কর না কমিয়েই ব্যবসা সহজ করতে বিডার ডিরেগুলেশন প্রস্তাব
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিতের মাধ্যমে প্রায় ২০টি ডিরেগুলেশন প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে করহার কমানো ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা উল্লেখযোগ্যভাবে সহজ হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বিডা সূত্রে জানা গেছে, এসব বাধা দূর করা গেলে ব্যবসার খরচ কমবে, সময় সাশ্রয় হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
কাস্টমস ভ্যালুয়েশন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে আমদানি পণ্যের মূল্য নির্ধারণে দেশীয় ডেটাবেসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ডেটাবেস ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে পণ্যমূল্য নির্ধারণে অযৌক্তিকতা কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঝুঁকিভিত্তিক অডিটে জোর
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হলো বর্তমান অডিট পদ্ধতির পরিবর্তে ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা চালু করা। বর্তমানে স্পষ্ট কোনো মানদণ্ড ছাড়াই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে হঠাৎ অডিটের আওতায় আনা হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিটি লিমিটেড কোম্পানিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বার্ষিক নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী জমা দিতে হয়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর কোনো ধরনের ঝুঁকি বিশ্লেষণ ছাড়াই ঢালাওভাবে বা ব্যক্তিগত বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অডিটের জন্য নির্বাচন করা হয়।
সুপারিশে বলা হয়েছে, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট চালু হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কেবল সেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নজর দিতে পারবে, যেখানে রাজস্ব ফাঁকির প্রকৃত ঝুঁকি রয়েছে। এতে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমবে।
এ জন্য 'স্বয়ংক্রিয় অডিট নির্বাচন' ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে কোম্পানিগুলোর জমা দেওয়া অডিট রিপোর্টকে সরাসরি অডিট শুরুর ভিত্তি না করে এনবিআরের কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এরপর নির্দিষ্ট ঝুঁকি সূচক—যেমন টার্নওভারের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, ইনপুট-আউটপুট অনুপাতের অসামঞ্জস্য, ধারাবাহিক রিফান্ড দাবি—বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অডিটের জন্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে।
এলসি নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল বাণিজ্যে জোর
লেটার অব ক্রেডিট (এলসি)-এর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ডিজিটাল লেনদেন পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করতে পারে।
শুল্ক ব্যবস্থায় সংস্কার ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, আধুনিক শুল্কায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে এবং পণ্য খালাসের সময়ও কমে আসবে। এতে ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত হবে।
উদাহরণ হিসেবে ভিয়েতনামের শুল্কায়ন ব্যবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। দেশটি জাপানি প্রযুক্তিতে তৈরি ভিএনএসিসিএস (ভিয়েতনাম অটোমেটেড কার্গো ক্লিয়ারেন্স অ্যান্ড পোর্ট কনসোলিডেটেড সিস্টেম) ব্যবহার করে, যা রিয়েল-টাইম ডেটাবেজের ভিত্তিতে কাজ করে।
সেখানে পণ্যের অর্থনৈতিক মাত্রা ও আন্তর্জাতিক বাজারদর বিশ্লেষণ করে একটি নির্দিষ্ট রেফারেন্স মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এই সীমার মধ্যে ঘোষণা থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে 'গ্রিন চ্যানেল'-এর মাধ্যমে পণ্য খালাস হয়।
এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বাংলাদেশের শুল্ক প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে এবং পণ্য খালাসের সময় কমে আসবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২৪/৭ বন্দর কার্যক্রমে জোর, কমবে লজিস্টিক খরচ
বন্দর কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতাকে ব্যবসার অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা পূর্ণাঙ্গ অপারেশন চালু না থাকায়, পাশাপাশি ব্যাংকিং সময়সীমা ও কাস্টমস কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতার কারণে লজিস্টিক খরচ বাড়ছে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করে পূর্ণাঙ্গ ২৪/৭ অপারেশন চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অফ-ডকের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি খালাসের অনুমোদন দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। এ ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে অফ-ডকগুলোতে নিয়মিত অডিট বা ঝুঁকিভিত্তিক পর্যালোচনা চালুর কথা বলা হয়েছে। এতে বন্দর জট কমবে এবং সামগ্রিক লজিস্টিক দক্ষতা বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
অডিট ও অগ্রিম কর নিয়ে উদ্বেগ
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও বিল্ডের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "১০-১৫ বছর ধরে নিয়মিত কর দেওয়া অনেক প্রতিষ্ঠানকেও বারবার অডিটের মুখে পড়তে হচ্ছে, যা তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হয়রানির অনুভূতি তৈরি করছে।"
তিনি বলেন, "আমরা এমন উদাহরণ দেখছি, যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কর পরিশোধ করছে, এমনকি সরকার থেকে 'সেরা করদাতা' হিসেবে স্বীকৃতি ও ট্যাক্স কার্ডও পেয়েছে। কিন্তু তারপরও তাদের বারবার অডিটের মুখে পড়তে হচ্ছে। এতে সম্মানিত করদাতাদের মধ্যেই হতাশা তৈরি হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "যাদের কর দেওয়ার প্রমাণিত ইতিহাস আছে, তাদের ক্ষেত্রে আস্থাভিত্তিক ব্যবস্থা থাকা উচিত। একই প্রতিষ্ঠানের পেছনে বারবার অডিট পাঠানোর পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।"
অগ্রিম আয়কর (এআইটি) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত লাভের চেয়েও বেশি কর দিতে হয়, কিন্তু সেই অতিরিক্ত অর্থ দ্রুত ফেরত পাওয়া যায় না। এতে ব্যবসার কার্যকর মূলধনের ওপর চাপ পড়ে। কার্যকর করহার অনেক সময় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উঠে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।"
তিনি প্রস্তাব দেন, "যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত এআইটি চূড়ান্ত কর দায়ের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে অতিরিক্ত অর্থ দ্রুত ফেরত দিতে হবে। বিকল্পভাবে, তা পরবর্তী অর্থবছরের অগ্রিম কর হিসেবে সমন্বয়ের সুযোগ রাখা যেতে পারে।"
তিনি বলেন, "এই ব্যবস্থা চালু হলে ব্যবসার মূলধনের ওপর চাপ কমবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো আরও স্বাচ্ছন্দ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।"
তিনি আরও বলেন, "ব্যবসায়ীরা কর দিতে আপত্তি করেন না, তবে কর দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য হতে হবে। তাহলেই বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতিতে গতি আসবে।"
সহজীকরণে এনবিআরের সমর্থন
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, "শুধু করহার কমানোর দিকে নয়, ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা এবং খরচ কমানোর দিকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। আমরা এমন জায়গাগুলোতে জোর দিচ্ছি, যেখানে অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা কমবে এবং ব্যবসা আরও সহজ হবে।"
