েছে তেল থেকে উৎপাদিত কিছু বিশেষ জ্বালানি ও উপজাত পণ্যের, যা উড়োজাহাজ চলাচল এবং শিল্পকারখানার সাপ্লাই চেইন সচল রাখতে অপরিহার্য। বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকরা সম্প্রতি এক নোটে এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
গতকাল সোমবার প্রকাশিত ঐ নোটে গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকরা লিখেছেন, "কিছু অঞ্চল ও নির্দিষ্ট পণ্যের মজুতে যে দ্রুত অবনতি এবং সরবরাহ ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সহজে ব্যবহারযোগ্য পরিশোধিত পণ্যের আপৎকালীন মজুদ দ্রুত তলানিতে ঠেকছে।"
এর কারণ হলো, অপরিশোধিত তেলের সামগ্রিক মজুত এখনো বিপজ্জনক সীমার উপরে থাকলেও— বিমান চলাচলের জ্বালানি (জেট ফুয়েল), রাসায়নিক শিল্পের কাঁচামাল যেমন 'ন্যাফথা' এবং প্লাস্টিক ও রাসায়নিক তৈরিতে ব্যবহৃত তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মতো পরিশোধিত পণ্যগুলোতে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
গোল্ডম্যানের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী পরিশোধিত পণ্যের বাণিজ্যিক মজুত ৪৫ দিনের চাহিদা পূরণের মতো স্তরে নেমে এসেছে, যা সাম্প্রতিক অস্থিরতা শুরু হওয়ার আগে ছিল প্রায় ৫০ দিনের সমান। এর বিপরীতে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের মোট মজুত বর্তমানে প্রায় ১০১ দিনের চাহিদার সমপরিমাণ।
প্লাস্টিক এবং শিল্প রাসায়নিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ন্যাফথার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানিকেন্দ্র ফুজাইরাহ বন্দরের স্টোরেজে এর মজুদ ৭২ শতাংশ এবং উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের আমস্টারডাম-রটারডাম-অ্যান্টওয়ার্প হাবে ৩৭ শতাংশ কমেছে।
চীন ছাড়া এশিয়ার অন্যান্য অংশ এবং ইউরোপের কিছু এলাকা পরিশোধিত জ্বালানির এই সংকটের মুখে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। গোল্ডম্যানের বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, থাইল্যান্ড এবং তাইওয়ানও এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এমনকি যেখানে অপরিশোধিত তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেও সেগুলোকে সবসময় দ্রুত ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। রিফাইনিংয়ের সীমাবদ্ধতা, বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া এবং রপ্তানি বিধি-নিষেধের ফলে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এর অর্থ হলো, এক স্থানের উদ্বৃত্ত তেল দিয়ে অন্য স্থানের ঘাটতি সহজে পূরণ করা যাচ্ছে না। এই সংকটের প্রতিফলন সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে বিমান চলাচল খাতে। জেট ফুয়েলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিশ্বের বড় বড় বিমান সংস্থাগুলো অনেক ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।
প্রভাবশালী বিনিয়োগ ব্যাংকটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ইউরোপের বাণিজ্যিক জেট ফুয়েলের মজুত (সরকারি আপৎকালীন মজুদ বাদে) আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার বেঁধে দেওয়া ২৩ দিনের সর্বনিম্ন সীমা অতিক্রম করে— আগামী জুনেই আরও নিচে নেমে যেতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। হরমুজ প্রণালিতে দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ফলে, অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্য মূল্য বা ফিউচার প্রাইস ইতোমধ্যেই ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা লিখেছেন, "যদি হরমুজ প্রণালিতে (জ্বালানিবাহী) জাহাজের যাতায়াত এখনই স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তবুও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরতে অন্তত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে।"
আজ মঙ্গলবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার প্রতি ব্যারেল ১১৩ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড ছিল ব্যারেল প্রতি ১০৪ ডলারের কাছাকাছি।
