হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা বিশ্বাস করছে না বিশ্ববাজার; কাটছে না উদ্বেগ, বাড়ছে তেলের দাম
হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা তেলের ট্যাঙ্কারগুলোর জট কাটাতে বিশ্ব এখন মরিয়া হয়ে একটি সমাধান খুঁজছে। ট্রাম্প প্রশাসন সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে; সোমবার তারা সফলভাবে দুটি মার্কিন জাহাজকে এই প্রণালি দিয়ে পার করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে তাদের এই 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' ঐতিহাসিক জ্বালানি সংকট মেটানোর মতো কোনো 'গেমচেঞ্জার' হিসেবে এখনো আবির্ভূত হতে পারেনি।
অন্তত বাজার থেকে এমন বার্তাই পাওয়া যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন জাহাজ চলাচলের এই মার্কিন প্রচেষ্টার ঘোষণা দিলেন, তখন জ্বালানি তেলের দাম তো কমেইনি, বরং আরও বেড়েছে। সোমবার মধ্যপ্রাচ্যের জাহাজ এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলো হামলার শিকার হওয়ায় তেলের বাজার ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। এটি বর্তমান যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলছে। একই সঙ্গে পেট্রোলের ভবিষ্যৎ দামও বেড়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পরিস্থিতির উন্নতির আগে ভোগান্তি আরও বাড়বে। এই মুহূর্তে বাজার ধরে নিচ্ছে যে, 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' মধ্যপ্রাচ্যে আটকে থাকা বিশাল জ্বালানি মুক্ত করতে পারবে না।
কেন এই সংশয়?
এই সংশয়ের পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে:
১. এটি কোনো এসকর্ট মিশন নয়: ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের মতে, প্রজেক্ট ফ্রিডম হলো হরমুজ প্রণালিতে 'ন্যাভিগেশন বা জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার' করার একটি প্রচেষ্টা। এতে ১০০টিরও বেশি স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক বিমান এবং ১৫ হাজার সেনাসদস্য অংশ নেবেন। তবে এটি প্রণালি দিয়ে পার হতে চাওয়া জাহাজগুলোকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো প্রতিশ্রুতি নয়। সিএনএন-কে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি কোনো 'এসকর্ট মিশন' হবে না।
২. ইরানের আপত্তি: ইরান এই প্রজেক্টের প্রতিক্রিয়ায় দাবি করেছে যে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে। শুধু তাই নয়, ইরান এই অঞ্চলে পুনরায় হামলা চালিয়ে এর জবাব দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
৩. আস্থা সংকট: হরমুজ প্রণালিতে মাইন বিছানো এবং জাহাজগুলোতে হামলার ঘটনায় সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন শিল্পটি বিপর্যস্ত। শিপিং এক্সিকিউটিভরা ইতিমধ্যেই 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। এখনো এটি স্পষ্ট নয় যে, ট্যাঙ্কার মালিকরা এই প্রণালি পার হওয়ার ঝুঁকি নিতে রাজি হবেন কি না।
বাজার যা চায়
তেল বিশ্লেষকরা মনে করেন, তেলের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া প্রয়োজন। ইউরেশিয়া গ্রুপ সতর্ক করে বলেছে, ইরানের সম্মতি বা বড় ধরনের নৌ-মোতায়েন ছাড়া প্রজেক্ট ফ্রিডম সফল হবে না।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপ সোমবার এক প্রতিবেদনে লিখেছে, 'মার্কিন পরিকল্পনা নিকট ভবিষ্যতে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে না।'
একই সুর শোনা গেছে শিপ ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি অ্যাংলো-ইস্টার্ন-এর সিইও বিয়র্ন হোইগার্ডের কণ্ঠে। তিনি বলেন, 'জট খুলতে উভয় পক্ষের সদিচ্ছা প্রয়োজন—কেবল একজনের নয়। যেকোনো পক্ষই সংকেত দিতে পারে যে তারা কিছু জাহাজ যেতে দিতে ইচ্ছুক, কিন্তু অন্য পক্ষ যদি বাস্তবে তা গ্রহণ না করে, তবে পরিস্থিতি মৌলিকভাবে পরিবর্তন হয় না।'
সোমবারের সংঘাত এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলেছে। এদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে। মার্কিন সম্পদের ওপর হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ছোট নৌকাগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে দক্ষিণ কোরিয়া সংশ্লিষ্ট একটি জাহাজে বিস্ফোরণ ঘটেছে। এর কারণ অস্পষ্ট হলেও এটি নিরাপত্তার বিষয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় ভয়াবহ আগুন লাগে, যার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে দেশটির কর্মকর্তারা। এই হামলায় 'ফুজাইরাহ অয়েল ইন্ডাস্ট্রি জোন' ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই এলাকাটি মূলত হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেলের পাইপলাইন ব্যবহারের শেষ প্রান্ত হিসেবে পরিচিত।
৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে পেট্রোলের দাম
সোমবার মার্কিন বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই-এর দাম ৩.৫ শতাংশ বেড়ে ১০৫ ডলার এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫ শতাংশ বেড়ে ১১৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। খুচরা বাজারে পেট্রোলের দাম সোমবার প্রতি গ্যালন ৪.৪৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপো সিএনএন-কে বলেন, 'যদি হরমুজ প্রণালি আরও এক মাস বন্ধ থাকে তবে গ্যাসের দাম সম্ভবত প্রতি গ্যালন ৫ ডলারে গিয়ে ঠেকবে।'
সাগরে আটকে আছে ১৭ কোটি ব্যারেল তেল
আগামী দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাড়ে কি না, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখবে বাজার। আশা করা হচ্ছে যে উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে থাকা জাহাজগুলো, যাতে বিশ্বের জন্য অতি প্রয়োজনীয় জ্বালানি রয়েছে, সেগুলো শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসতে পারবে।
কেপলার-এর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ১৬৬টি ট্যাঙ্কারে প্রায় ১৭ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল, জেট ফুয়েল, ডিজেল এবং অন্যান্য পরিশোধিত পণ্য আটকে আছে। কেপলারের প্রধান তেল বিশ্লেষক ম্যাট স্মিথ বলেন, 'মাইন আতঙ্কে প্রথাগত জাহাজ চলাচলের রুটগুলো ব্যবহার না করায় তেলবোঝাই ট্যাঙ্কারগুলো বের করে আনা এবং খালি ট্যাঙ্কার ভেতরে ঢোকানো একটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া হতে পারে।' কেপলারের ধারণা, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার পরও এই জট পরিষ্কার করতে তিন মাস সময় লাগতে পারে।
'সহায়তা আসছে'—যুক্তরাষ্ট্রের আশ্বাস
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সোমবার ফক্স নিউজকে বলেছেন, 'আজকের দিন থেকে সহায়তা আসতে শুরু করেছে।' তিনি আশা প্রকাশ করেন যে প্রজেক্ট ফ্রিডম দ্রুত এই তেল বাজারে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, ;আমি মনে করি বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকবে... আমি আত্মবিশ্বাসী যে সব বাধা শেষে বিশ্ব তেলের বন্যায় ভেসে যাবে।'
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ওপেক উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা এটিকে কেবল একটি প্রতীকী বিষয় হিসেবে দেখছেন, কারণ প্রণালিটি এখনো বন্ধ। যুদ্ধের কারণে প্রতিদিন বাজার থেকে আনুমানিক ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল হারিয়ে যাচ্ছে, যার তুলনায় ওপেকের বাড়তি উৎপাদন খুবই নগণ্য। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি প্রতিদিন বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের যে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তার তুলনায় আটকে থাকা ১৭ কোটি ব্যারেল তেলও খুব সামান্য।
