গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলাম লিবিয়ায় নিহত
লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির সবচেয়ে প্রভাবশালী ছেলে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি লিবিয়ায় নিহত হয়েছেন বলে দেশটির কর্মকর্তারা ও স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফির আইনজীবী খালেদ আল-জাইদি এবং তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ওসমান মঙ্গলবার ফেসবুকে পৃথক পোস্টে ৫৩ বছর বয়সী এই নেতার মৃত্যুর খবর জানান। তবে তারা সাইফের মৃত্যু সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি।
লিবিয়ার সংবাদমাধ্যম ফাওয়াসেল মিডিয়া আবদুল্লাহ ওসমানের বরাতে জানায়, সশস্ত্র ব্যক্তিরা জিনতান শহরে তার নিজ বাড়িতে ঢুকে সাইফকে হত্যা করে। জিনতান শহরটি রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় ১৩৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত।
পরে রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, 'চারজন মুখোশধারী ব্যক্তি' সাইফের বাড়িতে ঢুকে এক 'কাপুরুষোচিত ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক হত্যাকাণ্ডের' মাধ্যমে তাকে হত্যা করেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তিনি হামলাকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। হামলাকারীরা তাদের 'জঘন্য অপরাধের আলামত গোপন করার মরিয়া চেষ্টা হিসেবে' বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরা বন্ধ করে দিয়েছিল।
ত্রিপোলিভিত্তিক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি সংস্থা হাই স্টেট কাউন্সিলের সাবেক প্রধান খালেদ আল-মিশরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে এই হত্যাকাণ্ডের 'জরুরি ও স্বচ্ছ তদন্তের' আহ্বান জানান।
লিবিয়ায় সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফির কখনো কোনো আনুষ্ঠানিক পদ ছিল না। তবে ২০০০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তাকে তার বাবার কার্যত ডান হাত হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ২০১১ সালে লিবিয়ার বিরোধী বাহিনীর হাতে মুয়াম্মার গাদ্দাফি নিহত হলে তার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে।
২০১১ সালে বিরোধীদের হাতে ত্রিপোলির নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার পর দেশ ছাড়ার চেষ্টা করার সময় সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফিকে জিনতানে আটক করে কারাবন্দি করা হয়।
২০১৭ সালে সাধারণ ক্ষমার আওতায় তিনি মুক্তি পান এবং এরপর থেকে জিনতানেই বসবাস করছিলেন।
উত্তরাধিকারী হিসেবে পরিচিত
১৯৭২ সালের জুনে ত্রিপোলিতে জন্ম নেওয়া সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি ছিলেন লিবিয়ার দীর্ঘদিনের শাসকের দ্বিতীয় সন্তান।
পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ও সাবলীল বক্তা সাইফ আল-ইসলাম তার বাবার দমনমূলক শাসনের তুলনায় তুলনামূলক প্রগতিশীল মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০০০ সালের শুরুর দিকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে লিবিয়ার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তিনি গণবিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগ নিয়ে আলোচনার নেতৃত্ব দেন এবং ১৯৮৮ সালে স্কটল্যান্ডের লকারবির ওপর প্যান অ্যাম ফ্লাইট ১০৩ বিস্ফোরণে নিহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ নিয়ে দরকষাকষি করেন।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে পড়াশোনা করা এবং ইংরেজিতে দক্ষ সাইফ আল-ইসলাম নিজেকে একজন সংস্কারক হিসেবে তুলে ধরতেন। তিনি সংবিধান প্রণয়ন ও মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান জানাতেন। তার গবেষণাপত্রে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কারে নাগরিক সমাজের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
তবে ২০১১ সালে তার বাবার দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হলে তিনি পারিবারিক ও গোত্রগত আনুগত্য বেছে নেন। তিনি বিরোধীদের বিরুদ্ধে নৃশংস দমন-পীড়নের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হয়ে ওঠেন এবং আন্দোলনকারীদের 'ইঁদুর' বলে আখ্যা দেন।
২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'আমরা লিবিয়াতেই লড়ব, লিবিয়াতেই মরব।'
তিনি হুঁশিয়ারি দেন, রক্তের নদী বইবে এবং সরকার শেষ পুরুষ, নারী ও গুলি পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, 'পুরো লিবিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে। দেশ কীভাবে চলবে, সে বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে আমাদের ৪০ বছর লাগবে। কারণ আজ সবাই প্রেসিডেন্ট বা আমির হতে চাইবে এবং সবাই দেশ চালাতে চাইবে।'
সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফির বিরুদ্ধে তার বাবার শাসনামলে বিরোধীদের ওপর নির্যাতন ও চরম সহিংসতার অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তার বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ২০১১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তাকে খুঁজছিল।
বিদ্রোহীরা ত্রিপোলির দখল নেওয়ার পর তিনি বেদুইন উপজাতীয় বেশে প্রতিবেশী নাইজারে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে মরুভূমির এক সড়কে আবু বকর সাদিক ব্রিগেড মিলিশিয়া তাকে আটক করে এবং বিমানযোগে জিনতানে নিয়ে যায়।
আইসিসি-র সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর লিবিয়ার কর্মকর্তাদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে তার বিচার করার অনুমতি দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে ত্রিপোলির একটি আদালত তার অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে।
২০১৭ সালে মুক্তির পর তিনি গুপ্তহত্যার আশঙ্কায় দীর্ঘ সময় ধরে জিনতানে আত্মগোপনে ছিলেন।
২০২১ সালের নভেম্বরে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। এই সিদ্ধান্ত পশ্চিম ও পূর্ব লিবিয়ার গাদ্দাফিবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
সে বছর নির্বাচন নিয়ে কোনো স্পষ্ট নিয়মে ঐকমত্য না হওয়ায় তার প্রার্থিতা বড় ধরনের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ২০১৫ সালের দণ্ডের কারণে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। তবে তিনি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে গেলে সশস্ত্র যোদ্ধারা আদালত ঘিরে ফেলে।
এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা লিবিয়ার নির্বাচন প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ ছিল।
