অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার সীমিত করতে যাচ্ছে তুরস্ক
অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার সীমিত করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে তুরস্ক। বয়স যাচাই, কনটেন্ট ফিল্টারিং এবং আপত্তিকর বিষয়বস্তু আটকে দেওয়ার মতো কঠোর ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে দেশটির সংসদীয় এক প্রতিবেদনে। এর মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে চাওয়া দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে তুরস্ক।
প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন একে পার্টি শিগগিরই এ বিষয়ে একটি খসড়া আইন সংসদে জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত মাসে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর পরিবার ও সমাজসেবা মন্ত্রী মাহিনুর ওজদেমির গোকতাস সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রস্তাবিত বিলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার বিধান থাকবে। পাশাপাশি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কনটেন্ট-ফিল্টারিং ব্যবস্থা চালু করতে বাধ্য করা হবে।
সংসদীয় কমিশনের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে একাধিক সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোনো নোটিশ ছাড়াই কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার ক্ষমতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ভিডিও গেম বা খেলনায় ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে কি না, তা নজরদারি করা।
গত ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করে। সেখানে টিকটক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে শিশুদের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
স্পেনও ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করতে চায়। শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় গ্রিস ও স্লোভেনিয়াও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নিচ্ছে। এ ছাড়া ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানিও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বিধিনিষেধ আরোপের কথা ভাবছে।
১৮ বছরের কম বয়সীদের ব্যবহৃত ডিভাইসে রাতে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের সুপারিশ
তুরস্কের সংসদীয় প্রতিবেদনে ১৮ বছরের কম বয়সীদের ব্যবহৃত ডিভাইসে রাতে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় বাধ্যতামূলক কনটেন্ট ফিল্টার এবং ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একে পার্টির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা ও সংসদের মানবাধিকার তদন্ত কমিটির সদস্য হারুন মের্তোগলু রয়টার্সকে বলেন, 'আমাদের শিশুদের নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে হবে। আমরা ডিজিটাল আসক্তিসহ সব ধরনের আসক্তি থেকে শিশুদের সুরক্ষা দিতে চাই।'
অনেক অভিভাবকও এই অবস্থানের সঙ্গে একমত। দোকানদার বেলমা কেসেসিওগ্লু জানান, তার ১০ বছর বয়সী সন্তান ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটায় এবং গেম খেলে।
তিনি বলেন, 'মনে হচ্ছে সব শিশুই সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত। আমরা এমনিতেই এটি নিয়ে সমস্যায় আছি, তার ওপর ক্ষতিকর কনটেন্ট পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলছে।'
তবে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো সতর্ক করে বলেছে, দুর্বল বয়স-যাচাই প্রযুক্তির কারণে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর নাও হতে পারে। এতে শিশুদের অনিয়ন্ত্রিত ও ঝুঁকিপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তুরস্ক ইতোমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে আসছে এবং দ্রুত কনটেন্ট সরিয়ে ফেলা বা প্রবেশাধিকার বন্ধের পদক্ষেপ নেয়। স্থানীয় সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএফওডি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে ১২ লাখ ওয়েব পেজ ও সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ব্লক বা বন্ধ অবস্থায় ছিল।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোম্পানিগুলোকে সরকারি বা ব্যবহারকারীদের অনুরোধ দুই দিনের মধ্যে কার্যকর করতে হয়, যা আইনি পর্যালোচনার সুযোগ খুব কম দেয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপারেটরদের অনুরোধ মানতে বাধ্য করা হয়। নিয়ম না মানলে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপন নিষেধাজ্ঞা, ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়া (ব্যান্ডউইথ রিডাকশন) এবং বৈশ্বিক আয়ের সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানার মুখে পড়তে পারে।
