ইরানের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা, ৩৫ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে তেহরানের 'ছায়া ব্যাংকিং' খাতের সঙ্গে জড়িত ৩৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর মঙ্গলবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে চীনের সেই সব স্বতন্ত্র তেল শোধনাগারের (টিপট রিফাইনারি) সঙ্গে লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোকে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হয়েছে, যারা হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার জন্য ইরানকে টোল দিচ্ছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক দপ্তর (ওএফএসি) জানিয়েছে, এই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বের নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে কয়েক হাজার কোটি ডলার লেনদেনে সহায়তা করেছে এবং ইরানের কথিত সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নে ভূমিকা রেখেছে।
ওএফএসি ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, ইরান সরকারকে বা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের জন্য যারা অর্থ দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে লেনদেন করলে কঠোর নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে চীনের শানডং প্রদেশের স্বতন্ত্র শোধনাগারগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা ইরানি তেল আমদানি ও শোধনে জড়িত।
অভিযোগ রয়েছে, এদের কেউ কেউ মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবহার করে ডলারে লেনদেন করছে এবং মার্কিন পণ্য কিনছে। চীন অবশ্য এই একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে।
দুই মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টা বর্তমানে স্থবির হয়ে আছে। তেহরানের সাম্প্রতিক একটি প্রস্তাব নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অসন্তুষ্ট। ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সংঘাত বন্ধ এবং নৌ-চলাচল সংক্রান্ত বিরোধ না মেটা পর্যন্ত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা স্থগিত রাখা হবে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবারের এই নিষেধাজ্ঞা মূলত সেই সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যারা আইআরজিসিসহ ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। এর মাধ্যমে ইরান অবৈধভাবে তেল বিক্রির টাকা পায়, ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য সংবেদনশীল যন্ত্রাংশ কেনে এবং তাদের ছায়া বাহিনীগুলোর কাছে অর্থ পাচার করে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে বলেন, 'ইরানের ছায়া ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে। এটি এমন সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে যা বৈশ্বিক বাণিজ্যকে ব্যাহত করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, যারা এই নেটওয়ার্ককে সহায়তা করবে তাদের মারাত্মক পরিণতির মুখে পড়তে হবে।
১,০০০-এর বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ
ওএফএসি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত তারা ইরান-সংশ্লিষ্ট প্রায় ১,০০০ ব্যক্তি, জাহাজ ও বিমানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন ইরানি ব্যাংকগুলো 'রাহবার' নামক বেসরকারি কোম্পানির ওপর নির্ভর করে। এই কোম্পানিগুলো বিদেশে হাজার হাজার ভুয়া (শেল) কোম্পানি পরিচালনা করে ইরানের আমদানি ও রপ্তানির অর্থ লেনদেন নিশ্চিত করে।
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ফারাব সোরোশ আফাক কেশম কোম্পানি, যারা ইরানের 'শহর ব্যাংক'-এর সঙ্গে কাজ করে তেল বিক্রি করে। এছাড়া সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রিত 'ব্যাংক সিনা' এবং সামরিক বাহিনীর অর্থায়নকারী ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে যুক্ত 'ব্যাংক সেপাহ'-এর সহযোগী বেশ কিছু 'রাহবার' কোম্পানিকেও তালিকায় রাখা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে পাঁচটি চীনা শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অ্যানালিটিক্স ফার্ম কেপলার-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরান সমুদ্রপথে যে পরিমাণ তেল রপ্তানি করে, তার ৮০ শতাংশের বেশি কেনে চীন।
ওবিসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজারস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রেট এরিকসন মনে করেন, তেহরানকে টিকিয়ে রাখা চীনা ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত এই 'সর্বোচ্চ চাপ' প্রয়োগের কৌশল খুব একটা কাজে আসবে না।
