শূন্যরেখায় আটকে থাকা মানুষ: মানবিকতা বনাম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা
শূন্যরেখায় আটকে থাকা এই মানুষগুলো রোদ, বৃষ্টি, গরমে খোলা আকাশের নিচে বেঁচে আছেন। এরমধ্যে আছে শিশু, নারী, পুরুষ, বয়স্ক মানুষ সবাই। একদিন এই মানুষগুলোর সব ছিল, আজ কিছুই নেই, এমনকি নিজ ভূমিতে ফেরার বা ফিরে যাওয়ার অধিকারও নেই। এদের পরিচয়, আহার, বাসস্থান, আশ্রয় এবং স্বপ্ন সব হারিয়ে গেছে দুই দেশের সীমান্ত রাজনীতির কাছে।
তারা না পারছেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে, না ফিরতে পারছেন ভারতে। দুইদেশের সীমান্তরক্ষীদের টানাহেঁচড়া ও ধাক্কাধাক্কির কবলে পড়ে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে মানবতা ও মানুষের মৌলিক অধিকার।
কাঁটাতারের দুইপাশে যে অসহায় মানুষগুলো দাঁড়িয়ে আছেন, তাদের পরিচয় এখন আটকে আছে সীমান্ত সেনাদের হাতে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে এই মানুষগুলোর পরিচয় যাচাই ও গ্রহণ নিয়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা কাটবে কবে বা কীভাবে তা কেউ বলতে পারছেন না।
এদিকে, বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় খোলা আকাশের নিচে বেশ কিছু মানুষ কয়েক দিন ধরে আটকে আছেন মানবেতর অবস্থায়। যেটুকু সময়ের জন্যই হোক না কেন, নারী ও শিশুসহ মানুষকে শূন্যরেখায় অনিশ্চিত অবস্থায় আটকে রাখা একটি গুরুতর মানবিক উদ্বেগের বিষয়। বুঝতে পারছি না বিশ্বের অন্যান্য দেশ কেন উদ্বেগ দেখাচ্ছে না বা সমঝোতার কথা বলছে না? রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরা দেখেছি বিশ্ব কীভাবে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিল এবং এখনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে করছে।
শূন্যরেখায় অবস্থান করা মানুষগুলো যে কতটা কষ্টের মধ্যে আছেন, তা বোঝা যায় সুমি আক্তারের আকুতিতে। খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো সুমি বলেন, "ভাই, আমগোর জীবন গেলে যাক, আমগোর বাচ্চা দুইডারে বাঁচাইন। এভাবে আর দুইডা দিন ফালায় রাখলে বাচ্চাগুলো মরে যাবে। তিন দিন হইল সীমান্তে বইসা আছি। কোনো দেশেই নিচ্ছে না। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ারও উপায় নাই। চারদিকে দুই দেশের বাহিনী ও মানুষ ঘিরে আছে। না খাইতে পেরে বুকের দুধ শুকায় গেছে। বাচ্চাডা ঠিকমতো দুধ পায় না।" ( সূত্র: প্রথম আলো)।
কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টার শিকার সুমি আক্তারের সাথে আছেন ছয় ব্যক্তি। তাদের মধ্যে দুই শিশুও আছে। এরকম বিভিন্ন সীমান্তে মানবেতরভাবে আটকে আছেন অনেক মানুষ। তাদের চারপাশে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে আছেন, শুধু নেই এই মানুষগুলোর কোনো আশ্রয়।
আটকে থাকা শিশুরা দেশ, রাজনীতি, সীমান্ত পিলার, কাঁটাতার, পতাকা বৈঠক কিছু বুঝে না। তারা বোঝে ক্ষুধা, পানি, ছায়া, মায়ের কোল ও ঘুমানোর জন্য ছোট একটা ঘর, একটা শয্যা। ওরা জানে না কেন এই কাদাপানির মধ্যে খোলা মাঠে ওরা আটকা পড়ে আছে দিনের পর দিন। কোথায় ওদের ঘর, কোনটা ওদের দেশ। এক দেশ ওদের ধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছে, আরেক দেশ তাদের ঢুকতে দিচ্ছে না।
শিশুর প্রতি এই অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে কেউ কথাও বলছে না। শিশুগুলোর ট্রমা নিয়েও কেউ ভাবছে। শিশু হলেও ওরা অনুভব করতে পারছে, ওদের কোনো নাম বা পরিচয় নেই, ওরা কারো নয়, কেউ ওদের নয়। এই শূন্যস্থানে ওদের পরিচয় ওরা উদ্বাস্তু।
যখনই দেখি কিছু মানুষ তাদের সামান্য কিছু পোঁটলাপুঁটলি ও ঘটিবাটি নিয়ে যাত্রা করেছেন অজানার উদ্দেশ্যে, তখনই মনে পড়ে অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত এর 'উদ্বাস্তু' কবিতাটির কথা। পুরোনো সবকিছু ফেলে ভূষণ পাল তার পরিবার নিয়ে পথে বেরিয়েছিলেন নিজের দেশে যাবেন বলে, কিন্তু তাদের কি সেখানে পৌঁছানো হয়েছিল? পেয়েছিলেন নতুন দেশে, নতুন সংসার? তাদের একটা পরিচয় হয়েছিল উদ্বাস্তু নামে। কবি লিখেছেন—
'আমাদের নিজের দেশে, নতুন দেশে,
নতুন দেশের নতুন জিনিষ-মানুষ নয়, জিনিস-
সে জিনিসের নাম কী?
নতুন জিনিসের নতুন নাম-উদ্বাস্তু।
ওরা কারা চলেছে আমাদের আগে-আগে-ওরা কারা?
ওরাও উদ্বাস্তু।'
এই ঘর-বাড়ি হারানো মানুষগুলোর আসলে অপরাধ কী? এরা কি চোর, ডাকাত, পাচারকারি, বা মাদক ব্যবসায়ী। তারা কেউ কেউ সীমান্ত পার হয়ে অন্য দেশে ঢুকেছিলেন কাজের সন্ধানে বা ওই পাড়ে থাকা স্বজনদের কাছে যাওয়ার জন্য। রাষ্ট্রের চোখে তারা হয়তো 'অনুপ্রবেশকারী'। শূন্যস্থানে বসে থাকা বিল্লাল হোসেনের কথা থেকেই বোঝা যায়, মানুষগুলো কীভাবে ফাঁদে পড়েছেন।
তিনি বলেছেন, "এক সপ্তাহ আগে দালালের মাধ্যমে কাজের আশায় ভারতে গেছিলাম। লোভে পড়ে ভারত গেছিলাম। পরে সে দেশে আটক হই। গত রোববার ভোরে কাঁটাতার পার করে দিছে। তিন দিন ধইরা নো ম্যানস ল্যান্ডে বসে আছি। আমরা বাংলাদেশি।" (প্রথম আলো)
ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মণের কপাল ভালো যে উনি পরিবারের কাছে ফিরতে পেরেছেন। প্রবীণ এই মানুষটির ফিরে আসার সেই দৃশ্য দেখে চোখের পানি আটকে রাখা যায়নি। বকশীগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাকে ঠেলে পাঠিয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিজিবি তাকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে। আমরা চাইছি শূন্যস্থানে আটকে থাকা মানুষগুলোর দ্রুত পরিচয় নিশ্চিত করে তাদের ফিরিয়ে নেওয়া বা ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় মানবিকতা ও মানুষের মর্যাদা রক্ষা করাও সমানভাবে জরুরি। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা করে। রাষ্ট্রের অবশ্যই সীমান্ত রক্ষার অধিকার আছে। পাশাপাশি রাষ্ট্র যদি বিপদগ্রস্ত মানুষকে আশ্রয় না দেয়, তাহলে কে দেবে?
শূন্যস্থানে থাকা মানুষগুলোর পরিচয় যাই হোক না কেন, সেখানেও কিছুটা আশ্রয়, সামান্য খাবার তাদের লাগে। সেই প্রক্রিয়া না মেনে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া কিংবা শূন্যরেখায় অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা চরমভাবে অমানবিক।
"দেশভাগের কয়েক বছর পর ভারত ও পাকিস্তান সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, শুধু সাধারণ বন্দী নয়, মানসিক হাসপাতালে থাকা রোগীদেরও দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। সেই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই কালজয়ী লেখক সাদত হাসান মান্টো লিখেছিলেন এক ধ্রুপদি গল্প 'টোবা টেক সিং'। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিষণ সিং। বহু বছর ধরে পাগলাগারদে থাকা এই মানুষটি সবার কাছে একটাই প্রশ্ন করতেন, 'টোবা টেক সিং কোথায়? পাকিস্তানে, নাকি হিন্দুস্তানে?'
কারণ, টোবা টেক সিং ছিল তার গাঁ, তার পরিচয়, তার শিকড়। যেদিন তাকে সীমান্ত পার করে ভারতে পাঠানোর কথা, সেদিনও তিনি একই প্রশ্ন করেন। একজন কর্মকর্তা উত্তর দেন, 'পাকিস্তানে।' উত্তর শুনে বিষণ সিং সীমান্ত পার হতে অস্বীকৃতি জানান। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, টোবা টেক সিং ভারতে, আবার কেউ বলে পাকিস্তানে। কিন্তু তিনি নড়েন না। শেষ পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানের মাঝখানের নামহীন একটুকরো জমিতে দাঁড়িয়ে থাকেন। গল্পের শেষে সূর্য ওঠার আগে বিষণ সিং মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এক পাশে ভারত, অন্য পাশে পাকিস্তান। মাঝখানে নামহীন ভূমিতে পড়ে থাকে টোবা টেক সিং। দেশভাগের ইতিহাসে এর চেয়ে শক্তিশালী প্রতীকী কথাসাহিত্য খুব কমই আছে।" (সূত্র: আলতাফ পারভেজ/লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)
শূন্যরেখায় থাকা মানুষগুলোর সাথে মান্টোর বিষণ সিং এর অনেক মিল খুঁজে পাই। হয়তো এরাও একদিন এই সীমান্তরেখা বরাবর অবস্থান করতে করতে হারিয়ে যাবেন। এখানে তাদের বেঁচে থাকার যে করুণ বাস্তবতা, তা খুবই মর্মান্তিক। কঠির গরমে এই মানুষেরা পুড়ছে, ভিজছে। পিপাসার্ত ও ক্ষুধার্ত মানুষ কাঁদছে। আর দুই দেশের রাজনীতিবিদ, সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থাগুলো সেসব দেখছে এবং নিজেদের পাতে ঝোল টানছে।
ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেরই সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে উদ্বেগ আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াতেও মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা আবশ্যক। যেসব মানুষ সীমান্তবর্তী এলাকায় আটকে পড়েছেন, তাদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব দেখানো কতটা মানবিক হচ্ছে?
যদি কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে বিরোধ থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। অনির্দিষ্টকালের জন্য মানুষকে ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয়। কোনো মানুষকে দিনের পর দিন 'নো ম্যান্স ল্যান্ডে' অনিশ্চিত অবস্থায় বসবাস করতে বাধ্য করা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সভ্য সমাজের মানদণ্ড হলো–সীমান্তের রেখা যেখানেই টানা হোক না কেন, মানুষের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদা যেন সেই রেখার ওপারে হারিয়ে না যায়। মানুষের জীবন, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার সবার আগে আসা উচিত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিগুলোও এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যে রাষ্ট্রের সীমান্ত, জাতীয়তা বা রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে হবে। কোনো মানুষ খাদ্য, আশ্রয়, নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হয়ে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকবে, এটা কোনো আইন ও সভ্যতা হতে পারে না।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
