খুলনার পুনর্বাসন কেন্দ্রে ১৯ দিন, খাবার মুখে তোলেনি খান জাহান আলীর দিঘির বিরল কুমির
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজারের দিঘি থেকে উদ্ধার করা সেই শতবর্ষী জাতের মিঠাপানির কুমিরটি দীর্ঘ ১৯ দিনেও কোনো খাবার মুখে তোলেনি। গত ৩ জুন খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তরের পর থেকে সেটিকে মাছ, মাংস কিংবা জীবন্ত হাঁস দেওয়া হলেও কোনো কিছুই গ্রহণ করেনি প্রায় ৪৫ বছর বয়সী এই মাদী কুমিরটি।
দীর্ঘদিন অনাহারে থাকায় প্রাণীটির স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বন বিভাগ জানিয়েছে, কুমিরটির শরীরে অতিরিক্ত চর্বি থাকায় আপাতত উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। তবে খাঁচাবদ্ধ পরিবেশের কারণে এটি চরম মনস্তাত্ত্বিক চাপে রয়েছে বলে ধারণা করছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা।
গত ১ জুন মাজারের দিঘিতে গোসল করতে নামা সাত বছর বয়সী এক শিশুকে টেনে নিয়ে যায় এই কুমিরটি। যার ফলে শিশুটির মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও মাজারের দর্শনার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত ৩ জুন বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের অনুরোধে বন বিভাগের একটি বিশেষ রেসকিউ টিম কুমিরটিকে দিঘি থেকে উদ্ধার করে। এরপর সেটিকে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের নিবিড় তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।
বর্তমানে পুনর্বাসন কেন্দ্রের একটি বিশেষ জোনে অ্যানিমেল কিপার ও ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ টিম নিয়মিত সেটির দেখভাল করছে। কুমিরটির জন্য প্রতিদিন নিয়ম করে পানি পরিবর্তন ও কৃত্রিম শাওয়ারের মাধ্যমে গোসলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
খুলনা কার্যালয়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, 'সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী হিসেবে কুমিরের মেটাবলিজম রেট (বিপাক প্রক্রিয়া) অত্যন্ত ধীর। ফলে এরা দীর্ঘ সময় না খেয়ে অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে। বিশেষ করে এই কুমিরটি মাজারের দিঘিতে থাকা অবস্থায় মানুষের দেওয়া অতিরিক্ত খাবার খেয়ে অত্যন্ত চর্বিবহুল ও স্থূল হয়ে পড়েছে। ৪-৫ শত কেজি ওজনের এই কুমিরটির শরীরে যে পরিমাণ ফ্যাট বা চর্বি জমা আছে, তাতে এটি এক থেকে দুই মাস অনায়াসে না খেয়ে থাকতে পারবে।'
তিনি আরো জানান, পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে কুমিরটিকে স্বাভাবিক করার জন্য ছোট-বড় মাছ, মুরগি এবং শিকারের অভ্যাস ফেরাতে জীবন্ত হাঁসও খাঁচায় দেওয়া হয়েছিল। কুমিরটি একবার একটি মুরগিকে ধরে কামড় দিয়ে আঘাত করলেও শেষ পর্যন্ত তা না খেয়ে মুখে উগরে দেয়।
শারীরিক গঠনে অতিরিক্ত চর্বি থাকায় স্থলে মাত্র কয়েক কদম হাঁটার পরই কুমিরটি অলস হয়ে বসে পড়ে। তবে কৃত্রিম জলাধারের পানিতে এর চলাচলে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কর্মচারীরা লক্ষ্য করেছেন, কুমিরটির মধ্যে মুক্ত ও বড় পরিসরে বিচরণ করার একটি তীব্র প্রবণতা কাজ করছে; এটি প্রায়ই পানির বাইরে উঠে খাঁচার লোহার গেটে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে, যা মূলত বন্দিদশা থেকে মুক্তির আকুলতা।
কুমিরটিকে সুন্দরবনের বিশাল অভয়ারণ্যে অবমুক্ত করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বন বিভাগের কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, সুন্দরবনে এই কুমিরটি ছাড়ার কোনো বৈজ্ঞানিক সুযোগ নেই।
সুন্দরবনের নদী ও খালের পানি অত্যন্ত লবণাক্ত এবং সেখানে মূলত লোনাপানির কুমির বাস করে। অন্যদিকে, মাজার থেকে উদ্ধার হওয়া এই প্রাণীটি পুরোপুরি মিঠাপানির জাত। লোনাপানিতে ছাড়লে এটি অভিযোজন করতে না পেরে মারা যাবে।
কুমিরটিকে আবারও মাজারের দিঘিতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে কি না, তা এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে মাজার কমিটির সিদ্ধান্ত এবং সেখানে দর্শনার্থীদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর।
ডিএফও নির্মল কুমার পাল বলেন, 'মাজার কর্তৃপক্ষ যদি কুমির এবং সেখানে আসা হাজারো ভক্ত-দর্শনার্থী উভয় পক্ষের শতভাগ নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করতে পারে, তবেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেটিকে ফেরত দেওয়া হতে পারে। কারণ কুমিরটি দিঘির পাড় গলে মাঝেমধ্যেই লোকালয়ে বা রাস্তায় চলে যেত, যা মানুষ ও প্রাণী উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।'
তিনি বলেন, 'মাজার কর্তৃপক্ষ যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তবে আমরা বিষয়টি সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানাব এবং পরবর্তী স্থায়ী পুনর্বাসনের পদক্ষেপ নেব।'
প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রাণীটির আচরণ স্বাভাবিক করার জন্য আরও অন্তত এক মাস কুমিরটিকে খুলনার এই পুনর্বাসন কেন্দ্রেই রাখা হবে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) ২০০০ সালে বাংলাদেশের প্রাকৃতিকভাবে মুক্ত জলাশয় থেকে মিঠাপানির কুমিরকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'বিলুপ্ত' ঘোষণা করেছিল। বাগেরহাটের এই মাজারের দিঘিটিই ছিল বাংলাদেশে মিঠাপানির কুমিরের শেষ ঐতিহাসিক আশ্রয়স্থল।
তবে আশার কথা হলো, গত ৫-৭ বছরে দেশের নদী অববাহিকার বাস্তুসংস্থানে কিছু পরিবর্তন আসায় পাবনা, রাজশাহী, মাগুরা, ফরিদপুর এবং বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে বেশ কয়েকটি মিঠাপানির কুমির জেলেদের জালে বা স্থানীয়দের মাধ্যমে উদ্ধার হয়েছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দেশের নদী ও জীববৈচিত্র্যের পুনরুজ্জীবনের একটি ইতিবাচক লক্ষণ। উদ্ধার হওয়া সেসব কুমিরের কিছু অংশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত কেন্দ্রে বংশবৃদ্ধির জন্য এবং কয়েকটিকে অনুকূল মিঠাপানির প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হয়েছে।
বাগেরহাটের এই কুমিরটির ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে মাজারের নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং বন বিভাগের চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।
