বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা দেহভাষার বিজ্ঞান ও আধুনিক মানুষের আগমন বৃত্তান্ত
দেহভাষা ও মানুষের সূচনা
মানুষের দেহভাষা বা অঙ্গভঙ্গির ইতিহাস ভাষার চেয়েও পুরোনো—একেবারে প্রাগৈতিহাসিক যুগের। মৌখিক যোগাযোগের ভাষা যখন জানা ছিল না, তখন অবাচনিক বা অমৌখিক সংকেতই ছিল ভাববিনিময়ের একমাত্র সম্বল।
'নানান বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ/ জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত'—দেহভাষা নিয়ে ভাবতে গেলে জসীমউদ্দিনের 'সোজন বাদিয়ার ঘাট'-এর এই চরণ দুটি মনে ভেসে ওঠে। মানুষ হিসেবে আমাদের কিছু মৌলিক অনুভূতি আর অঙ্গভঙ্গি একেবারেই সর্বজনীন। হাসির অর্থ যেমন আনন্দ বা বন্ধুত্বের আশ্বাস, কান্নার অর্থ তেমনই দুঃখ বা বেদনা। কিন্তু ভিন্ন সংস্কৃতি ও বর্ণ সত্ত্বেও এই শারীরিক সংকেতগুলো সারা বিশ্বে এতটা এক রকম কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সাম্প্রতিককালের বংশগতিবিদ্যা বা জেনেটিকসের গবেষণায়। আর সেই উত্তর খুঁজতে উঁকি দিতে হবে অতীতে।
রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বলা যায়, 'হে অতীত, তুমি ভুবনে ভুবনে/ কাজ করে যাও গোপনে গোপনে...' হ্যাঁ, অতীত আজও কথা বলছে, তবে তার ভাষা আমাদের বুঝে নিতে হবে। অতীত ঘেঁটে আমরা জানতে পারি, প্রায় ৫০ লাখ বছর আগে নিরক্ষীয় আফ্রিকায় প্রায় ১ লাখ শিম্পাঞ্জিসদৃশ প্রাণীর বসবাস ছিল। সে সময় আফ্রিকার বনভূমি দিনে দিনে সংকুচিত হয়ে আসছিল, ফলে এই প্রাণীকুলের দুনিয়াটাও ছোট হয়ে আসছিল। আবহাওয়া হয়ে উঠেছিল কাঠফাটা গরম আর শুষ্ক। গাছের ডালে ডালে খাবার খুঁজে বেঁচে থাকা তখন কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অস্তিত্ব রক্ষায় বদলে যাওয়া প্রকৃতির সাথেই তাদের খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছিল।
খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই প্রক্রিয়ায় কিছু প্রাণীর সোজা হয়ে হাঁটার ক্ষমতা তৈরি হয়। প্রায় ৪৪ লাখ বছর আগের জীবাশ্মে প্রথম দুই পায়ে হাঁটা এপদের সন্ধান মেলে। এরা অস্ট্রালোপিথেসিন (Australopithecines)। সোজা হয়ে হাঁটার কারণে তারা দূরদূরান্তে গিয়ে বিচিত্র সব খাবার সংগ্রহের সুযোগ পায়। তবে উন্মুক্ত পরিবেশে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে তাদের পরিবেশের জটিলতাও বেড়ে গেল।
সামাজিক জীব হওয়ার কারণে এই জটিল পরিবেশ সামলাতে অস্ট্রালোপিথেসিনরা দলবদ্ধভাবে কাজ শুরু করে। এতে সমাজে কে বন্ধু আর কে শত্রু, কাকে দলে রাখা যাবে আর কাকে নয়, তা বোঝার প্রয়োজন দেখা দেয়। দলের ভেতরের এই কূটনীতি সামলাতে মস্তিষ্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে থাকে। ফলে প্রয়োজন হয়ে পড়ে আরও শক্তিশালী মস্তিষ্কের।
এই মানসিক চাহিদার কারণে প্রায় ২৫ লাখ বছর আগে তাদের মস্তিষ্কের আয়তন ৪০০-৫০০ সিসি থেকে বেড়ে ৬০০-৮০০ সিসি হয়ে যায়। বিবর্তনের নিয়মে ছোট মস্তিষ্কের প্রাণীরা পিছিয়ে পড়ে এবং বড় মস্তিষ্কের অধিকারীরা টিকে থাকে। এই সময়েই আবির্ভাব ঘটে হোমো হাবিলিসের (Homo habilis)।
বড় মস্তিষ্কের জন্য শক্তির চাহিদাও ছিল বেশি। ফলে হোমো হাবিলিস পাথরের হাতিয়ার বানিয়ে গোশত ভোজন শুরু করে। সে সময়ও তাদের শরীরে পশম ছিল। সামাজিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে তারা দিনের প্রায় ২০ শতাংশ সময় একে অপরের পশম পরিষ্কার করতেই ব্যয় করত। এই পশম সাফাইয়ের ঝক্কির কারণেই তাদের দলের আকার ৫০ জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
দেহভাষা গল্পগুজবের দিনগুলো
বিবর্তনের এই ধারা অব্যাহত থাকে। প্রায় ১৭ লাখ বছর আগে তাদের মস্তিষ্কের আয়তন বেড়ে দাঁড়ায় ৮০০ সিসিতে। মস্তিষ্ক বড় হওয়ার কারণে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপ নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে পড়ে। এই চাপের ফলেই পশম ঝরে যেতে থাকে এবং বিকাশ ঘটে ঘামগ্রন্থির—যাতে ঘামের মাধ্যমে শরীর ও মস্তিষ্ক ঠান্ডা রাখা যায়। পশম না থাকায় সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে বাঁচাতে তা কালো রূপ নেয়। এটি ছিল হোমো এরগ্যাস্টারের (Homo ergaster) আবির্ভাবকাল।
মানুষের বিশ্বজয়ের গল্প ও ভাষার জন্ম
এবারে গতি বাড়ানো যাক। প্রায় ১০ থেকে ১ লাখ বছর আগের কথা। দুনিয়ায় এল হোমো ইরেক্টাস (Homo erectus)। ইতিহাসের এটি এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। এদের হাত ধরেই মানুষ প্রথম আফ্রিকা ছেড়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় পুরুষ ও নারীর ভেতরের মেলবন্ধনও বেশ শক্ত হয়ে ওঠে।
প্রায় ৫ লাখ বছর আগে হোমো হাইডেলবার্গেনসিস (Homo sapiens) দ্বিতীয় দফায় ইউরোপে পাড়ি দেয়। এদের থেকেই প্রায় ৪ লাখ বছর আগে জন্ম নেয় নিয়ান্ডারথালরা। অবাক করা বিষয় হলো, নিয়ান্ডারথালদের মস্তিষ্ক আধুনিক মানুষের চেয়ে বড় ছিল, শরীরও ছিল বেশ তাগড়া, পেশিবহুল। লড়াইয়ে তাদেরই জয়ী হওয়ার কথা। কিন্তু যোগাযোগের একটি মৌলিক দক্ষতা না থাকায় শেষ পর্যন্ত এরা বিলুপ্ত হয়ে যায়।
প্রায় ২ লাখ বছর আগে আবির্ভূত হয় আমাদের সোজাসুজি পূর্বপুরুষ হোমো স্যাপিয়েন্স (Homo sapiens)। এদের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল ১৪০০ সিসি, যা আজকের মানুষের সমান।
আবহাওয়া ও প্রকৃতির নানা দুর্যোগ সামলে প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে হোমো স্যাপিয়েন্সরা আচরণে আধুনিক মানুষ হয়ে ওঠে। এই সময়ের সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল ভাষার জন্ম। অন্যদিকে এই ভাষার দক্ষতা না থাকার কারণেই বিশালদেহী, শক্তপোক্ত, তাগড়া নিয়ান্ডারথালরা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
বিশ্বাস, ধর্ম ও গল্পগুজব
ভাষার বিকাশে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল বিশ্বাসযোগ্যতা। প্রাক্-মানুষদের একজন মুখে একটা শব্দ করলেই অন্যরা তা বিশ্বাস করবে কেন? 'কথার তো কোনো দাম নেই!' তা ছাড়া প্রাণীদের নীতি-নৈতিকতা বলে কিছুও নেই। স্বার্থের জন্য মিথ্যা বলাটাই তাদের কাছে স্বাভাবিক। তাই ধোঁকা না খাওয়ার সহজ উপায় ছিল মুখের কথা পাত্তা না দেওয়া। আর এই কারণেই ভাষা থমকে যাচ্ছিল।
এ সময়ে মানুষ অঙ্গভঙ্গির পাশাপাশি মুখেও ভাব প্রকাশ করতে পারল। আবার একই সাথে মুখে এক আর মনে আরেক কথা লুকানোর সুযোগও তৈরি হলো।
ভাষা আসার পর পশম বেছে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার ঝক্কি কমে গেল। পশম সাফাইয়ের বদলে শুরু হলো মুখে মুখে খবর আদান-প্রদান। যাকে আমরা আজকের দিনে গল্পগুজব বা গসিপ বলি! এতে সময় বাঁচল এবং দলের আকার ৫০ থেকে বেড়ে ১৫০-এ গিয়ে ঠেকল।
আফ্রিকা থেকে বিশ্বজুড়ে বিস্তার
প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে নিজস্ব ভাষা ও আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে হোমো স্যাপিয়েন্সের একটি ছোট দল আফ্রিকা ছেড়ে এশিয়া ও ইউরোপের দিকে রওনা হয়।
২০০৪ সালের 'হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট'-এর তথ্য বলে, আজকের সমস্ত মানুষ মাত্র প্রায় ৫ হাজার দম্পতির বংশধর, যারা ৫০ হাজার বছর আগে পূর্ব আফ্রিকায় বসবাস করত।
আফ্রিকা ছাড়ার পর হোমো স্যাপিয়েন্সরা দ্রুত বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পুরোনো সব প্রজাতিকে পেছনে ফেলে রাজত্ব শুরু করে। এই সময়েই শিল্পকলা ও পরিকল্পিত মাছ শিকার শুরু হয়। ৪৬ হাজার বছর আগে তারা অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে যায় এবং ৪০ হাজার বছর আগে ইউরোপের গুহায় ছবি আঁকে।
ভাষার শক্তিতে বলীয়ান হোমো স্যাপিয়েন্সদের থামানো আর সম্ভব হয়নি। তাদের চেয়ে বড় মস্তিষ্ক ও তাগড়া শরীর হওয়া সত্ত্বেও প্রায় ৩০ হাজার বছর আগের মধ্যে নিয়ান্ডারথালরা পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যায়।
এরপর মানুষ দ্রুত এগোতে থাকে। ২০ হাজার বছর আগে ধনুক আবিষ্কার হয়। ১৫ হাজার বছর আগে যাযাবর জীবন ছেড়ে মানুষ সাইবেরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। এরপর ১৪ হাজার ৫০০ বছর আগে তারা আমেরিকায় পা রাখে। এই সময়ের মধ্যেই হোমো স্যাপিয়েন্স ছাড়া দুনিয়ার অন্য সব মানব প্রজাতি চিরতরে হারিয়ে যায়।
আফ্রিকা থেকে মানব সম্প্রসারণ
১০ হাজার বছর আগে আসে কৃষি। এরপর মানুষ ভেড়া, ছাগল, গম ও ঘোড়া পোষ মানাতে শেখে। ৬ হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ায় গড়ে ওঠে প্রথম শহর।
প্রায় ৫ হাজার ৬০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়ায় লেখার নিয়ম শুরু হয়। এর মাধ্যমে ইতিহাস লিখে রাখার পথ খোলে। এরপর মানুষ ছোটে এক অবিশ্বাস্য গতিতে। ৫ হাজার ৪০০ বছর আগে চাকা, ৫ হাজার ১০০ বছর আগে মিসরীয় রাজবংশ, ৩ হাজার ২০০ বছর আগে লৌহ যুগ, ১ হাজার ৫০০ বছর আগে শূন্য (০) আবিষ্কার, ১ হাজার বছর আগে বারুদ, ২০০ বছর আগে জ্বালানি ইঞ্জিন। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)। এরপরে আসবে 'কম্পিউটেশনাল সিঙ্গুলারিটি', যখন মানুষ তার চেয়েও বুদ্ধিমান যন্ত্র বানিয়ে ফেলবে।
মানুষের এই ছড়িয়ে পড়ার গল্প একই সাথে দারুণ রোমাঞ্চকর ও শিক্ষার। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রতিনিয়ত নতুন তথ্য আসছে। তবে জিনের গবেষণা কঠিন সব প্রশ্নের খোলস খুলে দিচ্ছে। যেমন আমরা কি সবাই আফ্রিকা থেকেই এসেছি? উত্তর—হ্যাঁ। আবার, এমন কোনো নির্দিষ্ট নারী বা পুরুষ আছেন কি, যার থেকে আজকের সব মানুষের জন্ম? উত্তর—হ্যাঁ।
গবেষণায় দেখা যায়, সেই নারী ছিলেন প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার বছর আগে আর পুরুষটি ছিলেন প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে। প্রশ্ন উঠতে পারে, দেড় লাখ বছর আগের নারীর সাথে ৫০ হাজার বছর আগের পুরুষের মিলন কীভাবে সম্ভব? আসলে এটি কোনো যুগল মিলন নয়। জেনেটিকস হিসাব করে দেখা গেছে, আমাদের সব নারীর বংশধারা পেছনে ছুটতে ছুটতে দেড় লাখ বছর আগের এক নারীতে গিয়ে মেলে, যাকে বলা হয় 'মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ'। আর পুরুষদের ওয়াই-ক্রোমোজোমের ধারা পিছু হটলে তা ৫০ হাজার বছর আগের এক পুরুষে গিয়ে মেলে, যাকে বলা হয় 'ওয়াই-ক্রোমোজোমাল অ্যাডাম'। অর্থাৎ দুজনে আলাদা সময়ে বেঁচে ছিলেন। জিনের পরীক্ষা থেকে পাওয়া এই তথ্যগুলো একদম পাকা, যা বারবার যাচাই করলেও একই ফল মেলে।
বিজ্ঞানের চোখে দেহভাষা
সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হলো, আজকের সব মানুষ ৫০ হাজার বছর আগের একটি ছোট দল থেকেই এসেছে। আর সে কারণেই সারা বিশ্বের মানুষের ভাব প্রকাশভঙ্গির ভেতরে এত মিল।
এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে 'দেহভাষা' বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজের বিজ্ঞান, যাকে আমরা সহজে অঙ্গভঙ্গিও বলতে পারি। এর মাধ্যমে আমরা মুখের কথার বাইরের ভাব, যেমন শারীরিক ভঙ্গি, মুখের হাসি বা চোখের নাড়াচাড়া নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে পারি।
দেহভাষার এই বিজ্ঞান মূলত মানুষের মুখের কথার আড়ালের আসল মনটা পড়ার জন্য; কিংবা কে সত্য বলছে আর কে সত্য লুকিয়ে মিথ্যা বলছে, তা ধরে ফেলার জন্য তৈরি।
ভাষার বিকাশের সাথে যেমন বিশ্বাস আর ধোঁকাবাজির সম্পর্ক ছিল, দেহভাষার পড়াশোনাও ঠিক তা-ই। মানুষ যখন মুখে মনের কথাটি প্রকাশ করতে পারে না বা করে না, তখন তার মনের গহিনের আসল খবর জানার প্রধান উপায় হলো এই দেহভাষা। আবার একইভাবে নিজের আসল ভাব লুকিয়ে রাখা কিংবা কৌশল হিসেবে কৃত্রিম অঙ্গভঙ্গি ফুটিয়ে তোলার বিদ্যাও এটি আমাদের শেখায়।
দেহভাষা বা অবাচনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রটিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ রয়েছে, কাইনেসিক্স বা শরীরের গতি ও ভঙ্গি বিদ্যা—সহজ কথায়, শরীরের অঙ্গভঙ্গি ও মুখের ভাব দেখে মানুষের মন পড়ার বিদ্যা। ১৯৫২ সালে রে বার্ডহুইস্টেল এটি শুরু করেন। তাঁর মতে, আমাদের শরীরের প্রতিটি ছোটখাটো নড়াচড়ারই একটি সুনির্দিষ্ট অর্থ থাকে। একক কোনো ভঙ্গি না দেখে কয়েকটি ভঙ্গি মিলিয়ে দেখলেই মানুষের মনের আসল খবরটা বোঝা যায়।
প্রক্সেমিক্স বা স্থান ও সীমানা বিদ্যা—এ হলো যোগাযোগের সময় মানুষ কতটা দূরত্ব বজায় রাখে তার হিসাব। ১৯৬৩ সালে এডওয়ার্ড টি হল জানান, প্রতিটি মানুষের চারপাশে একটি অদৃশ্য ব্যক্তিগত জায়গা বা চবৎংড়হধষ ঝঢ়ধপব থাকে। অপরিচিত কেউ যেখানে ঢুকে পড়লে সে অস্বস্তি বোধ করে। আবার নিজের এলাকা বা সীমানা আগলে রাখার মানসিকতাও এর মধ্যে পড়ে। মানুষ ছাড়াও প্রাণীদের মধ্যেও এই স্বভাব বেশ জোরালোভাবেই রয়েছে।
হ্যাপটিক্স বা স্পর্শবিদ্যা—স্পর্শের মাধ্যমে যোগাযোগ বা ভাব প্রকাশ করাই হ্যাপটিক্স বা স্পর্শবিদ্যা। করমর্দন, জড়িয়ে ধরা, চুমু খাওয়া, হাত ধরা বা পিঠ চাপড়ানোর মতো বিষয়গুলো এর উদাহরণ। গর্ভে থাকা অবস্থায় শিশু প্রথম যে অনুভূতিটি শেখে, তা হলো স্পর্শ। তবে সংস্কৃতিভেদে স্পর্শের অর্থ ও ব্যবহার আলাদা হতে পারে। যেমন কোনো কোনো দেশে হাই-ফাইভ দেওয়াটা খুব স্বাভাবিক, আবার অন্য সংস্কৃতিতে তা অপরিচিত হতে পারে।
দেহভাষা ও প্রাণীদের আচরণ
দেহভাষার বিষয়টি প্রাণীদের আচরণের সাথেও গভীরভাবে যুক্ত। চার্লস ডারউইন প্রথম দেখান যে ভয় বা রাগ হলে মানুষ ও প্রাণীর শারীরিক প্রতিক্রিয়া একই রকম হয়। কারণ, অনেক অঙ্গভঙ্গিই আমাদের জন্মগত স্বভাব।
মানুষ আর এপ (যেমন শিম্পাঞ্জি ও বোনোবো) বাদে আর কোনো প্রাণী নির্দিষ্ট কাউকে লক্ষ্য করে অঙ্গভঙ্গি করতে পারে না। যেমন একটি শিম্পাঞ্জি খাবার বা সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মতো বোনোবো ও শিম্পাঞ্জিদের দলের ভেতরেও নিজস্ব 'অঙ্গভঙ্গির সংস্কৃতি' রয়েছে। তারা অঙ্গভঙ্গির সাথে কণ্ঠস্বর মিলিয়ে ভাব প্রকাশ করতে পারে। গবেষকদের মতে, মুখমণ্ডলের এক্সপ্রেশন বা ভাব গোপন করা কঠিন হলেও হাত-পায়ের ভঙ্গি সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাই মুখের ভাব গোপন রেখে চালাকি বা প্রতারণা করার বিদ্যা থেকেই হয়তো একসময় মানুষের ভাষার জন্ম হয়েছিল।
আমাদের আজকের অনেক আচরণের শিকড় লুকিয়ে আছে সেই সুদূর অতীতে। ভয় পেলে আত্মরক্ষার ভঙ্গি করা, ভালোবাসার প্রকাশ কিংবা ক্লাসরুমে একই সিটে রোজ গিয়ে বসা, এসবই আমাদের অতীতের বিবর্তনীয় অভ্যাসের ফল। আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা দেহভাষার এই বিজ্ঞান আমাদের শেখায় কীভাবে মানুষের মুখের কথার আড়ালের আসল অনুভূতিটুকু বুঝে নেওয়া যায়।