ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে মার্কিন রেস্তোরাঁর বিলে যুক্ত হচ্ছে ‘বাধ্যতামূলক বকশিশ’
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর আয়োজনকে এ যাবৎকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আসর বলা হচ্ছে। আর এর সাথে আরও এক নতুন খরচ এসে যোগ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি বিশ্বকাপ আয়োজক শহরের রেস্তোরাঁর মালিকরা বিদেশি দর্শকদের খাবারের বিলের সঙ্গে এবার বাধ্যতামূলকভাবে বকশিশ বা 'টিপস' যুক্ত করার কথা ভাবছেন। এর পেছনে কারণ হলো—বিশ্বের অনেক দেশের মানুষের মধ্যেই আমেরিকানদের মতো রেস্তোরাঁয় টিপস বা বকশিশ দেওয়ার কোনো অভ্যাস নেই।
ভালো হোক বা খারাপ, মার্কিন রেস্তোরাঁর কর্মীদের আয়ের এক বিশাল অংশ নির্ভর করে এই টিপসের ওপর। আমেরিকায় বেশির ভাগ সার্ভার বা খাবার পরিবেশনকারী এবং বারটেন্ডারদের মূলত ন্যূনতম মজুরির চেয়ে অনেক কম বেতন দেওয়া হয়, এবং তারা এই ঘাটতি মেটাতে ক্রেতাদের দেওয়া টিপসের ওপরই প্রায় সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করেন।
বিশ্বকাপের সময় লাখ লাখ আন্তর্জাতিক দর্শকের সমাগম হবে যুক্তরাষ্ট্রে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে বেশ কয়েকটি আয়োজক শহরের রেস্তোরাঁগুলো কর্মীদের পাওনা নিশ্চিত করার জন্য মূল বিলের সঙ্গেই টিপস বা বকশিশ যোগ করার পরিকল্পনা করছে।
বিশ্বকাপ দেখার জন্য ভক্তদের আগে থেকেই আকাশছোঁয়া দামের টিকিট, ফ্লাইট, হোটেল ভাড়া ও যাতায়াত খরচের চাপে দিশেহারা হওয়ার দশা হয়েছে; এর মধ্যে নতুন এই সিদ্ধান্ত তাদের ওপর বাড়তি চাপ হয়ে আসবে।
উদাহরণস্বরূপ, আটলান্টার একটি রেস্তোরাঁ 'টি'জ ব্রাঞ্চ বার' তাদের খাবারের বিলের সাথে আগে থেকে কেটে রাখা ১৮ শতাংশ টিপস বাড়িয়ে এবার ২০ শতাংশ করার কথা ভাবছে।
রেস্তোরাঁর মালিক তেনেশিয়া মারে বাটলার স্থানীয় একটি টিভি চ্যানেল 'ফক্স ফাইভ আটলান্টা'কে বলেন, "এখানে কোনো নির্দিষ্ট দেশের সংস্কৃতির বিষয় নয় বা এটাকে খারাপ কিছু বলারও নেই। অন্যান্য দেশে এই চলটি নেই বলে তারা টিপস দিতে অভ্যস্ত নয়। সে কারণে অনেকেই হয়তো এই ব্যাপারটি পছন্দ করবেন না।"
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য আয়োজক শহরের রেস্তোরাঁগুলোও একই ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে।
বোস্টনে বেশ কিছু ব্যবসায়ী প্রস্তাব দিয়েছেন যে ক্রেতাদের চূড়ান্ত বিলের সঙ্গে যেন ২০ শতাংশ বাধ্যতামূলক বকশিশ যোগ করা হয়। ম্যাসাচুসেটস রেস্তোরাঁ অ্যাসোসিয়েশনের বোর্ড মেম্বার এবং 'ড্যাভিওস' নামক এক ইতালীয় রেস্তোরাঁর মালিক স্টিভ ডিফিলিপ্পো 'এনবিসি টেন বোস্টন'-কে জানান যে, রেস্তোরাঁগুলো তাদের মেনু কার্ডে এই নীতির বিষয়ে বিস্তারিত লিখে দর্শকদের আগেভাগেই জানিয়ে দেবে।
তার মতে, কর্মীদের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই এই পদক্ষেপ খুবই জরুরি। তিনি ওই সম্প্রচারমাধ্যমকে আরও বলেন, "আমাদের সার্ভার এবং বারটেন্ডাররা এই শিল্পের প্রাণ। আমরা কখনোই চাই না যে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হোন।"
তবে এই নীতির সাথে সবাই একমত নন। ম্যান্সফিল্ডের 'জিমিস পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট'-এর মালিক জর্জ পান্টোস মনে করেন, বাধ্যতামূলক সার্ভিস চার্জ বা সেবামূল্য কেটে নেওয়ার পরিবর্তে রেস্তোরাঁয় নোটিশ টাঙিয়ে দিয়ে অতিথিদের টিপস দেওয়ার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়াটাই বেশি যৌক্তিক। তিনি ওই মাধ্যমটিকে জানান, "যদি সত্যিই আমরা এতটা ব্যস্ত থাকি যেমনটা আশা করছি, তবে এ বিষয়ে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।"
কানসাস সিটির অনেক রেস্তোরাঁর মালিকও কর্মীদের আয়ের সুরক্ষার জন্য এই বাধ্যতামূলক টিপসের নিয়ম চালুর দাবি করছেন। মিসৌরি রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক মাইক বারিস স্থানীয় পত্রিকা 'কানসাস সিটি বীকন'-কে বলেন, তারা শহরের সব রেস্তোরাঁকে এই ছয় সপ্তাহের টুর্নামেন্টে বাধ্যতামূলক টিপসের নীতি কার্যকর করার পরামর্শ দিয়েছেন।
বারিস বলেন, "যদি আমি নিজে একজন সার্ভার হতাম, আর একটা টেবিলে ৯০ মিনিট ধরে সেবা দেওয়ার পর কোনো টিপস না পেতাম—কারণ সে জানেই না যে এখানে টিপস দেওয়ার নিয়ম আছে, তাহলে আমার সত্যিই ভীষণ খারাপ লাগত।"
যদিও এই বাধ্যতামূলক টিপসের নীতিটি অস্থায়ী হতে পারে, তবুও এটি এমন একটা সময়ে চাপানো হচ্ছে, যখন স্থানীয় আমেরিকানরাই নানা অর্থনৈতিক চাপে পিষ্ট হয়ে আছেন।
খাদ্য গবেষণা সংস্থা টেকনোমিক-এর জ্যেষ্ঠ অধ্যক্ষ ডেভিড হেনকেস সংবাদমাধ্যম 'ফক্স নিউজ ডিজিটাল'-কে জানিয়েছেন যে, এই নিয়ম আয়োজক শহরগুলোতে থাকা স্থানীয় বাসিন্দাদের অস্বস্তি বা রাগের কারণ হতে পারে, যারা আগে থেকেই আর্থিক কষ্টে আছেন।
তিনি বলেন, "এমনিতেই রেস্তোরাঁয় মানুষের আনাগোনা কমে গেছে। এখন যদি দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে তা নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তো থেকেই যায়। বিশেষ করে এই নিয়মের বিষয়টি যদি ভালোভাবে সবাইকে আগে থেকে না জানানো হয়, বা ক্রেতাদের মনে হতে থাকে যে, স্বয়ংক্রিয় টিপসের পরও তাদের আরও কিছু বকশিশ হিসেবে দেওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।"
