২৫ বিলিয়ন নাকি ১ ট্রিলিয়ন ডলার: ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় আসলে কত?
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই মাস পেরিয়ে সংঘাত এখন তৃতীয় মাসে পদার্পণ করেছে। এরমধ্যে ক্যাপিটল হিলে যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ।
বুধবার হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির এক শুনানিতে পেন্টাগন জানায়, ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ২৫ বিলিয়ন ডলার। এই ব্যয়ের বড় অংশই গোলাবারুদ কেনা এবং সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে ব্যয় হয়েছে।
তবে ডেমোক্র্যাটিক দলের নেতা এবং বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এই হিসাবটি অনেক কম করে দেখানো হয়েছে। তাদের দাবি, মার্কিন অর্থনীতি এবং দেশটির ৩৩ কোটি মানুষের ওপর এই যুদ্ধের প্রকৃত আর্থিক প্রভাব ৬৩০ বিলিয়ন থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত নিয়ন্ত্রণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় আইনপ্রণেতাদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন হেগসেথ। তিনি বলেন, 'এই মুহূর্তে আমাদের সামনে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ, সবচেয়ে বড় শত্রু হলো কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট এবং কিছু রিপাবলিকান সদস্যের হঠকারী ও নৈরাশ্যবাদী মন্তব্য।'
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত কোনো সমঝোতার আভাস নেই। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন আগামী বছরের জন্য ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট চেয়েছে। এটি বর্তমান বাজেটের চেয়ে ৪২ শতাংশ বেশি, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন সামরিক খাতে সবথেকে বড় ব্যয় বৃদ্ধি।
এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, ইরান যুদ্ধে আসলে যুক্তরাষ্ট্রের কত খরচ হচ্ছে?
পেন্টাগন ক্যাপিটল হিলে কী জানাল?
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ইরান যুদ্ধের ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মধ্যেই ক্যাপিটল হিলে এই উত্তপ্ত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়।
পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত কম্পট্রোলার জে হার্স্ট এই শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য অ্যাডাম স্মিথকে জানান, এ পর্যন্ত যুদ্ধে আনুমানিক ২৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। হার্স্ট বলেন, 'সংঘাতের ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন শেষ হলে আমরা হোয়াইট হাউসের মাধ্যমে অতিরিক্ত তহবিলের জন্য কংগ্রেসের কাছে আবেদন করব।' তিনি পরে ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন।
হার্স্ট ব্যাখ্যা করেন, এই ২৫ বিলিয়ন ডলারের প্রাক্কলন মূলত 'যুদ্ধের সরাসরি ব্যয়' বুঝায়। তিনি বলেন, 'আমরা এই মোটের মধ্যে ব্যবহৃত গোলাবারুদের খরচ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করছি।'
গত মার্চে পেন্টাগন কর্মকর্তারা কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই ১১.৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। সেই তুলনায় পেন্টাগনের বর্তমান এই ২৫ বিলিয়ন ডলারের হিসাবটি অনেক কম মনে হচ্ছে। এছাড়া, ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে এই যুদ্ধের জন্য ২০০ বিলিয়ন ডলারের যে বিশাল অঙ্ক চেয়েছিল, পেন্টাগনের এই নতুন হিসাবটি তার চেয়েও অনেক গুণ ছোট।
তেহরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৩,৩৭৫ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের ১৪ জন সেনার মৃত্যু এবং ২০০-এর বেশি সেনা আহতের খবর নিশ্চিত করেছে।
ডেমোক্র্যাটরা কি এটা বিশ্বাস করেছে?
হেগসেথ ও তার সহযোগীদের প্রশ্ন করা ডেমোক্র্যাটরা ইরান যুদ্ধের খরচ নিয়ে তাদের দেওয়া ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি।
প্রতিনিধি রো খান্না বলেন, যুদ্ধের ব্যয় পেন্টাগনের অনুমান করা ২৫ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে অনেক বেশি। তিনি প্রশ্ন করেন, 'ইরানের কারণে আগামী বছরে জ্বালানি ও খাদ্যের বাড়তি দামের জন্য আমেরিকানদের কত খরচ হবে, আপনি কি তা জানেন?'
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ অব্যাহত রাখায় এবং তেহরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখায় দেশটিতে জ্বালানির দাম গ্যালনপ্রতি ৪ দশমিক ২৩ ডলারে পৌঁছে নতুন উচ্চতায় উঠেছে—যা ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর সর্বোচ্চ। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের (অপরিশোধিত তেল) মানদণ্ডমূল্য ১২০ ডলারের ওপরে লেনদেন হচ্ছে।
যুদ্ধের আগে তুলনায় জ্বালানির দাম ৪০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা তার দ্বিতীয় মেয়াদে রেকর্ড সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। এ সপ্তাহের শুরুতে প্রকাশিত রয়টার্স জরিপে এমনটি দেখা গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন মাত্র ২২ শতাংশ আমেরিকান।
রো খান্না দাবি করেন, জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রায় ৬৩১ বিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ প্রতি পরিবারে প্রায় ৫ হাজার ডলার বাড়বে।
তিনি হেগসেথকে বলেন, 'ইরানের একটি স্কুলে আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য আমরা কত ব্যয় করেছি, তা আপনি জানেন না। জ্বালানির জন্য আমরা কত দিচ্ছি, তাও জানেন না। খাদ্যের জন্য কত ব্যয় করছি, সেটাও জানেন না। আপনার ২৫ বিলিয়ন ডলারের হিসাব পুরোপুরি ভুল।'
হার্ভার্ডের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ লিন্ডা বিলমেস পূর্বাভাস দিয়েছেন, এই যুদ্ধের মোট ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের বাইরে যুদ্ধের আর কী কী খরচ আছে?
যুক্তরাষ্ট্র আগে দাবি করেছিল, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রথম ৩৯ দিনে তারা ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এরপর একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
বিষয়টি স্পষ্ট করতে বলা যায়, ইউক্রেনকে গত চার বছরে যতগুলো প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়া হয়েছে, ইরান যুদ্ধের প্রথম চার দিনেই যুক্তরাষ্ট্র তার চেয়ে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রে দাম ৪০ লাখ ডলার। অথচ এগুলো দিয়ে ভূপাতিত করা হয়েছে ইরানের মাত্র ৫০ হাজার ডলার মূল্যের (প্রতিটি) 'শাহেদ' ড্রোন।
তবে যুদ্ধের আর্থিক ব্যয় এবং প্রভাব কেবল বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ পুনর্গঠন এবং মেরামত করাও একটি বড় ব্যয়ের খাত।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরান শুরুতেই উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও দূতাবাসে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এই ইরানি হামলায় কুয়েতের মার্কিন সামরিক ক্যাম্পের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধফরা ও আল রুওয়াইস বিমানঘাঁটি, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চলতি মাসের শুরুতে এনবিসি নিউজ ছয়জন মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সরঞ্জামগুলোর যতটা ক্ষয়ক্ষতির কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয়েছে, বাস্তবে তা আরও অনেক বেশি ভয়াবহ। শুধু এই ক্ষতি মেরামতের পেছনেই কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে।
নিউইয়র্ক টাইমসের অন্য একটি প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছে, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর মেরামত করতেই ২০০ মিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হবে।
হেগসেথ অবশ্য এই হিসাবের মধ্যে মার্কিন ঘাঁটি মেরামতের খরচ অন্তর্ভুক্ত কি না, তা বলতে রাজি হননি। গত সপ্তাহে বাজেট ব্রিফিংয়ের সময় পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত কম্পট্রোলার জে হার্স্ট সাংবাদিকদের বলেন, বিদেশে মার্কিন স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আসলে কত, সে বিষয়ে ওয়াশিংটনের কাছে এখনো কোনো 'চূড়ান্ত সংখ্যা' নেই।
তিনি আরও যোগ করেন, ইরান যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মেরামতের ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিভাগটি এখনো মূল্যায়ন করছে যে ভবিষ্যতে তারা ঠিক কী ধরণের স্থাপনা নির্মাণ করতে চায়। হার্স্ট বলেন, 'এই নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের অংশীদাররাও হয়তো একটি অংশ বহন করবে।'
এদিকে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যদি উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্ররা তাদের নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি মেরামতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য দাবি করে, তবে ওয়াশিংটনের ব্যয়ের বোঝা আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।
যুদ্ধে লড়াই করা ছাড়া আর কীসের মূল্য দিতে হয়?
যুদ্ধের খরচ কি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তবে এর বাইরেও বিপুল ব্যয় জড়িত থাকে।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের পাবলিক ফিন্যান্সের অধ্যাপক লিন্ডা বিলমেস ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ধারণা দিয়েছিলেন, ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে। সে সময় জর্জ বুশ প্রশাসন মার্কিন জনগণকে জানিয়েছিল, যুদ্ধের খরচ হবে মাত্র ৫০ বিলিয়ন ডলার।
দুই দশক পর দেখা যায়, বিলমেসের পূর্বাভাসই সবচেয়ে কাছাকাছি ছিল। বর্তমানে ইরাক যুদ্ধের মোট ব্যয় প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার ধরা হলেও বিলমেসের মতে, প্রকৃত ব্যয় এর চেয়েও বেশি।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'যুদ্ধের খরচ সব সময়ই প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয়। ইতিহাস জুড়ে দেখা গেছে, যারা যুদ্ধে জড়ায় তারা ব্যয় ও সময়—দুটো ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত আশাবাদী থাকে।'
তিনি আরও বলেন, 'নির্দিষ্ট করে মোট খরচ নির্ধারণ করা কঠিন। তবে এখন পর্যন্ত যে তথ্য রয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে বর্তমান ইরান যুদ্ধের দৈনিক স্বল্পমেয়াদি প্রাথমিক ব্যয় প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার, যা মোট খরচের খুবই ছোট একটি অংশ মাত্র।'
স্বল্পমেয়াদি ব্যয়ের বাইরে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় ব্যয় সামনে আসে বলে উল্লেখ করেন বিলমেস। এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধফেরত সেনাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, এবং অস্ত্রভাণ্ডার আবারও পূরণ করা।
সবশেষে তিনি বলেন, 'আমি নিশ্চিত, ইরান যুদ্ধের মোট ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।'
