জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজারে কি আধিপত্য হারাচ্ছে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো?
ইরান যুদ্ধের অন্যতম প্রধান ও চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো— বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারের এক অনন্য স্থিতিস্থাপকতা বা ধাক্কা সামলে ওঠার সক্ষমতা। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট বা 'কৌশলগত চোকপয়েন্ট' হরমূজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়া সত্ত্বেও, বাজারে তেলের দাম সাধারণত প্রতি ব্যারেলে ১০০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে—যা অনেক বিশ্লেষকের প্রত্যাশার চেয়েও বেশ কম।
এই স্থিতিশীলতার একটি অন্যতম প্রধান কারণ হলো আমেরিকা অঞ্চলের (উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা) দেশগুলোতে তেল উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) পূর্বাভাস দিয়েছিল যে, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদার প্রায় পুরো বৃদ্ধিটাই মেটানো সম্ভব হবে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো—যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল, গায়ানা এবং আর্জেন্টিনার ক্রমবর্ধমান সরবরাহ দিয়ে।
সেই সময়ে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট 'ওপেক'-ও তাদের উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যার ফলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ এবং তেলের দাম কমে যাওয়ার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ সেই পুরো চিত্রটি নাটকীয়ভাবে বদলে দেয়। হরমূজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে প্রতিদিন বাজার থেকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল গায়েব হয়ে গেছে; যা তেলের দামকে উর্ধ্বমুখী করেছে এবং বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত বৃদ্ধির প্রত্যাশার বিপরীতে বড় ধরনের মজুত ঘাটতি তৈরি করেছে।
তবে উচ্চ মূল্যই প্রায়শই যেকোনো সংকটের সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। আমেরিকা অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারীরা মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার এই সুযোগে তাদের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়িয়ে সাড়া দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত এপ্রিল মাসে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি রেকর্ড দৈনিক ৬৪ লাখ ব্যারেলে উন্নীত হয়েছে। দেশটিতে নতুন রপ্তানি অবকাঠামোও যুক্ত করা হচ্ছে, যার অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের মধ্যেই প্রতিদিন আরও প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল অতিরিক্ত ডক বা বন্দর সক্ষমতা চালু হতে যাচ্ছে।
এদিকে ব্রাজিল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্রবক্ষে আটটি নতুন ভাসমান তেল উৎপাদনকারী জাহাজ (এফপিএসও) যুক্ত করেছে, যাদের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেলের কাছাকাছি। ২০২৬ সালে দেশটির তেল উৎপাদন আবারও নাটকীয়ভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্রাজিলের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি 'পেট্রোব্রাস' সম্প্রতি রিও ডি জেনিরো উপকূলে বুজিওস তেলক্ষেত্রে এই ধরনের একটি জাহাজে নতুন উৎপাদন প্রকল্প চালু করেছে। বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দামের সুযোগ নিতে নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মাস আগেই সেখানে উৎপাদন শুরু করা হয়।
দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে গায়ানা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গায়ানার তেল উৎপাদন ইতিমধ্যেই দৈনিক প্রায় ৯ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে এবং এই দশকের শেষ নাগাদ তা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে তেল উৎপাদন হ্রাস এবং অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ভেনিজুয়েলাও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত্র ব্যবস্থায় তাদের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের শেষের দিকে আমেরিকা অঞ্চলের দেশগুলো প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ব্যারেল তেল উৎপাদন করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা যুদ্ধপূর্ব ওপেকের উৎপাদন মাত্রার কাছাকাছি। এর মধ্যে একক দেশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী রয়ে গেছে; গত এপ্রিল মাসে দেশটির তরল হাইড্রোকার্বনের মোট উৎপাদন দৈনিক প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে।
ওপেক নিজেই এই জোয়ার তৈরিতে সাহায্য করেছে
পশ্চিম গোলার্ধে তেল উৎপাদনের এই অভূতপূর্ব জোয়ার কিন্তু হঠাৎ বা বিচ্ছিন্নভাবে তৈরি হয়নি। মজার বিষয় হচ্ছে, এর পেছনে খোদ ওপেকেরই অবদান ছিল। বছরের পর বছর ধরে ওপেকের অঘোষিত নেতা সৌদি আরব এবং তার সহযোগীরা চড়া দাম ধরে রাখতে তেলের উৎপাদন সীমিত রেখেছিল। তেলের এই উচ্চ মূল্যই আমেরিকা অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করে তোলে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'শেল অয়েল' (বা মহাদেশীয় শিলাস্তর) থেকে তেলের উৎপাদনকে।
দীর্ঘ সময় ধরে তেলের চড়া দাম ধরে রাখার সৌদি আরবের এই কৌশলটি আংশিকভাবে দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দ্বারা চালিত হয়েছিল। বিশাল 'নিওম' মেগা সিটি প্রকল্পসহ তাদের অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ পরিকল্পনার সাথে যুক্ত প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের জন্য সৌদিদের প্রতি ব্যারেল তেলের দাম কমপক্ষে ৯০ মার্কিন ডলার হওয়া প্রয়োজন। এর ফলে ওপেকের বাইরের উৎপাদকদের উৎপাদন সম্প্রসারণের জন্য একটি শক্তিশালী উদ্দীপনা তৈরি হয়।
তবে পশ্চিমা দেশগুলোর এই অভাবনীয় গতির পরেও, বৈশ্বিক তেলের মূল কেন্দ্রবিন্দু মধ্যপ্রাচ্য থেকে স্থায়ীভাবে সরে গেছে বলে ঘোষণা করাটা হবে সঠিক সময়ের আগেই মন্তব্য করা। কারণ উৎপাদনের অর্থনৈতিক সমীকরণ এখনো উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদকদের পক্ষেই রয়েছে এবং পারস্য উপসাগরে তেল উত্তোলনের খরচ বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম।
কিছু কিছু তেলক্ষেত্রে সৌদি আরব এবং তার প্রতিবেশী দেশগুলো প্রতি ব্যারেল তেল মাত্র ১০ ডলারের কম খরচে তুলতে পারে। সামগ্রিকভাবে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে গড় উৎপাদন খরচ প্রতি ব্যারেলে আনুমানিক ২৭ মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে, উত্তর আমেরিকার বেশিরভাগ শেল অয়েলের উৎপাদন লাভজনক রাখতে—প্রতি ব্যারেলে দাম ৫০ থেকে ৬৫ ডলারের কাছাকাছি থাকা প্রয়োজন।
তারল্য বা খরচের এই ব্যবধানটি তেলের দাম কমে যাওয়ার দিনগুলোতে বিশাল পার্থক্য তৈরি করে। বাজার যদি আবারও দুর্বল বা মন্দা হয়ে পড়ে, তবে আমেরিকা অঞ্চলের উচ্চ উৎপাদন খরচের দেশগুলো সবার আগে চাপের মুখে পড়বে। সে তুলনায়, বিশাল মজুত এবং অত্যন্ত কম খরচের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদকরা সম্ভবত সেই মন্দা কাটিয়ে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারবে।
অনেক গুরুত্বপূর্ণ বাজারের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থানও মধ্যপ্রাচ্যের অনুকূলে রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো এশিয়ার ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য নিকটবর্তী উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল আমদানি করাই সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিকল্প।
এশিয়ার অনেক শোধনাগার বা রিফাইনারি বিশেষভাবে তৈরিই করা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের গ্রেড প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য, যা ডিজেল এবং জেট ফুয়েলের মতো মিডল ডিস্টিলেট বা মধ্যম মানের জ্বালানি সমৃদ্ধ—যে হাইড্রোকার্বনগুলো মূলত অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে রপ্তানি করা বেশিরভাগ শেল অয়েল তুলনামূলকভাবে হালকা এবং তা সরাসরি বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের জন্য খুব একটা উপযোগী নয়।
রপ্তানি রুট সুরক্ষিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
একই সময়ে, বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা ধরে রাখতে উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদকরা বিপুল বিনিয়োগ করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি এড়াতে পাইপলাইন অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে, যার মধ্যে তাদের হাবশান- ফুজাইরাহ পাইপলাইনটির আধুনিকীকরণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আর সৌদি আরব ইতিমধ্যেই তার বিশাল 'ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন' পরিচালনা করছে, যা লোহিত সাগরে প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনে সক্ষম। এই প্রকল্পগুলো মূলত আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে নিজেদের ঝুঁকি কমাতে এবং আগামী দশকগুলোতে রপ্তানি রুট সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।
আমেরিকা অঞ্চলের দেশগুলো নিঃসন্দেহে বিশ্ব তেলের বাজারে একটি বড় পরিবর্তন আনছে। এই অঞ্চলটি এখন কার্যকরীভাবে একটি 'সুইং প্রডিউসার' (চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষাকারী উৎপাদক) হিসেবে কাজ করছে, যা সরবরাহ সংকট এবং ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কার সময়ে বাজারে কিছুটা নমনীয়তা বা স্বস্তি এনে দিচ্ছে।
কিন্তু তেল বাজারে দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্য কেবল উৎপাদনের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না। উৎপাদন খরচ, ভৌগোলিক অবস্থান, অবকাঠামো এবং তেলের মজুতের আকারও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই সমস্ত পরিমাপদণ্ডে মধ্যপ্রাচ্য এখনো এক অপরাজেয় বা দুর্জয় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্ব যতদিন বিপুল পরিমাণ তেল ব্যবহার করতে থাকবে, ততদিন উপসাগরীয় অঞ্চলটিই এই শিল্পের মূল উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে বহাল থাকবে বলেই মনে হয়—যদিও আমেরিকা অঞ্চলের দেশগুলো অপরিশোধিত তেলের একটি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠছে।
