দুই হাঁস শিকারের এক কাহিনি: ইউএস ফেডের জন্মের উৎস ও বাংলাদেশের গণহত্যা
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)-এর সাম্প্রতিক একটি খবরের শিরোনাম— "Saving City Group: 36 banks move to restructure its Tk26,600cr loans" (সিটি গ্রুপকে রক্ষা: ২৬,৬০০ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ ৩৬ ব্যাংকের)—আমাকে 'সেভিং প্রাইভেট রায়ান' নামের বিখ্যাত মার্কিন যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়।
সিনেমাটির প্লট বা কাহিনীই এর নামকরণকে পুরোপুরি সার্থক করে তুলেছে। এতে দেখানো হয়েছে, একদল সেনার এক লোমহর্ষক ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের গল্প, যাদের পাঠানো হয়েছিল রায়ান পরিবারের একমাত্র জীবিত সন্তানকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উদ্ধার করতে, যার বাকি তিন ভাই ইতোপূর্বে যুদ্ধে নিহত হয়েছেন।
টিবিএস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, "সেভিং সিটি গ্রুপ" (সিটি গ্রুপকে রক্ষা) শিরোনামটি দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপকে উদ্ধারে দুটি বিদেশি ব্যাংকসহ ৩৬টি ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগের কাহিনি বলে, যেখানে গ্রুপটি ২৬,৬০০ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া ঋণ নিয়ে টিকে থাকার লড়াই করছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গত ১৯ জুন ঢাকার হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক ডজনেরও বেশি ব্যাংকের শীর্ষ ব্যাংকাররা বৈঠকে বসেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এই মিশনে নামেন: "সেভিং সিটি গ্রুপ"। সিটি গ্রুপের ঋণ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার আগে তারা একজন স্বতন্ত্র নিরীক্ষক বা অডিটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এছাড়া শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি পর্যালোচনা কমিটিও (রিভিউ কমিটি) গঠন করা হয়েছে।
এই মিশন কি সফল হতে পারে? প্রয়োজন ও সংকটের সময়ে ব্যাংকাররা কি কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন? ইতিহাস বলছে, তারা পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ফেডারেল রিজার্ভ সৃষ্টির সেই অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় ইতিহাসটি এখানে পুনরুল্লেখ করা যায়। দীর্ঘ ইতিহাস সংক্ষেপে বললে—১৯০৭ সালে যখন একটি বড় ধরনের ব্যাংকিং ধস মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলেছিল, তখন তৎকালীন শীর্ষ অর্থায়নকারী জে পি মরগান নিজে এগিয়ে আসেন এবং তার ম্যাডিসন অ্যাভিনিউর ম্যানশনে সহকর্মীদের ডেকে এনে রুদ্ধদ্বার আলোচনায় বসেন।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক অ্যান্ড্রু লেই তার "হাউ ইকোনমিকস এক্সপ্লেইনস দ্য ওয়ার্ল্ড" বইয়ে লিখেছেন, মরগান তখন সহকর্মীদের বলেছিলেন, "সমস্যা থামানোর জায়গা এটাই।" মরগান সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর জন্য কোটি কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং তার সহকর্মী ব্যাংকারদেরও একই কাজ করতে রাজি করান। এর ফলে আতঙ্ক কেটে যায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্য আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। কিন্তু শীর্ষ ব্যাংকাররা সেখানেই থেমে যাননি। ভবিষ্যতে এই ধরনের সংকট এড়ানোর উপায় তারা খুঁজতে থাকেন।
এর তিন বছর পর, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরা আবারও এ উদ্যোগ নেন। কোনো কার্যকর স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা ও বৈঠকের পরিকল্পনা করেন তারা। সেই উদ্দেশ্যে তারা জর্জিয়ার জেকিল আইল্যান্ডে ১০ দিনব্যাপী একটি অত্যন্ত গোপন বৈঠকের ডাক দেন।
তবে তারা এই বৈঠকটিকে সংবাদমাধ্যমের আড়ালে রাখতে চেয়েছিলেন। এজন্য তারা একটি পরিকল্পনা করেন। ব্যাংকাররা ভান করলেন যে, তারা সবাই মিলে একটি হাঁস শিকারে যাচ্ছেন। তারা একে একে ট্রেনে চড়লেন যাতে কাউকে একসঙ্গে দেখা না যায়। এমনকি সফরটিকে পুরোপুরি বাস্তবসম্মত রূপ দিতে একজন ব্যাংকার সঙ্গে করে একটি শটগানও নিয়েছিলেন।
সেই গোপন বৈঠক থেকেই তারা একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন, যা আজকের মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের মূল কাঠামোর প্রস্তাব করেছিল। এর আওতায় মুদ্রা জারি করার ক্ষমতাসহ ১২টি আঞ্চলিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। পরবর্তীতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ বা কংগ্রেসে বেশ কিছু উত্তেজনাকর ও দীর্ঘ আলোচনার পর— ১৯১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে 'ফেডারেল রিজার্ভ' সৃষ্টি হয়। এর ফলে পরবর্তী ব্যাংকিং সংকট এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রকে আর কেবল কোনো একক ধনকুবেরের উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়নি।
বাকিটা তো ইতিহাস।
এবার হাঁস শিকারের আরেকটি সফরের গল্পে আসা যাক।
এবারে ছিল পাকিস্তানের লারকানায় আয়োজিত একটি পাখি শিকারের সফর। লারকানা ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পরাজিত জুলফিকার আলী ভুট্টোর নিজ শহর, আর ঠিক এই সফরেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে গণহত্যার বীজ বপন করা হয়েছিল।
শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে কীভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে কুক্ষিগত রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করতে সেখানে বৈঠকে বসেছিলেন ভুট্টো এবং পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। ইতিহাসে এটি 'লারকানা ষড়যন্ত্র' নামে পরিচিত, যা মূলত পরবর্তীকালে ঘটে যাওয়া ৯ মাসের ভয়াবহ গণহত্যা, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল উৎস বা গোড়ায় ছিল।
অর্থাৎ, নিয়ত বা উদ্দেশ্যই বাস্তবতাকে রূপ দেয়।
মার্কিন শীর্ষ ব্যাংকারদের সেই হাঁস শিকারের মেকি সফরটি শেষ পর্যন্ত ফেডারেল রিজার্ভ সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করেছিল—যে প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে দেশের মুদ্রানীতি পরিচালনা, আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ এবং পেমেন্ট সিস্টেম বা অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব পালন করে আসছে।
অধ্যাপক অ্যান্ড্রু লেই লিখেছেন, সপ্তদশ শতাব্দী থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অস্তিত্ব ছিল (ব্যাংক অব আমস্টারডাম, স্টকহোমের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ড—সবই ১৬০০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল), তবে বিংশ শতাব্দীতে এসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মূল ভূমিকা গ্রহণ করতে শুরু করে।
বইটিতে তিনি লিখেছেন: "সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি আমানত বা ডিপোজিট থেকে টাকা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয়। যেহেতু তারা স্বল্পমেয়াদে ধার করে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দেয়, তাই অত্যন্ত সুপরিচালিত একটি ব্যাংকও নগদ টাকার সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে, যদি তার সমস্ত আমানতকারী একই সময়ে তাদের টাকা ফেরত দাবি করে। মানুষের এই আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ব্যাংক রান' (আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক) ঠেকাতে পারে এবং আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করতে পারে।"
এবার সেই একই প্রশ্ন আবার সামনে আসে। আমাদের দেশের ব্যাংকাররা কি "সিটি গ্রুপকে রক্ষা" করার মাধ্যমে আর্থিক খাতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে এবং একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবেন?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নিজেই এখন একের পর এক তীব্র ধাক্কায় বিপর্যস্ত। খেলাপি ঋণের নজিরবিহীন বৃদ্ধি এই খাতে চরম অপশাসনেরই একটি বাস্তব প্রতিফলন। অভিযোগ রয়েছে, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই এমন কিছু অলিগার্ক বা প্রভাবশালীদের কব্জায় চলে গিয়েছিল, যারা ঋণের নামে ব্যাংকগুলোকে আক্ষরিক অর্থেই লুটেপুটে খেয়েছে।
পরিশেষে এক্ষেত্রেও সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি করা যায়: নিয়ত বা উদ্দেশ্যই বাস্তবতাকে রূপ দেয়।
