মা হওয়ার কারণে হারান চাকরি: ৭ বছরের দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে নারী কর্মীর জয়
২০১৯ সালের শুরুর দিকে ফিরোজা আক্তার যখন গর্ভবতী হলেন, তিনি ভেবেছিলেন তাঁর এখন বিশ্রাম, চিকিৎসা আর মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রয়োজন হবে। কিন্তু বিশ্রামের বদলে তাঁকে নামতে হয়েছিল নিজের চাকরি বাঁচানোর এক অসম লড়াইয়ে।
ফিরোজা আক্তার তখন টিকে ফুটওয়্যার লিমিটেড-এ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর ডিউটি ছিল সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। তাঁর অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ যখনই তাঁর গর্ভাবস্থার কথা জানতে পারে, তখন থেকেই কর্মস্থলের পরিবেশ বদলে যেতে শুরু করে।
ফিরোজা জানান, অন্তঃসত্ত্বা হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় কাজ করার জন্য চাপ দেওয়া হতো। শারীরিক অবস্থা উল্লেখ করে তিনি যখন বাড়তি সময় কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান, তখন কোম্পানি তাঁকে কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ পাঠায়। এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ আইনি লড়াই, যা প্রায় সাত বছর ধরে চলেছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের দ্বিতীয় শ্রম আদালত ফিরোজার পক্ষে রায় দিয়েছেন। আদালত নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাঁকে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে এবং ২০১৯ সাল থেকে তাঁর সমস্ত বকেয়া বেতন ও মাতৃত্বকালীন সুবিধাদি পরিশোধ করতে হবে।
শ্রম অধিকার কর্মীদের মতে, এই রায় কেবল একজন ব্যক্তির জয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশের কর্মজীবী নারীদের একটি গভীর সংকটের ওপর আলো ফেলেছে। আইনি সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও— এ দেশে গর্ভাবস্থাকে কেন্দ্র করে নারীদের বৈষম্য, হয়রানি বা চাকরিচ্যুতির শিকার হতে হয়।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে ফিরোজা বলেন, "শুধুমাত্র মা হওয়ার কারণে আমাকে বেআইনিভাবে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মা হওয়া কোনো অপরাধ নয়, এটি একজন নারীর অধিকার। মাতৃত্বকালীন ছুটিও কর্মজীবী নারীর প্রাপ্য। কিন্তু অনেক নিয়োগকর্তা নানা অজুহাতে নারী কর্মীদের ছাঁটাই করে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন।"
নার্স থেকে বিচারপ্রার্থী
আদালতের নথি অনুযায়ী, ফিরোজা ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর টিকে ফুটওয়্যারে নার্স হিসেবে যোগদান করেন। ২০১৯ সালের ২০ মার্চ কোম্পানিটি তাঁর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। তিনি লিখিত জবাব দিলেও কর্তৃপক্ষ তাঁকে দ্বিতীয়বার নোটিশ দেয় এবং শেষ পর্যন্ত 'অসদাচরণ'-এর অভিযোগে চাকরিচ্যুত করে।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর সহায়তায় তিনি এই ছাঁটাইকে চ্যালেঞ্জ করে চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে মামলা করেন। দীর্ঘ শুনানির পর গত ২২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের দ্বিতীয় শ্রম আদালতের বিচারক বেগম জেবুন্নেছা তাঁকে চাকরিতে পুনর্বহালসহ বকেয়া বেতন ও মাতৃত্বকালীন সুবিধাদি পরিশোধের আদেশ দেন। গত ৭ মে ফিরোজা রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি হাতে পান।
ফিরোজা জানান, এই লড়াই কেবল বেতনের জন্য ছিল না। "আমার আর্থিক অবস্থা এমন ছিল না যে এই বেতনেই আমাকে চলতে হবে। আমার লড়াই ছিল মূলত একজন মায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং অন্যদের জন্য উদাহরণ তৈরি করার জন্য।"
শ্রম আদালতের দীর্ঘসূত্রতা
এই মামলাটি বাংলাদেশের শ্রম আদালতের দীর্ঘসূত্রতার চিত্রটিও সামনে এনেছে। শ্রম আইন অনুযায়ী, ৬০ দিনের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার কথা এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে আরও ৯০ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু ফিরোজার এই মামলার রায় পেতে সময় লেগেছে প্রায় সাত বছর।
শ্রম অধিকার কর্মীদের মতে, এ ধরণের দীর্ঘসূত্রতা শ্রমিকদের ন্যায়বিচার পেতে নিরুৎসাহিত করে, বিশেষ করে কারখানাগুলোতে কর্মরত নিম্ন আয়ের নারীদের জন্য এটি অত্যন্ত কঠিন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-এর কোঅর্ডিনেটর ফজলুল কবির মিন্টু এই রায়কে গর্ভাবস্থায় বৈষম্যের শিকার নারী কর্মীদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, "আমরা আইনি পরামর্শ প্রদান এবং কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দিতে সহায়তা করার মাধ্যমে পুরো আইনি প্রক্রিয়াজুড়ে ওই নারী কর্মীর পাশে ছিলাম।"
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, কোম্পানি যদি উচ্চ আদালতে আপিল বা রিট করে, তবে আইনি প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হতে পারে।
মাতৃত্বকালীন অধিকার নিয়ে উদ্বেগ
শ্রম অধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, বাংলাদেশের শিল্প খাতে গর্ভাবস্থা সংক্রান্ত বৈষম্যের অনেক ঘটনাই অপ্রকাশিত থেকে যায়। বিশেষ করে কারখানাগুলোতে অনেক নারী রুটিরুজি হারানোর ভয় বা 'ব্ল্যাকলিস্টেড' হওয়ার আতঙ্কে নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে মুখ খোলেন না।
বাংলাদেশের শ্রম আইনে মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও সুরক্ষার কথা বলা থাকলেও— অনেক ছোট কারখানা বা সাব-কন্ট্রাক্টিং ইউনিটে এর প্রয়োগ খুবই দুর্বল।
তবে ফিরোজার কাছে এই জয় কেবল একটি আইনি রায় নয়।
দীর্ঘ সাত বছরের শুনানি, নোটিশ আদান-প্রদান আর আদালতে হাজিরা শেষে তিনি মনে করেন, এই রায় একটি শক্ত বার্তা দিচ্ছে যে—মাতৃত্ব কখনোই কোনো নারীর জীবিকা হারানোর কারণ হতে পারে না।
