ট্রাম্পের অবরোধ দীর্ঘায়িত করার খবরে ১২০ ডলার ছাড়াল তেলের দাম
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অবরোধ আরও দীর্ঘায়িত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন খবরের পর বিশ্ববাজারে বাড়ছে তেলের দাম।
বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে দাম ১২২ ডলারে ওঠে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ।
বিবিসি জানতে পেরেছে, এই সংঘাতের কারণে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর যাতে বেশি প্রভাব না পড়ে, তা নিয়ে আলোচনা করতে মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেছেন জ্বালানি খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা। তাদের মধ্যে শেভরনের প্রধান নির্বাহী মাইক ওয়ার্থও ছিলেন।
তেল ব্যবসায়ীরা এই বৈঠককে একটি বড় সংকেত হিসেবে দেখছেন। তাদের ধারণা, হরমুজ প্রণালি আরও অনেক দিন বন্ধ থাকতে যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, ওই বৈঠকে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদন, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং নৌ-চলাচল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, জ্বালানি খাতের নির্বাহীদের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের নিয়মিত বৈঠকের অংশ হিসেবেই এটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই বৈঠকের আগেই মার্কিন পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সহযোগীদের ইরানের ওপর চলমান অবরোধ আরও দীর্ঘায়িত করার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। মূলত ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতেই এই পদক্ষেপ নিচ্ছেন তিনি।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, মার্কিন অবরোধের জবাবে তারা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া অব্যাহত রাখবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তেলের দামে ব্যাপক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। সংঘাতের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কয়েক সপ্তাহ ধরেই কার্যত বন্ধ রয়েছে। সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।
চলতি মাসের শুরুতে তেহরান সতর্ক করে বলেছিল, কোনো জাহাজ প্রণালির কাছাকাছি এলেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয়, তাদের বাহিনী ইরানগামী বা ইরান থেকে আসা যেকোনো জাহাজ আটকে দেবে বা ফিরিয়ে দেবে। তবে বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরান থেকে ছেড়ে আসা অন্তত চারটি জাহাজ মার্কিন অবরোধ পেরিয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেলের দাম ওঠানামা করলেও, এটি এখনো যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অনেক বেশি।
গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। এরপর ১৭ এপ্রিল ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারে নেমে আসে। তবে এরপর থেকে মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকায় গত ১২ দিন ধরে তেলের দাম আবার ধীরে ধীরে বাড়ছে।
কুইল্টার-এর বিনিয়োগ কৌশলবিদ লিন্ডসে জেমস বলেন, যুক্তরাজ্যে এই যুদ্ধের প্রভাব এখন পর্যন্ত শুধু পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, 'সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ার মানে হলো—ভবিষ্যতে পণ্যের ঘাটতি দেখা দেওয়া এবং সব ধরনের জিনিসের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি।'
চরম সংকটে ইরানের অর্থনীতি
যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে। জিনিসপত্রের দাম দ্রুত বাড়ছে, মুদ্রার মান কমছে এবং তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মানও ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। গত সপ্তাহে ইরান সরকার জানিয়েছে, এই যুদ্ধের কারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ ইরানি তাদের চাকরি হারিয়েছে।
সংঘাত অবসানের আলোচনা কয়েক দিন ধরে থমকে থাকার পর বুধবার ট্রাম্প ইরানকে 'দ্রুত বুদ্ধিমানের মতো কাজ করে' একটি চুক্তিতে সই করার আহ্বান জানান।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, তেহরানকে চাপে ফেলতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সহযোগীদের দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের হাতে দুটি বিকল্প ছিল—হয় আবার বোমা হামলা শুরু করা, না হয় সংঘাত থেকে সরে আসা। কিন্তু এই দুই বিকল্পেই ঝুঁকি বেশি থাকায় তিনি অবরোধের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতি ও তেল রপ্তানির ওপর চাপ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।
অবশ্য মঙ্গলবার ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তারা বিকল্প বাণিজ্য রুট ব্যবহার করছেন, তাই এই অবরোধ তারা সামাল দিতে পারবেন।
বিশ্বব্যাংক মঙ্গলবার পূর্বাভাস দিয়েছে যে ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বাধাগুলো যদি মে মাসে শেষ হয়, তবে ২০২৬ সালে জ্বালানির দাম ২৪ শতাংশ বাড়বে। এটি হবে গত চার বছরে, অর্থাৎ রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর সর্বোচ্চ দাম।
এদিকে বুধবার ইউরোপের শেয়ারবাজারে দরপতন দেখা গেছে। দিন শেষে ১ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে যুক্তরাজ্যের শীর্ষ কোম্পানিগুলোর সূচক এফটিএসই ১০০ । ফ্রান্সের ক্যাক এবং জার্মানির ড্যাক্স সূচকও যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৩৯ এবং শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলো ঊর্ধ্বমুখী ছিল। যুদ্ধের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে তারা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
এক্সটিবি-এর গবেষণা পরিচালক ক্যাথলিন ব্রুকস বলেন, 'আর্থিক বাজারগুলোকে এখন এই দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের প্রভাব হিসাব করেই সামনে এগোতে হবে।'
