'কাজ না করলে অনাহারে মরব': বাংলাদেশি ও অন্য অভিবাসী কর্মীরা যেভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলকে সচল রাখতে জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন
উপসাগরীয় অঞ্চলে মিসাইল হামলার ঠিক পরের দিনই দুবাইয়ে এক বাংলাদেশি ডেলিভারি রাইডার তার মোটরসাইকেল নিয়ে কাজে বেরিয়ে পড়েন।
রাস্তাঘাট অন্য দিনের চেয়ে ফাঁকা থাকলেও, সেদিন তার বকশিশ জুটছিল বেশ ভালোই।
কিন্তু একই শহরে গত চার বছর ধরে দৈনিক ১২ ঘণ্টা কাজ করা আরেক পাকিস্তানি রাইডারের গল্পটা একটু ভিন্ন। ভয় থাকলেও কাজে বের হওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনো উপায় ছিল না।
সংবাদমাধ্যমকে ওই চালক বলেন, 'আমি এখানে টাকা রোজগার করতে এসেছি। তাই পরিস্থিতি যেমনই হোক, কাজ করাটা আমার জন্য এখন বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'অনেকেই ভয় পাচ্ছেন, কিন্তু আমাদের মতো রাইডারদের সাহস করে কাজ চালিয়ে যেতেই হয়। আমি প্রতিটি ডেলিভারির জন্য টাকা পাই। কাজ না করলে আমাকে হয়তো না খেয়েই থাকতে হবে।'
ইরানের মিসাইল হামলার মধ্যেও যারা উপসাগরীয় অঞ্চলকে সচল রেখেছেন, এই কর্মী সেই লাখ লাখ পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, চালক এবং নিরাপত্তারক্ষীদেরই একজন।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত চরম আকার ধারণ করার পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানি হামলায় অন্তত ১২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) এখন পর্যন্ত যত বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, তারা সবাই বাংলাদেশ, নেপাল বা পাকিস্তানের অভিবাসী কর্মী।
এই নিহতদের মধ্যে ৫৫ বছর বয়সী বাংলাদেশি সালেহ আহমেদও রয়েছেন। যুদ্ধের প্রথম দিন ইউএই-তে পানি সরবরাহের কাজ করার সময় তিনি প্রাণ হারান।
নিজেদের ভাগ্যেই ছাড়া অভিবাসী কর্মীরা
গালফ বা উপসাগরীয় অঞ্চলে মিসাইল হামলার এই ডামাডোলের মধ্যে বিশাল সংখ্যক অভিবাসী কর্মীকে তাদের নিজেদের ভাগ্যেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি মানবাধিকার সংস্থা। অথচ কাতার ও ইউএই-এর মতো দেশগুলোতে মোট জনসংখ্যার বড় অংশই এই অভিবাসী কর্মীরা।
মানবাধিকার সংস্থা ইক্যুইডেম-এর নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কাদরি এমইই-কে জানান, ইউএই, কাতার, সৌদি আরব এবং জর্ডানজুড়ে থাকা তাদের অভিবাসী কর্মী তদন্তকারীদের নেটওয়ার্ক ব্যাপক আতঙ্ক, মানসিক ট্রমা এবং সরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা থেকে এই কর্মীদের পদ্ধতিগতভাবে বাদ পড়ার বিষয়টি নথিবদ্ধ করেছে।
কাদরি বলেন, 'কর্মীরা যে-ই হোন না কেন পুরুষ বা নারী, যে দেশেরই হোন বা যে কাজই করুন না কেন, সবার মধ্যেই এক ধরনের সার্বজনীন ট্রমা, আতঙ্ক এবং উদ্বেগ কাজ করছে।'
কাদরি জানান, কর্মীরা দুই ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
প্রথমত, সরকারি নিরাপত্তা বার্তায় তাদের অন্তর্ভুক্ত না করা। যদিও কিছু আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে 'সকল বাসিন্দা'র কথা বলা হয়েছে, তবে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা বলছেন, তারা আশ্রয়কেন্দ্র, নিরাপদ সড়ক বা জরুরি সহায়তার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাননি।
দ্বিতীয়ত, কাঠামোগত বৈষম্য। গালফ সমাজের প্রতিটি খাতে যেমন নির্মাণ, আতিথেয়তা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, গৃহকর্ম এবং লজিস্টিকস এই কর্মীদের অপরিহার্য ধরা হয়। তাই হামলার মধ্যেও তাদের কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। অনেক সময় তারা বিপদের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার বদলে বরং বিপদের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছেন।
কাদরি বলেন, 'তুলনামূলকভাবে গরিব দেশগুলো থেকে কর্মী আনার ক্ষেত্রে সচেতনভাবেই একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারণ এসব কর্মীকে কম বেতন দেওয়া যায় এবং ওই দেশগুলোর সামাজিক কাঠামোতে তাদের জোরও কম থাকে। তারা কঠিন কাজগুলো করেন, কারণ তারা সহজে অভিযোগ করেন না বা নিরাপত্তার দাবি তোলেন না।'
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো ডেলিভারি রাইডার এবং অন্যান্য গিগ ইকোনমি কর্মীদের (যারা চুক্তিতে কাজ করেন) পরিস্থিতি। যখন তাদের ধনী গ্রাহকরা নিরাপদে বাড়িতে অবস্থান করছেন, তখন এই কর্মীরা রাস্তায় ঝুঁকি নিয়ে ঘুরছেন।
সংঘাত শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও বেশি সংখ্যক বাসিন্দা ডেলিভারি সেবার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য বাইরে যাওয়ার বদলে তারা ঘরের ভেতরে থাকাই নিরাপদ মনে করছেন।
'একের পর এক অর্ডার'
এমইই ইউএই-র বড় প্ল্যাটফর্মগুলোতে কাজ করা তিনজন ডেলিভারি রাইডারের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা সবাই জানিয়েছেন, কোনো নির্দেশনা, সহায়তা বা বিকল্প ছাড়াই তারা হামলার মধ্যেও কাজ চালিয়ে গেছেন।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কাজের চাপ বেড়েছে বলে জানান এই চালকরা। তবে চাকরি হারানোর ভয়ে তারা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।
দুই বছর ধরে একটি কোম্পানিতে কাজ করা এক বাংলাদেশি রাইডার জানান, প্রথম হামলার দিন রাস্তাঘাট একদম ফাঁকা ছিল। কিন্তু পরের দিনই তিনি ডেলিভারি দিতে বেরিয়ে পড়েন। তিনি জানান, গ্রাহকরা সেদিন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বকশিশ দিচ্ছিলেন।
আবুধাবিতে থাকা এক পাকিস্তানি রাইডার, যিনি পাঁচ বছর ধরে দেশটিতে আছেন, হামলার ঠিক পরের দিনগুলোকে 'বিরামহীন' বলে বর্ণনা করেছেন। স্থানীয় অনেক বাসিন্দা ঘর থেকে বের হতে না চাওয়ায় অর্ডারের বন্যা বয়ে যাচ্ছিল।
তিনি এমইই-কে বলেন, 'আমি দিন-রাত কাজ করেছি, শুধু অল্প কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম নিয়েছি।'
তার ধারণা, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি ছিল মাত্র ৭০ শতাংশ। তিনি সন্দেহ করেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে এই আশঙ্কায় মানুষ বেশি করে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অর্ডার করছিল।
দুবাইয়ে একই কোম্পানিতে চার বছর ধরে কাজ করা আরেক পাকিস্তানি রাইডার এমন এক ব্যবস্থার কথা জানান, যেখানে ভয় পাওয়ার কোনো সুযোগই নেই।
তিনি বন্ধুদের সঙ্গে একটি ভাড়া ঘরে থাকেন এবং ১২ ঘণ্টা ধরে কমিশনের ভিত্তিতে কাজ করেন। তিনি বলেন, কাজ থামানোর কোনো সুযোগ তার নেই।
'কোম্পানি শুধু আমার সম্পন্ন করা অর্ডারের জন্যই টাকা দেয়। আমি যদি কাজ না করি, তবে আমার কোনো আয় হবে না।'
যুদ্ধের চোখ ও কান হয়ে উঠছেন কর্মীরাই
হামলার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অভিবাসী কর্মীরাই এর প্রভাব নথিবদ্ধ করার প্রধান সাক্ষী হয়ে উঠছেন। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া হামলার ধ্বংসযজ্ঞের অনেক দৃশ্যই অভিবাসী কর্মীদের নিজেদের ফোনে ধারণ করা এবং শেয়ার করা।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে, হামলার পরের পরিস্থিতির ভিডিও ধারণ করার সময় ইরানি হামলার প্রশংসা করার অভিযোগে বাহরাইনে পাঁচজন পাকিস্তানি এবং একজন বাংলাদেশি কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কাদরি আশঙ্কা করছেন, আরও অনেক কর্মী হয়তো গ্রেপ্তার হতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ দমন-পীড়নের শিকার হতে পারেন। বিশেষ করে ইউএই-তে, যেখানে নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ঘটনার ভিডিও ধারণকারীদের কারাদণ্ড দেওয়ার লম্বা ইতিহাস রয়েছে।
কাদরি বলেন, 'এটি অনেকটা গাজার মতো, যেখানে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষরাই চোখ ও কান হয়ে ওঠে। এই কাজ করার জন্য তাদের শাস্তির মুখে পড়া উচিত নয়।'
সরকারগুলোর নিষ্ক্রিয়তা
এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে কর্মী পাঠানো দেশগুলোর যার মধ্যে রয়েছে নেপাল, কেনিয়া, ভারত, বাংলাদেশ এবং ইথিওপিয়া ইতিহাস। তাদের নাগরিকদের যথাযথ কনস্যুলার বা আইনি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই দেশগুলোর রেকর্ড বরাবরই দুর্বল।
দেশে থাকা পরিবার ও সমাজ তাদের সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চাপ দিলেও, কাদরি বলছেন, এখন পর্যন্ত সরকারগুলোর সাড়া খুবই হতাশাজনক।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটিগুলোতে কাজ করা কর্মীরা, যাদের অনেকেই নেপালি এবং নেপালের নিরপেক্ষতার কারণেই তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তারা বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে আছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
সাধারণত এমন ঘাঁটিতে ঝুঁকি বাড়লে পশ্চিমা নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার নিয়ম থাকে, কিন্তু জরুরি সেবাগুলো সচল রাখতে অভিবাসী কর্মীদের সেখানেই রেখে দেওয়া হয়।
কাদরি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র, যারা এই যুদ্ধ শুরু করেছে এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো যারা পরোক্ষভাবে এর সমর্থন দিচ্ছে, তাদের ওপর নিজেদের নাগরিকদের ওই অঞ্চল থেকে সরিয়ে আনার ব্যাপক রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। তাই ওইসব দেশের পক্ষ থেকে অভিবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কোনো চাপ নেই।'
বোধশূন্যতা
কাতারে শাহীন আবদুল্লাহ যখন তার বাড়ির কাছের মূল রাস্তায় উঠছিলেন, তখনই বিস্ফোরণ শুরু হয়। তিনি গাড়ি থামান। তখনও জ্বলতে থাকা একটি শ্রাপনেল (বোমার টুকরো) ঠিক তার সামনে এসে পড়ে। পেছনের গাড়িতে থাকা তার পরিবার সবকিছু দেখতে পায়।
তিনি মিডল ইস্ট আই-কে বলেন, 'আমার শুধু মনে হচ্ছিল, ইশ! ওরা যদি এটা না দেখত।'
তিনি পুলিশকে ফোন করেন। পুলিশ তাকে লাইনে অপেক্ষায় রেখে ঘটনাস্থলে পৌঁছে এলাকাটি ঘিরে ফেলে। তিনি বলেন, 'ওই মুহূর্তে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু পরে আর এ নিয়ে বেশি মাথা ঘামাইনি।'
তিনি বলেন, এই অনুভূতিহীনতা বা বোধশূন্যতাই এখন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দোহায় একটি দোকান চালান আবদুল্লাহ। তিনি এমন এক অভিবাসী সম্প্রদায়ের কথা জানান, যাদের সামনে যা ঘটছে তা মেনে নেওয়া এবং কাজ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। দোকান, রেস্তোরাঁ এবং ডেলিভারি সেবাগুলো কিছুতেই বন্ধ করা যাবে না।
তিনি বলেন, 'কেউ একদিনের জন্যও ছুটি নিতে পারে না।'
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ কীভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করছে, তার মধ্যে বিস্তর ফারাকও তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, 'সবাই দেখছে কীভাবে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু যাদের ফিরে যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই, তাদের মাথায় এই সরিয়ে নেওয়ার চিন্তা আসে না। তারা এর ব্যয়ভারও বহন করতে পারে না।'
যখন তার সম্প্রদায়ের ভেতরে সংঘাত নিয়ে আলোচনা হয়, আবদুল্লাহ বলেন, সেই আলোচনা খুব কমই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দিকে গড়ায়।
'আমাদের আলোচনা সুস্থতা বা নিরাপত্তা নিয়ে নয়। এগুলো রাজনৈতিক এবং অস্তিত্বের সংকট নিয়ে।'
তিনি বলেন, মানসিক ট্রমার কথা কেউ মুখে আনে না।
'মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবার সুযোগ নেই। এটি মূলত টিকে থাকার প্রস্তুতি এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কীভাবে তা সামাল দেওয়া যায়, তা নিয়ে। প্রতিদিন ১৫ মিনিট ধরে মাথার ওপর বোমার টুকরো পড়ার ভয় নিয়ে বেঁচে থাকার সঙ্গে মানুষ এখন আপস করে নিয়েছে।'