মার্কিন এফ-৩৫ এর বদলে তুরস্কের 'কান' ফাইটার জেট কিনতে আগ্রহী স্পেন
স্পেন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত সামরিক জোট থেকে বের হয়ে বিকল্প পথ খুঁজছে। এরই অংশ হিসেবে তারা পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক স্টেলথ ফাইটার জেট 'কান' (Kaan) কিনতে তুরস্কের সাথে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে।
গত ৭ মে (২০২৬) স্পেনের প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইনফোডিফেন্সা এ খবর জানায়। তুরস্কের 'টার্কিশ অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ' বা টিএআই-এর সিইও মেহমেত দেমিরোগলুও একটি প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
স্পেনের পুরোনো 'হরনেট' ও 'হ্যারিয়ার' যুদ্ধবিমানগুলো ধীরে ধীরে সেকেলে হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ফিউচার কমব্যাট এয়ার সিস্টেম প্রকল্পেও বারবার দেরি হচ্ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৩৫ কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত শর্ত আর সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণের বেড়াজালে আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় স্পেন এখন অনেকটাই বিরক্ত। মূলত এ কারণেই তারা তুরস্কের কানের দিকে ঝুঁকছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তুরস্কের এই 'কান' শুধু পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক সুবিধাই দিচ্ছে না, বরং এটিকে একটি 'স্বাধীন' সামরিক ব্যবস্থা হিসেবেও তৈরি করা হচ্ছে। এতে ক্রেতা দেশগুলোর নিজস্ব মিশন সফটওয়্যার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থা এবং মেইনটেন্যান্স বা রক্ষণাবেক্ষণের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে, যা এফ-৩৫ এর ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।
এফ-৩৫ এখনও পর্যন্ত অনেক বেশি পরীক্ষিত এবং উন্নত প্রযুক্তির হলেও, স্পেন এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোর কাছে এখন নিজেদের সফটওয়্যারের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পের স্বাধীনতাটাই অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্পেন কেন কানের প্রতি আগ্রহী?
এফ-৩৫-এর বদলে কানকে বেছে নেওয়ার পেছনে স্পেনের প্রধান যুক্তি হলো—স্বাধীনতা। কানের সফটওয়্যার, মেইনটেন্যান্স এবং অন্যান্য সিস্টেমে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশের আগাম অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা অনেক কম।
এর আগে, স্পেনের ৪৩টি টার্কিশ 'হুরজেট' কেনার জন্য ৩১২ কোটি ইউরোর (প্রায় ৩৩,৫০০ কোটি টাকা) একটি চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তিতে এয়ারবাস এস্পানিয়া মিশন কম্পিউটার যুক্ত করার দায়িত্ব পেয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে, তুরস্কের সাথে স্পেনের বিমান সহযোগিতা এরই মধ্যে বেশ এগিয়েছে।
স্পেনের বর্তমানে প্রায় ৭০টি পুরোনো 'ইএফ-১৮এ/বি হরনেট' ফাইটার রয়েছে, যা ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে কেনা হয়েছিল। এসব বিমান প্রায় ৮ হাজার ঘণ্টার বেশি উড্ডয়নের রেকর্ড ছুঁয়েছে, যা সেকেলে হয়ে পড়ছে।
যদিও তারা আরও কিছু ইউরোফাইটার কিনেছিল, তবে ইউরোপীয় এফসিএএস প্রকল্প ২০৪০ সালের আগে মাঠে নামার সম্ভাবনা কম।
ফলে, আগামী ১০-১৫ বছর স্পেনের বিমানবাহিনীতে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শুরুতে স্পেন এই শূন্যতা মেটাতে এফ-৩৫এ কেনার কথা ভাবলেও পরবর্তীতে নিজস্ব সফটওয়্যারের ওপর স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় এফ-৩৫-এর প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যায়।
স্প্যানিশ নৌবাহিনীর বাধ্যবাধকতা এবং এফ-৩৫বি-এর ওপর নির্ভরতা তবে স্পেনের নৌবাহিনীর জন্য সমীকরণটি একটু ভিন্ন। তাদের বর্তমানে ১২ থেকে ১৩টি এভি-৮বি প্লাস হ্যারিয়ার টু রয়েছে। এগুলো জুয়ান কার্লোস আই অ্যামফিবিয়াস অ্যাসল্ট শিপ থেকে উড্ডয়ন করে।
জাহাজটিতে ক্যাটাপল্ট লঞ্চ সিস্টেম নেই, ফলে এই জাহাজে কেবলমাত্র ছোট জায়গায় উড্ডয়ন করতে পারে এমন স্টোভেল (STOVL) ফাইটারই প্রয়োজন। আর এই মুহূর্তে বিশ্বে এফ-৩৫বি হলো একমাত্র পঞ্চম প্রজন্মের স্টোভেল ফাইটার, যা কার্যকর।
কান বা এফসিএএস এর কোনো স্টোভেল সংস্করণ এখনও বাজারে নেই। ফলে, নৌবাহিনীর কথা চিন্তা করলে এফ-৩৫বি ছাড়া স্পেনের সামনে মাত্র তিনটি পথ থাকে: হয় নৌবাহিনীর যুদ্ধবিমান ব্যবহার বন্ধ করা, নয়তো এফ-৩৫বি কেনা, আর তা নাহলে একটি বড় আকারের যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী কেনা।
রাজনৈতিকভাবে এফ-৩৫-এর প্রতি স্পেনের নেতিবাচক মনোভাবের কারণ হলো, বিমানটির সমস্ত সফটওয়্যার, মেইনটেন্যান্স এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা আমেরিকার নিয়ন্ত্রণাধীন।
তবে কানের ক্ষেত্রে স্পেনের সামনে একটি সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। তুরস্ক কান তৈরি করেছে এমনভাবে যাতে দেশীয় ডাটালিঙ্ক, সফটওয়্যার এবং নিজেদের দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীনতা থাকে। অর্থাৎ, স্পেন চাইলে কানের সাহায্যে নিজেদের মতো করে সামরিক প্রযুক্তি সাজিয়ে নিতে পারবে।
কানের সুবিধা ও অসুবিধা
কানের প্রধান সুবিধাগুলো হলো—এতে নিজেদের মতো ডাটালিঙ্ক, সফটওয়্যার ও অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তি যুক্ত করার অবাধ সুযোগ থাকে, যা এফ-৩৫ এর মতো আমেরিকার প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমায়।
তবে কানের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো এটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
তুরস্ক আশা করছে ২০২৯ সাল নাগাদ এই যুদ্ধবিমান পুরোপুরি অপারেশনের জন্য প্রস্তুত হবে, কিন্তু এটি সফল হওয়ার জন্য এর নিজস্ব ইঞ্জিন এবং অন্যান্য সিস্টেমে অনেক উন্নতি করতে হবে।
বর্তমানে কানে আমেরিকার তৈরি ইঞ্জিন ব্যবহার করা হচ্ছে, তাই ভবিষ্যতেও যদি তুরস্ক নিজেদের দেশে ইঞ্জিন তৈরি করতে না পারে, তবে এটি আমেরিকা-নির্ভর হয়ে পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে এফ-৩৫ বিশ্বের ১৫টি দেশে হাজারেরও বেশি সংখ্যায় ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এটি এর উন্নত প্রযুক্তির জন্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত।
সব মিলিয়ে এফ-৩৫-এর প্রযুক্তি উন্নত হলেও স্পেনের কাছে প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা এবং নিজেদের শিল্পের স্বাধীনতার কারণেই তুরস্কের কানের দিকে তাদের আকর্ষণ বাড়ছে। তবে ইঞ্জিনের প্রযুক্তি এবং কানের উন্নয়নের গতি দেখে স্পেনকে শেষ পর্যন্ত একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
