পোষা কুকুরদের 'ডে আউট': দেশে প্রথম কুকুর নিয়ে হাঁটার অনুমতি দিল গুলশানের পার্ক
সকালের জগিং বা হাঁটাচলার ব্যস্ততা যখন শেষ, তখন গুলশানের পার্কজুড়ে সাধারণত একটি শান্ত পরিবেশ বিরাজ করে। তবে আজকাল গুলশান সোসাইটি লেক পার্কের ৬০ নম্বর সড়কের গেটের কাছে এমন এক দৃশ্য চোখে পড়ে, যা ঢাকার মানুষের কাছে একেবারে অচেনা।
একে একে পার্কে হাজির হচ্ছেন কুকুরপ্রেমীরা। কেউ নিয়ে এসেছেন লাফালাফি করা চঞ্চল গোল্ডেন রিট্রিভার, আবার কেউ সঙ্গে করে এনেছেন একদম শান্তশিষ্ট ছোট কোনো কুকুর।
এতকাল ঢাকার পার্কগুলোতে কুকুর নিয়ে ঢোকাটা বলতে গেলে পুরোপুরি নিষেধ ছিল। তবে গুলশান সোসাইটি এবং প্যাম্পারড পজ বাংলাদেশ যৌথভাবে এই নতুন উদ্যোগ নিয়েছে।
নিবন্ধিত কুকুরগুলো এখন নির্দিষ্ট সময়ে পার্কের ভেতর হাঁটার সুযোগ পাচ্ছে। এমনভাবে এই নিয়মটি করা হয়েছে, যাতে নিয়মিত পার্ক দর্শনার্থীদের কোনো সমস্যা না হয়, আবার পোষা প্রাণী এবং তাদের মালিকেরাও কিছুটা স্বস্তির শ্বাস ফেলতে পারেন।
দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় কুকুর নিয়ে একটু নিশ্চিন্তে হাঁটার জন্য খোলা কোনো জায়গা ছিল না। কুকুরগুলো পার্কের অন্যান্য দর্শনার্থীদের জন্য ভীতির কারণ হতে পারে—মূলত এই আশঙ্কায় পাবলিক পার্কগুলোতে এদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। নতুন এই উদ্যোগটি সাধারণ দর্শনার্থীদের এই উদ্বেগকে সম্মান করেই কুকুরদের জন্য এই উন্মুক্ত জায়গাটি খুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এ বিষয়ে গুলশান সোসাইটির সভাপতি ওমর সাদাত বলেন, 'আমাদের দেশের কোনো পার্কেই কুকুর নিয়ে ঢোকার নিয়ম নেই। সাধারণ মানুষের মধ্যেও কুকুর নিয়ে সব সময়ই একটা আপত্তি ছিল। তাই আমরা এই ব্যাপারটা খেয়াল রেখেছি যাতে কোনো সাধারণ মানুষ আমাদের কারণে বিরক্ত না হয়।'
এই উদ্দেশ্য থেকেই মূলত একটি বিশেষ সময়সূচি ঠিক করা হয়েছে। দেখা গেছে, পার্কে সকাল এবং বিকেলবেলা সবচেয়ে বেশি ভিড় থাকে। তাই সেই সময়টা বাদ দিয়ে, অপেক্ষাকৃত নীরব সময়গুলো বেছে নেওয়া হয়েছে। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা এবং রাত ১০টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কুকুর হাঁটার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
উদ্যোক্তারা আশা করছেন, এতে করে দর্শনার্থীদের সঙ্গে কুকুর ও তাদের মালিকদের সময় নিয়ে কোনো বিরোধ তৈরি হবে না। এছাড়া, শুক্র এবং শনিবার যখন দর্শনার্থীদের সংখ্যা একটু বেশি থাকে, সে কথা ভেবে ওই দুদিন দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আরেকটি অতিরিক্ত সময়সূচি দেওয়া হয়েছে।
ওমর সাদাত আরও বলেন, 'আমরা আমাদের পার্কের দর্শনার্থীদের খুবই শ্রদ্ধা করি। কিন্তু দেখুন, আমাদের দেশে আমরা আমাদের পোষ্যদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টা একদম ভুলেই গেছি। বিশ্বের অনেক দেশেই পার্কগুলোতে কুকুরের প্রবেশ নিষিদ্ধ নয়। আমরা তাই চেয়েছিলাম এই 'ডগ ওয়াকিং ক্লাব'টিকে উৎসাহ দিতে, কিন্তু সাথে ভারসাম্যও রাখতে।'
কুকুর নিয়ে পার্ক প্রবেশের জন্য কিছু কড়া নিয়ম মানতে হয়। কেবল নিবন্ধিত বা রেজিস্ট্রেশন করা ক্লাবের সদস্যরাই শুধু ৬০ নম্বর সড়কের গেট দিয়ে কুকুরের সাথে প্রবেশ করতে পারেন। ঢোকার সময় নিরাপত্তারক্ষীরা পরিচয়পত্র পরীক্ষা করেন।
শুধু যেসব কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যাদের রেজিস্ট্রেশন আছে এবং যারা বাইরের মানুষের সামনে শান্তভাবে থাকতে অভ্যস্ত, কেবল তাদেরই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তাছাড়া কুকুরের গলায় সব সময় 'লিশ' পরিয়ে রাখাটা বাধ্যতামূলক।
এই নিয়মের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে গিয়ে সাদাত জানান, 'পার্কে ঢুকতে গেলে আপনাকে অবশ্যই রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। আমরা যাচাই করে দেখি কুকুরের ঠিকঠাক টিকা দেওয়া আছে কি না। এর বাইরে, মালিকদের বর্জ্যের ব্যাগ, গ্লাভস আর পরিষ্কার করার সামগ্রী দিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা নিজেদের কুকুরের বর্জ্য নিজেরাই পরিষ্কার করতে পারেন।'
এই ক্লাবের মাসিক চাঁদা এক হাজার ৫০০ টাকা। কেউ চাইলে তিন, ছয় অথবা বার্ষিক সদস্য পদও গ্রহণ করতে পারেন, তবে টাকাটা আগেই দিতে হবে। উদ্যোক্তাদের মতে, এই ফি মূলত পার্কের রক্ষণাবেক্ষণের কাজেই ব্যয় হবে।
পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে শুরুতেই দারুণ সাড়া মিলেছে।
সাদাত বলেন, 'আপনাদের শুনে অবাক লাগতে পারে যে মানুষ শুধু ঢাকার অন্য এলাকা থেকে নয়, একেবারে নারায়ণগঞ্জ থেকে এসে এখানে তাদের কুকুরকে হাঁটাচ্ছে! এর থেকেই বোঝা যায় যে এই পার্কের কতটা প্রয়োজন ছিল।'
নতুন এই সুযোগ পেয়ে 'ডগ প্যারেন্ট'রা যারপরনাই খুশি।
প্যাম্পারড পজ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা অহনা রহমান সোশ্যাল মিডিয়ায় তার আনন্দ শেয়ার করে লিখেছেন: 'অবশেষে আমাদের আদরের চার পেয়ে বন্ধুদের জন্য পার্ক খুলে দেওয়া হয়েছে! ইয়ে! গুলশান সোসাইটি লেক পার্কে আমরা দারুণ রিল্যাক্স বা আরাম করে একটা ওয়াক সেরে এলাম। আজকে আমাদের প্রথম দিন ছিল, আর অভিজ্ঞতাটা এক কথায় অসাধারণ! আমরা কাউকে বিরক্ত করিনি, আর কেউ আমাদেরও বিরক্ত করেনি।'
অনেক মালিকের কাছে এই উদ্যোগ শুধু হাঁটার সুযোগ নয়, এটি শহরের উন্মুক্ত জায়গায় তাদের প্রাণীদের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার সমান।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, যাদের কুকুর নেই, তারাও এই উদ্যোগকে সমর্থন জানাচ্ছেন!
গুলশানের নিয়মিত দর্শনার্থী আবৃতি বোসাক পার্কের সেই দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, 'আমি ডায়াবেটিসের রোগী, তাই নিয়মিত হাঁটি। প্রথম যখন এখানে কুকুর নিয়ে লোকজনকে দেখলাম, আমি চমকে উঠেছিলাম আবার মজাও লাগছিল। সত্যি বলতে, তাদের ওইভাবে হাঁটাতে দেখতে দারুণ লাগছিল।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'এর আগে তো বেচারাগুলোর জন্য এমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এখন হয়েছে, এটাই বড় কথা। তারা কিন্তু আমাদের হাঁটার পথে কোনো সমস্যা করছে না। আমরা আমাদের পথে চলছি, আর ওরা ওদের পথে।'
শুরুতে পার্কের স্টাফ গালিবুর রহমানের ভয় ছিল যে কুকুরেরা বোধ হয় সবকিছু নোংরা করে ফেলবে। কিন্তু তিনি যখন দেখেন কুকুরগুলো শেকল দিয়ে সুন্দর করে বাঁধা আর মালিকেরা নিজেদের দায়িত্বেই সবকিছু পরিষ্কার করছেন, তখন তার সব দুশ্চিন্তা কেটে যায়। তিনি বলেন, 'সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো, কুকুরের মালিকেরা কুকুরগুলোর ময়লা নিজেই পরিষ্কার করে ফেলেন।'
বনানীর বাসিন্দা সাইমা হক মনে করেন, এ রকম উদ্যোগ সারা শহরে ছড়িয়ে পড়া উচিত। তিনি বলেন, 'আমি মাত্র জানলাম গুলশানে এমন সুবিধা রয়েছে। আমারও একটা কুকুর আছে, আর আমি এখনই এই ক্লাবে যোগ দিতে চাই। দেশের অন্য কোথাও এই সুযোগ নেই। আমি তো মনে করি এই সুন্দর ব্যবস্থা পুরো শহরে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।'
এই উদ্যোগটির আন্তর্জাতিক একটা আবেদনও আছে। গুলশান এলাকাটিতে এমনিতেই অনেক বিদেশি থাকেন। এতদিন তাদের পোষা প্রাণীর জন্য এমন ভালো কোনো জায়গা ছিল না।
মামুন আহমেদ নামে এক নিয়মিত জগিং করা ব্যক্তি বলেন, 'এখানে তো শুধু বাংলাদেশিরা আসেন না, অনেক বিদেশিও থাকেন। তারা যেহেতু এমন পরিবেশ চান, এই ব্যবস্থা আমাদের শহরটার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করবে।'
মূলত এমন দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এই উদ্যোগটির জন্ম।
ওমর সাদাত বলেন, 'যাদের ঘরে এমন প্রাণী আছে, তারা জানে এরা তো আমাদের বাচ্চাদের মতোই। মানুষের আর প্রাণীর মধ্যে এই সম্পর্ক তো আজকালের নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে। আমাদের শুধু শিখতে হবে কীভাবে মানুষ আর প্রাণী একসাথে ভালোভাবে থাকতে পারে।'
পাশাপাশি তিনি এই বিষয়টি নিয়েও সতর্ক রয়েছেন, যেন যারা কুকুর দেখলে ভয় পান বা অস্বস্তি বোধ করেন, তাদের কোনো অসুবিধা না হয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'আমরা অবশ্যই তাদের আপত্তির প্রতি সম্মান জানাই। কাউকে কষ্ট না দিয়ে আমরা কুকুর মালিকদের এই সুবিধা দিতে চাইছি। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ রকম সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।'
গুলশান সোসাইটি আশা করছে, যদি লেক পার্কের এই উদ্যোগ সফল হয়, তবে তাদের আওতাধীন আরও দু'টি পার্কেও এটি ছড়িয়ে দেওয়া হবে। 'আমাদের তিনটি পার্ক আছে, আমরা মাত্র একটি দিয়ে শুরু করেছি,' বললেন সাদাত।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে সাদাত জানান, এলাকার রাস্তার কুকুরদের বিষয়েও তাদের বিশেষ চিন্তা রয়েছে। 'আমরা ভাবছি এই কুকুরগুলোকে চিহ্নিত করে গলায় কলার বা বেল্ট পরিয়ে দেব, তাদের খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করব যাতে কেউ তাদের ক্ষতি না করে। রাস্তায় কুকুর মেরে ফেলার প্রথা আমরা বন্ধ করতে চাই এবং মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে সহাবস্থানের এমন একটা পরিবেশ গড়তে চাই যেখানে তারা নিশ্চিন্তে একসাথে বসবাস করতে পারে।'
সবশেষে উদ্যোক্তারা বলেন, এখন পর্যন্ত এই উদ্যোগ খুব ভালোভাবেই সফল হয়েছে। তারা জানান, 'এ যাবৎ কারও কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পাইনি আমরা।'
মূলত, পার্কের এই চমৎকার উদ্যোগ এটাই জানান দিচ্ছে যে, ঢাকায় পোষা প্রাণীদের ধীরে ধীরে জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকার করে নেওয়ার একটি ইতিবাচক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটছে।
