৫,৬০০ কোটি টাকার তহবিল ঘাটতিতে আটকে গেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন প্রক্রিয়া
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া ছয়টি সংকটাপন্ন ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়নের সিদ্ধান্ত চলতি অর্থবছরে কার্যকর হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান সরকার আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য বরাদ্দকৃত ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সংস্থান করতে না পারায় এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
এই বিলম্বের কারণে আমানতকারীরা রাজপথে নেমেছেন। গতকাল (৬ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মুখে কালো কাপড় বেঁধে শতাধিক আমানতকারী মৌন প্রতিবাদে অংশ নেন। তাদের দাবি ছিল সুনির্দিষ্ট: সাবেক গভর্নরের বক্তব্য অনুযায়ী আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের জন্য ২০২৬ সালের জুলাই মাসের সময়সীমা অনুযায়ী অবিলম্বে সুস্পষ্ট, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর রোডম্যাপ ঘোষণা করা।
একজন বিক্ষোভকারী বলেন, 'আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট টাইমলাইন দেওয়া হয়েছিল। আমরা তার বাস্তবায়ন চাই।'
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই অবসায়নের সিদ্ধান্ত হয়। তখন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে আমানতকারীদের পাওনা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করা হবে। 'সেই নিশ্চয়তার প্রেক্ষিতেই পূর্ববর্তী গভর্নর লিকুইডেশনের (অবসায়ন) ঘোষণা দেন।'
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা, যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়নে অর্থ ব্যয় করছে। ফলে এই মুহূর্তে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অবলুপ্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরকারের পক্ষ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।
'সরকারকে কিছুটা সময় দিলে এবং অর্থপ্রাপ্তি নিশ্চিত হলেই এই অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই প্রক্রিয়া শুরু হলেই আমানতকারীরা তাদের টাকা ফেরত পাবেন,' বলেন তিনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরও বলেন, ছয়-সাতটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে তাদের পুনরায় ব্যবসায় ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত না করে সরাসরি অবসায়নে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ ছয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের অনুমোদন দেয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এফএএস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৭৫ শতাংশ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ছয় প্রতিষ্ঠান অবসায়নের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তবে এর বাস্তবায়ন এখন পুরোপুরি সরকারি তহবিলের ওপর নির্ভর করছে।
তিনি আরও বলেন, গভর্নরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়নের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। গভর্নর ইঙ্গিত দিয়েছেন, শুরুতে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের একসঙ্গে না হলেও অবসায়ন প্রক্রিয়া চলবে। তবে কাজটি চলতি অর্থবছরের মধ্যেই সম্পন্ন হবে—এমন নিশ্চয়তা দিতে পারেননি তিনি।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, সরকারের উচিত তাদের সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া। কারণ আমানতকারীরা কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা না পেয়ে প্রতিদিন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
আমানতকারীদের চরম দুর্দশার কথা তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা বলেন, চিকিৎসার জন্য সাহায্য চেয়ে আবেদন করা একজন আমানতকারী শেষপর্যন্ত পর্যাপ্ত অর্থাভাবে মারা গেছেন।
জরুরি পদক্ষেপের দাবি আমানতকারীদের
এই ছয়টি প্রতিষ্ঠানের ১২ হাজারেরও বেশি আমানতকারীর প্রতিনিধিত্বকারী একটি জোট তাদের দীর্ঘদিনের আটকে থাকা অর্থ দ্রুত ফেরতের ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছে।
গভর্নরের কাছে জমা দেওয়া একটি স্মারকলিপিতে প্ল্যাটফর্মটি বলেছে, প্রায় সাত বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয় আটকে থাকায় তারা চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ ও মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
স্মারকলিপিতে তারা বলেন, প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে অনেক আমানতকারী ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা নিতে পারছেন না। চিকিৎসার অভাবে ইতিমধ্যে কয়েকজন আমানতকারীর মৃত্যুও হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে জনগণের আমানত সুরক্ষার সর্বোচ্চ দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার এবং পূর্বঘোষিত সময়সীমার মধ্যে টাকা ফেরতের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে এই জোট।
বিক্ষোভকারীরা বলেন, সংসার চালানোর জন্য অনেকে তাদের অবসরের পর প্রাপ্ত অর্থ এবং জমি বিক্রির টাকা এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে তারা নিজেদের সঞ্চয় তুলতে পারছেন না।
একজন আমানতকারী বলেন, 'সাত বছর অপেক্ষার পরও আমরা আমাদের টাকা ফেরত পাইনি। আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে, আর তাই রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছি।'
চাপে আর্থিক খাত
দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত এখন সার্বিকভাবেই ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে। ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টিকেই 'সমস্যাগ্রস্ত' হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এই সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ ২৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকাই খেলাপি (৮৩.১৬ শতাংশ)। এই ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পদের মূল্য মাত্র ৬ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা।
অন্যদিকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা ১৫টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৭.৩১ শতাংশ। গত বছর তারা ১ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে এবং তাদের ৬ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা মূলধন উদ্বৃত্ত রয়েছে।
সমস্যাগ্রস্ত ২০ প্রতিষ্ঠানে আমানত রয়েছে ২২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকদের নিট ব্যক্তি আমানত প্রায় ৪ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। অবসায়ন ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় প্রাথমিকভাবে এই অর্থের জোগান প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
এছাড়া অবসায়নের পর এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীরা চাকরিবিধি অনুযায়ী সব ধরনের সুবিধা পাবেন বলে নিশ্চিত করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
